-
বাংলায় সাধারণভাবে এবং ঢাকাতে বিশেষভাবে তবলার পৃষ্ঠপোষকতার শখ সার্বজনীন। এর বড় কারণ এই যে, এখানে হিন্দুস্থানের প্রসিদ্ধ তবলাবাদকরা সব সময়েই আসা-যাওয়া করতেন এবং এখানকার বিত্তবান সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিবর্গ তবলা বাজানোতে বিশেষ পারদর্শিতা অর্জন করেন। ওয়াজেদ আলী শাহ্' বিশেষ তবলাবাদক হোসাইন বখশের পুত্র আতা হোসাইনও বাবার মতো তবলাবাদনে বিখ্যাত ছিলেন এবং বলা হয়ে থাকে তার বাজানোতে এতই নৈপুণ্য ছিল যে লোকেরা শুধুমাত্র তবলা শ্রবণ করেই মুগ্ধ হয়ে যেত। আতা হোসেইন দীর্ঘদিন ঢাকায় থেকেছেন এবং এখানকার শাসক শ্রেণির লোকেরা (আমিরগণ) তাঁর সম্মান করতেন। স্থানীয় তবলা বাদক ছিলেন খয়রাতী জমাদার, ইনি প্রকৃতপক্ষে মাহুতদের জমাদার ছিলেন কিন্তু এই বিদ্যায় তার পূর্ণতা ছিল। দুনী খান যিনি
-
ঢাকাতে হিন্দু সাধারণের ধর্মানুষ্ঠান জন্য উপযুক্ত স্থান নাই। ঢাকেশ্বরীর বাড়ি সহরের অধিকাংশ লোকের পক্ষে অগম্য। অধিকাংশ লোকের সুবিধাজনক একটিও স্থান কেন নাই, তাহার উত্তর সর্বজনপরিজ্ঞাত। ঢাকায় বাসিন্দা ভদ্রলোক কেহ নাই। যাঁহাদিগকে ভদ্রলোক না বলিলে হয় ত রাগিয়া অগ্নিশর্মা হইবেন, এমন মৌখিক ভদ্র হয় ত ঘরে ঘরেই আছে। এই ভদ্র মহাশয়দিগের কার্যে শৌওকের শ্রীবৃদ্ধি, বেশ্যার বাড়ি হর্ম নিকেতন, আর বিড়ার কুত্তার বিবাহে লাক টাকা ব্যয় দেখিতে পাওয়া যায়, কিন্তু যাহা করিলে সাধারণের ধর্মলাভ হয়, যদ্বারা ধার্মিক সমাজে চিরস্মরণীয় হওয়া যায়, এমন কার্য একটিও দেখিবার উপায় নাই । এই স্থানে এই ৫/৭ শত বৎসর মধ্যে কত সহস্র বড়লোক জন্মিয়াছে, কিন্তু তিন পুরুষ
-
যে ধর্ম স্বয়ং ভগবানের উপদিষ্ট; যাহা পরম যোগীগণের শত সহস্র বর্ষব্যাপী কঠোর তপস্যার ফল; যাহার জন্য সাম্রাজ্যাধিপতিগণও অনায়াসে বিষয় ভোগ তুচ্ছ করিয়া গভীর অরণ্যে প্রবেশপূর্বক গলিত পত্রাদি ভক্ষণ দ্বারা জীবিকা নির্বাহ করা শ্রেয়োবোধ করিতেন; যে সারবান্ ধর্মকে বিনাশ জন্য কত শত দৈত্য রাক্ষস সমুদ্যত হইয়াও কিছু করিতে পারে নাই; যাহা অনন্তকাল হইলে অনন্ত লোকের সদগতির একমাত্র নিদান স্বরূপে বিরাজমান, সর্বজ্ঞ মহর্ষিদিগের ভষ্যিবাদিতা সাফল্য করিবার জন্যই যেন এই কলিকালে সেই ধর্মে লোক সমূহ আস্থাহীন হইয়া নানা অসৎপথে বিচরণ করিতেছে। মহাকাল পুরুষ মহাপ্রলয়ের হেতুভূত পাপরাশি সঞ্চিত করিবার জন্য জীবসমূহকে নিয়তই পাপের দিকে নানা প্রলোভন দ্বারা টানিতেছে, তাহারই কৌশলে সামান্য বুদ্ধি আধুনিক মানবের
-
‘সহমরণ’-ধাইয়ের পাড়া বিক্রমপুরের একখানি ক্ষুদ্র গ্রাম। সুধন্যচন্দ্র দাস দেখুর বাড়ি উক্ত ধাইয়ের পাড়া গ্রামে। সুধন্য ওলাউঠায় আক্রান্ত হইয়া হঠাৎ মৃত্যু-মুখে পতিত হয়। সুধন্যের মৃত্যুর অব্যবহিত পূর্বে তাহার পুণ্যবতী পত্নীরও ওলাউঠার ন্যায় ভেদ হইতে থাকে। কালের শাসনে সুধন্যের জীবন বায়ুটুকু অনন্তে মিলিয়া গেলে, তদীয় সাধ্বী পত্নী আত্মজীবনে হতাশ হইয়া পড়িল। হৃদয়ের দেবতার অনুগমন করিবার নিমিত্ত অভাগিনীর অন্তরাত্মা বুঝিবা বড়ই ব্যাকুল হইয়াছিল। তাই পতিব্রতা রমণী আপন ৫/৬ ক্ষুদ্র শিশুসন্তানটিকে জনৈকা আত্মীয়ার হাতে সমর্পণ করিয়া সকলের নিকট চিরবিদায় প্রার্থনা করিয়া লইল। পতির মৃতদেহ তখনও প্রাঙ্গণে শায়িত ছিল। সাধ্বী কম্পিত কলেবরে ধীরে যাইয়া তৎপার্শ্বে শয়ন করিল। ক্রমে রমণীর নয়নযুগল স্থির নিশ্চল হইয়া আসে, যেন
-
...বঙ্গীয়-সাহিত্য-সম্মিলনের এক অধিবেশন ১৯১৮ খ্রিস্টাব্দে ঢাকায় আহূত হয়। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ তখন ঢাকা-সাহিত্য-পরিষদের সভাপতি ও পৃষ্ঠপোষক। বঙ্গীয় সাহিত্য- সম্মিলনের ঢাকা- অধিবেশনের অভ্যর্থনা-সমিতির সভাপতি নির্বাচন লইয়া সাহিত্য-সমাজে ও সাহিত্য-পরিষদে তুমুল দ্বন্দ্ব উপস্থিত হইল। পরিষৎ দাশ সাহেবকে অভ্যর্থনা-সমিতির সভাপতি করিতে চাহে, সমাজ চাহে ঢাকার বিখ্যাত উকিল আনন্দ রায়কে। এই দ্বন্দ্বের ফলে অভ্যর্থনা-সমিতির সভ্য-সংখ্যা হু করিয়া বাড়িয়া চলিল। অর্থাভাবে এই সম্মিলনকে আর কোন অসুবিধা ভোগ করিতে হয় নাই। যাহা হউক, বিষম ভোটযুদ্ধে দাশ সাহেবই জয়লাভ করিলেন। আমি অভ্যর্থনা-সমিতির অন্যতম সহকারী সম্পাদক নির্বাচিত হইয়াছিলাম। সম্মিলনের সভাপতিরূপে রবীন্দ্রনাথকে পাইতে আমরা আগ্রহবান হইলাম এবং কলিকাতায় গিয়া রবীন্দ্রনাথকে সম্মত করাইবার ভার আমার উপর প্রদত্ত হইল।
এই আনন্দময়
-
বাংলার প্রথম মোগল গভর্নর ইসলাম খান', যাঁকে ঢাকার পুনরুজ্জীবিত আবাদীর প্রতিষ্ঠাতা মনে করা হয়, তিনি এখানে মাত্র ৫ বৎসর ৩ সপ্তাহ ১৯ দিন বসবাস করেন এবং তাঁর পুরা শাসনকাল অধিকাংশই যুদ্ধ বিগ্রহের ব্যবস্থাপনায় অতিবাহিত হয়েছে। মিস্টার শার্লীমেন তাঁর বাংলার ইতিহাস গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন যে, ইসলাম খানের দরবারে বার শত 'কাঞ্চনী", নর্তকী চাকরিরত ছিল, যাদের পেশা ছিল নাচ-গান। এর থেকে প্রতীয়মান হয় যে, ইসলাম খানের ঢাকায় আগমনের পূর্বেই ঢাকা যথেষ্টভাবে জন অধ্যুষিত ছিল এবং এখানে গান বাজনার প্রচুর চর্চা ছিল, অন্যথায় হঠাৎ করেই অথবা এত কম সময়ের মধ্যে বার শত কাঞ্চনী কোথা থেকে আগমন করবে? ইবনে বতুতার কাছ থেকেও এর সত্যতা
-
বাংলার প্রাচীন রাজধানী যদিও মুনিম খান খান খানানের সময়ে এমনভাবে বিরান হয় যে হুমায়ুনের শখের এই জান্নাতাবাদ' একেবারেই ধ্বংস স্তূপে পরিণত হয় এবং পরে আর কখনই এ স্থান জনবসতির মুখ দেখে নাই। সোনারগাঁ' কিছু দিনের জন্য পূর্ব বাংলার রাজধানী ছিল কিন্তু আজ সেটিও একটি গ্রাম বা মামুলি ছোট শহরের (কসবা) বেশি নয়। পাঠান শাসনামলে তাণ্ডা, ফতেহাবাদ, সাতগাঁ ইত্যাদি স্থানে রাজধানী, টাকশাল স্থাপিত হতে থাকে কিন্তু আজ এগুলির নাম নিশানা নেই বরং কিছু কিছু স্থানের অবস্থান নির্ধারণ করাও যায় না। কিন্তু ঢাকার এই আশ্চর্যজনক বৈশিষ্ট্য যে প্রত্যেক আমলে ও যুগে ঢাকা জাঁকজমক ও আড়ম্বরপূর্ণ এবং স্বপরিচয়ে টিকে ছিল। অবশেষে মুর্শিদকুলী খান
-
সুবহে কাযেবের' আভাস দৃশ্যমান হওয়া শুরু হয়েছে আর দেখুন রুটি বিক্রেতারা তন্দুরে আগুন জ্বেলে দিয়েছে এবং অগ্নিশিখা প্রজ্বলিত হওয়া শুরু করেছে। ঢাকায় পূর্বে ঘরে ঘরে ঘড়ি ছিল না। এজন্য চক থেকে দুধ এবং দুধের সর বিক্রেতাদের দোকান উঠে যাওয়া রাত বারোটা বাজার সুনির্দিষ্ট চিহ্ন মনে করা হতো এবং ভোর হবার নিশ্চিত পরিচয় ছিল তন্দুরের অগ্নি প্রজ্বলন। শীত হোক অথবা বর্ষা, এই দুই পেশার লোকেরা নিজেদের অভ্যাসে এত দৃঢ় এবং মজবুত ছিল যে তাদের কার্যকলাপ দলিল হিসেবে বিবেচিত হতো। সমগ্র বাংলার মধ্যে ঢাকার এই আশ্চর্যজনক বৈশিষ্ট্য রয়েছে এবং যদিও বাংলার সাধারণ খাদ্য চাউল অর্থাৎ ভাত, কিন্তু ঢাকায় সাধারণভাবে বাজারসমূহে এত ধরনের
-
প্রথম আলোচনাতেই যেমন আমি বলেছি যে, ঢাকার বর্তমান মুসলিম বাসিন্দাদের সংস্কৃতিবান অংশ মোগল যুগের স্মৃতিবাহী। আজ তার উপর এতটুকু সংযোজন করছি যে, এখানে মোগল যুগেই উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আর্মেনীয়দের বসবাস ছিল এবং সকলেই ধনী সওদাগর ছিলেন। শেষের দিকে তারা বড় বড় জমিদারী কিনে নিয়েছিলেন। এজন্য ঢাকার খাবার দাবারে আরমেনীয় খাবারের অন্তর্ভুক্ত হওয়াটা প্রকৃতি বিরুদ্ধ নয়। অর্থাৎ এখানে কিছু প্রাচীনতম খাবার রয়েছে, কিছু ইরানি খাবার, কিছু আরমেনীয় খাবার আছে এবং কিছু ঢাকার সুন্দর রুচির উদ্ভাবন।
মিস্টার পিটার-এর ভাষায় পৃথিবীর প্রত্যেক অঞ্চলের মুসলমানদের রুচি হচ্ছে মিশ্রিত কাবাব এবং পোলাও। পোলাও দু'ভাবে রান্না হয়। সহজ পদ্ধতি হচ্ছে 'পাশানো', প্রথম চাউল সিদ্ধ করে নেয়া হয়,
-
সমাজ এবং সংস্কৃতির প্রয়োজনীয়তা প্রত্যেক যুগে পরিবর্তনশীল হয়ে থাকে। আমি আমার বাল্যকালে যে সব পেশার লোকদের দেখেছি, বর্তমানে হয় সে পেশার কোনো অস্তিত্বই নেই অথবা যদি থেকে থাকে তবে জীবস্মৃত অবস্থায় রয়েছে। এই সাংস্কৃতিক বিপ্লব নিজ অভ্যন্তরে একটি বৈশিষ্ট্য ধারণ করে, যদি এটি কোনোভাবে লিপিবদ্ধ হয়ে যায় তাহলে ভবিষ্যৎ ইতিহাসবিদদের জন্য খুবই প্রয়োজনীয় বিষয় হিসেবে প্রমাণিত হতে পারে। আজকের আসরে সংক্ষিপ্তভাবে আমি কিছু শিল্পীদের উল্লেখ করব। আজ থেকে ত্রিশ বছর পূর্ব পর্যন্ত ঢাকায় 'বাদলাকশ' ছিল। এরা ছিল তাঁতিবাজারের বসাক। এরাই সোনালি তারের পাড়ের আবরণী (গোটা পটহা) তৈরি করত। সুস্পষ্টত এই পেশা মুসলমানদের সঙ্গে অন্য স্থান থেকে এসেছিল এবং মুসলমানদের পতনের
-
শবেবরাতের পরেই প্রত্যেক জায়গায় পবিত্র রমজানের আগমন হয়েছে বলে মনে করা হতো এবং বিশ তারিখের পর সব ধরনের প্রস্তুতিতে ব্যস্ততা পরিলক্ষিত হতো। আলহামদুলিল্লাহ্! শহরে মসজিদের সংখ্যা অনেক বেশি এবং মাশাআল্লাহ, অধিকাংশগুলিতেই নামাজ পড়া হয়। মসজিদের চুনকাম, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং ধনীদের বাড়িতে রাজমিস্ত্রি এবং মজুরদের আগমন রমজান শরিফের প্রকাশ্য পূর্বাভাস ছিল। গরিব লোকেরাও রমজানের চাঁদের পূর্বে নিজেদের ঘর স্বচ্ছ মাটি দিয়ে মুছে লেপে ঝক ঝকে তক তকে বানিয়ে ফেলত। প্রত্যেক বাড়িই ক্ষমতা অনুসারে পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা করত এবং করাতো। ঘোড়োঞ্চি'বা জলকান্দা পর্যন্ত পরিষ্কার করা হতো। নতুন ঘড়া, মাটির নতুন হুক্কা, নতুন নৈচা ইত্যাদি আনা হতো এবং সুরভিত করে নেয়া হতো। তামাকের বিশেষ বন্দোবস্ত
-
গত সাক্ষাৎকারে ঢাকার বিশিষ্ট খাবারের মধ্যে পোলাও, কাবাব, কোস্তা এবং কোরমার উল্লেখ করা হয়েছিল কিন্তু কোরমার বর্ণনা অনেক কিছু বাকি থাকতেই সময় শেষ হয়ে গিয়েছিল। বলার কথা এই যে, ঢাকায় কোরমার বিশেষ মসলা রয়েছে এবং ঢাকার বিশিষ্ট পরিবারে বিশেষ বিশেষ ভাবে রান্না হয়। দম পোস্তকে কোরমার মধ্যেই গণ্য করা উচিৎ। ঢাকায় দম পোস্ত যেমন সাধারণভাবে রান্না হয় তেমনটি অন্যত্র কম দেখা যায়। বড় আলুর দম পোস্ত অতি সাধারণ, কিন্তু বাঁধাকপির দম পোস্ত এখানকার বিশেষ আবিষ্কার। আমি বাঁধাকপির এর চেয়ে উত্তম কোনো ব্যবস্থা আর কোথাও দেখিনি এবং প্রকৃতই এটি উপযুক্ত খাবার জিনিস। এর স্বাদ অনেক দিন পর্যন্ত ভোলা যায় না। যদিও
উৎস
আর্কাইভ
লেখক
Stay Connected
Get Newsletter
Subscribe to our newsletter to get latest news, popular news and exclusive updates.