বটুকদাদার পাখি
আমাদের বটুকদাদা পাখিদের বলাতে পারতেন।
পাখিরা যে সত্যি মানুষের মতন কথা বলতে পারে তা আমি নিজের কানে না শুনলে কিছুতেই বিশ্বাস করতুম না। রূপকথায় শূক-সারী আর ব্যঙ্গমা-ব্যঙ্গমীর গল্প পড়েছি। কিন্তু রূপকথা তো রূপ কথাই। পক্ষিরাজ ঘোড়া, মাছের পেটে মানুষ আর মানুষখেকো দৈত্য যে সত্যি সত্যি কোথাও নেই, তা আমরা ছোটবেলাতেই বুঝে গিয়েছিলুম। সেই রকমই জানতুম যে কথা- বলা পাখির কথা এমনিই কথার কথা।
কিন্তু বটুকদাদা আমাদের অবাক করে দিয়েছিলেন।
বটুকদাদা অনেক দেশ ঘুরে ঘুরে হঠাৎ হঠাৎ এক একদিন উপস্থিত হতেন আমাদের বাড়িতে, সঙ্গে নিয়ে আসতেন মাথা ভর্তি গল্প আর ঝোলা ভর্তি খুচরো পয়সা। একবার তিনি নিয়ে এলেন একটা পাখি।
খাঁচায় বন্দী করে নয়, পায়ে শিকল বেঁধেও নয়। পাখিটা বসে ছিল বটুকদাদার কাঁধে।
সেটা যে ঠিক কী পাখি তা চেনা গেল না। দেখতে অনেকটা বেশ বড় সড় ঘুঘু পাখির মতন, কিন্তু গায়র রং সবুজ। সেটাকে টিয়া পাখিও বলা যায় না। কারণ টিয়া পাখির মতন লাল ঠোঁট নেই। অথচ সবুজ রঙের ঘুঘু পাখিও তো আমার কেউ কখনো দেখিনি।
বটুকদাদা বললেন ওটা একটা পাহাড়ী পাখি। কী করে যে একা একা এদিকে চলে এসেছে। আমি নৌকা করে আসছিলুম, পাখিটা প্রথমে উড়ে এসে ছই-এর ওপর বসলো। আমি আদর করে ডাকলুম, আয় আয়, কাছে আয়। কয়েকবার ডাকতেই আমার কাঁধের ওপর এসে বসল। আমার চোখ দেখে ঠিক বুঝেছিল। আমি তো পাখিদের ভালবাসি, তাই ওরা আমাকে ভয় পায় না।
বটুকদার সব কথাই তো অদ্ভুত, তাই এটাকে তো আমরা আর একটা অদ্ভুত কথা বলে ধরে নিলুম। অবশ্য পাখিটা যে শান্তভাবে বটুকদাদার কাঁধে বসে আছে, সেটাওতো ঠিক।
বটুকদাদা বললেন, দু'দিন ধরে নৌকায় আসতে আসতে আমি পাখি-টাকে কথা বলতে শিখিয়েছি। আমিতো পাখিদের ভাষা জানি তাই ওরাও আমার কাছ থেকে চট করে মানুষের ভাষা শিখে নেয়।
তাই শুনে আমরা সবাই একসঙ্গে বলে উঠলুম, কই, কই, আমরা পাখিটার কথা শুনব! কথা শুনব!
বটুকদাদা হতে তুলে বললেন, শুনবি শুনবি। এক্ষুনি না। এত নতুন লোক দেখে লজ্জা পেয়েছে। আমি চান খাওয়া করে নি, তারপর তোদের শোনাব।
আমাদের সেই গ্রামের বাড়িতে ছিল একটা বেশ মস্ত উঠোন। তার তিন দিকেই ছোট ছোট একতলা ঘর। বটুকদাদা এলে তাঁকে দেওয়া হতো উত্তর দিকের কোণের একটি ঘর। সেই ঘরের খুব কাছেই পুকুর ঘাট।
নিজের ঘরের দিকে যেতে যেতে বটুকদাদা বললেন, আমার পাখিটা ইচ্ছে মতন এখানে উড়ে বেড়াবে। তোরা ওকে আদর করে ডেকে কথা বলতে পারিস, কিন্তু ওর গায়ে হাত দিস না। পাখিদের গায়ে হাত দিতে নেই। এর নাম আমি দিয়েছি কেষ্ট।
তারপর বটুকদাদা পাকিটাকে নিয়ে ঘরের মধ্যে ঢোকবার একটু পরেই স্পষ্ট শোনা গেল, কে যেন বলছে, বটুকদাদা, ওঠো, ওঠো, ওঠো!
আমার ছোট ভাই বকু উত্তেজিত ভাবে বলল, ঐ যে, পাখিটা কথা বলছে!
আমার ছোড়দি মুন্নির খুব বুদ্ধি আর সব কিছুতেই সন্দেহবাতিক। ছোড়দি ঠোঁট উল্টে বলল, ধ্যাৎ! ওটা আবার পাখির ডাক নাকি?
আমাদের সঙ্গে মজা করার জন্য বটুকদাদা নিজেই ওরকম ডাকছে!
তক্ষুনি পাখিটা ফুডুৎ করে উড়ে বেরিয়ে এলো ঘর থেকে। রান্না ঘরের পাশে, পুকুর ঘাটের কাছে তেঁতুল গাছটার একটা নিচু ডালে গিয়ে বসল।
আমরা দৌড়ে ওর কাছে গিয়ে বলতে লাগলুম, কেষ্ট, কেষ্ট আমরা তোমায় খুব ভালবাসি, আমাদের একটু কথা শোনাও তো!
পাখিটা যেন অবাক হয়ে আমাদের একটুক্ষণ দেখল। তারপর ফুডুৎ করে উড়ে চলে গেল অনেক দূরে।
আমরা বটুকদাদার ঘরের কাছে গিয়ে সবাই মিলে একসঙ্গে বললুম ও বটুকদাদা, তোমার পাখি উড়ে গেল।
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
৳৯৯
এক মাস
৳৩০
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments