-
শিবের সঙ্গে যখন পার্বতীর বিবাহ হইল তখন পার্বতী কৈলাস পর্বতে আসিয়া ঘরকন্না করিতে লাগিলেন। শিব খেয়ালশূন্য লোক, তাহাতে আবার ভূতের দল নিয়া থাকিতেন—মেয়েরা বাড়িতে থাকিলে কেমন করিয়া চলাফেরা করিতে হয় সেদিকে তাঁহার নজর একটু কম। যখন-তখন তিনি তাঁহার ভূতদের নিয়া বাড়ির ভিতর আসিয়া উপস্থিত হন, পার্বতী আর তাঁর সখীদের তাহাতে বড় অসুবিধা হয়। দারোয়ান নন্দী তাঁহাকে মানা করিলেও তিনি তাহা শোনেন না, তাঁহাকে ধমকাইয়া ঠিক করিয়া দেন।
পার্বতীর সখী জয়া আর বিজয়া ক্রমাগত বলেন, ‘ইহারা সকলেই শিবের লোক, কাজেই তাঁহার ধমকে ভয় পায়। আমাদের নিজের একটি ভাল লোক হইলে বেশ ভাল হইত।’ এ কথায় পার্বতী কাদা দিয়া যারপরনাই সুন্দর একটা
-
গণেশ কেমন যুদ্ধ করিয়াছিলেন তাহা বলিয়াছি, গণেশের বিবাহ কেমন করিয়া হইয়াছিল আজ তাহা বলিব।
যুদ্ধের পর হইতে শিব গণেশকে যারপরনাই স্নেহ করতেন, আর পার্বতীর তো কথাই নাই। কার্তিক যেমন শিব আর পার্বতীর পুত্র, গণেশ তাঁদের তেমনি পুত্র হইলেন, আর তাঁদের নিকট তেমনি স্নেহ পাইতে লাগিলেন।
কার্তিক আর গণেশ যখন বড় হইলেন, তখন একটা কথা লইয়া দু-জনের মধ্যে বড়ই তর্ক উপস্থিত হইল; কার্তিক বলেন, ‘আমি আগে বিবাহ করিব,’ গণেশ বলেন, ‘না, আমি আগে বিবাহ করিব।’
তাঁহাদের এইরূপ তর্ক শুনিয়া শিব আর পার্বতী বড়ই ভাবনায় পড়িলেন। দুই পুত্রকেই তাঁহারা সমান স্নেহ করেন; ইহাদের কাহাকে চটাইয়া কাহার বিবাহ আগে দেন? শেষে অনেক ভাবিয়া
-
ইক্ষবাকু বংশে সগর নামে একজন অতি প্রসিদ্ধ রাজা ছিলেন। বীরত্বে তাঁহার সমান আর সেকালে কোন রাজাই ছিলেন না। রূপে, গুণে, বিদ্যায়, সব বিষয়েই তিনি সুখী ছিলেন, কেবল এক বিষয়ে তাঁহার বড়ই দুঃখ ছিল, তাঁহার পুত্র ছিল না। পুত্র-লাভের জন্য তিনি তাঁহার বৈদর্ভী এবং শৈব্যা নাম্নী দুই রানীকে লইয়া কৈলাস পর্বতে গিয়া কঠিন তপস্যা আরম্ভ করিলেন। কিছুদিন পরে শিব রাজার তপস্যায় ভুষ্ট হইয়া তাঁহার নিকট আসিয়া বলিলেন, ‘মহারাজ, তুমি কী চাও?’
রাজা ভক্তিভরে শিবকে প্রণাম করিয়া জোড়হাতে বলিলেন, ‘ভগবান, আমার পুত্র নাই। আমার মৃত্যুর পর আমার বিশাল সাম্রাজ্য ভোগ করিবার লোক থাকিবে না, আমার বংশ লোপ হইয়া যাইবে। সুতরাং যদি আমার
-
বিশ্বকর্মার নাম তোমরা সকলেই শুনিয়াছ। বিশ্বকর্মা দেবতাদের কারিগর, আর কারিগরদের দেবতা। এই দেবতার একটি মেয়ে ছিল, তাঁহার নাম সংজ্ঞা। কেহ কেহ তাঁহাকে উষা আর সুরেণু বলিয়াও ডাকিত।
বাপের ঘরে সংজ্ঞা সুখেই ছিলেন। কিন্তু শেষে তাঁহার পিতা যখন সূর্যদেবের সহিত তাঁহার বিবাহ দিলেন, তখন হইতেই বেচারির দুঃখের দিন আরম্ভ হইল। সূর্যের যে কী ভয়ানক তেজ, তাহা তোমরা সকলেই দেখিতেছ। দূরে থাকিয়াই এত তেজ, কাছে গেলে সে কি রকম হইবে তাহা তো আমরা ভাবিয়াই উঠিতে পারি না। এর উপর আবার সেকালে নাকি সূর্যের তেজ এখনকার চেয়ে ঢের বেশি ছিল। তখন সূর্যের দেহ এমন সুন্দর গোল ছিল না, কদম ফুলের কেশরের মত ছিল,
-
এক রাজা ছিলেন, তাঁহার নাম ছিল রৈবত ককুম্মী। পশ্চিম সমুদ্রের ধারে কুশস্থলী নামক নগরে তিনি বাস করিতেন। রৈবতের একটি কন্যা ছিল, তাহার নাম রেবতী। রেবতীর গুণের কথা আর বলিয়া শেষ করা যায় না। মেয়েটি দেখিতে যেমন অপরূপ সুন্দরী তেমনি সুশীলা ও মিষ্টভাষিণী আর বুদ্ধিমতীও যতদূর হইতে হয়।
রেবতী যতই বাড়িয়া উঠিলেন, রাজার মনেও ততই ভাবনা হইল যে, ‘আহা! আমার এই স্নেহের মেয়েটিকে এখন কাহার হাতে সমর্পণ করি?’
সংসারের যত ভাল ভাল রাজপুত্র একে একে সকলের সংবাদই রাজা লইলেন, কিন্তু; কাহাকেও তাঁহার পছন্দ হইল না। মন্ত্রী, পুরোহিত, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধুবান্ধব সকলকেই বলিলেন, কেহই তেমন ভাল একটি পাত্রের সন্ধান দিতে পারিল না।
শেষে
-
সে যে কত কালের কথা, তাহা আমি জানি না। সেই অতি প্রাচীনকালে আমাদের দেশে উত্তানপাদ নামে এক রাজা ছিলেন। উত্তানপাদের দুই রানী ছিলেন, একটির নাম সুনীতি, আর একটির নাম সুরুচি।
সুনীতি বড় লক্ষ্মী মেয়ে ছিলেন, কিন্তু সুরুচি ছিলেন ঠিক তাহার উল্টো। আর সুনীতিকে তিনি প্রাণ ভরিয়া হিংসা করিতেন। রাজা সেই সুরুচিকে এতই ভালবাসিতেন, যে উহার কথা না রাখিয়া থাকিতে পারিতেন না। সুরুচি তাঁহার নিকট সুনীতির নামে কত মিথ্যা কথাই বলিতেন, তিনি ভাবিতেন, তাহার সকলই বুঝি সত্য। শেষে রাজা একদিন সুরুচির কথায় সুনীতিকে রাজপুরী হইতে বাহির করিয়া দিলেন।
দুঃখিনী সুনীতি তখন আর কী করেন? মুনিদের তপোবনে গিয়া আশ্রয় লওয়া ভিন্ন তাঁহার
-
জরৎকারু মুনি সর্বদাই কঠিন তপস্যায় ব্যস্ত থাকিতেন। বিবাহ বা সংসারের অন্য কোনো কাজ করার ইচ্ছা তাঁহার একেবারেই ছিল না। তপস্যা করিয়া আর তীর্থে স্নান করিয়া তিনি পৃথিবীময় ঘুরিয়া বেড়াইতেন। ঘর, বাড়ি কিছুই তাঁহার ছিল না, যেখানে রাত্রি হইত, সেখানেই নিদ্রা যাইতেন। এমন লোককে ধরিয়া আনিয়া বিবাহ করাইয়া দেওয়া কি সহজ কাজ। এ কাজ হওয়ার কোনো উপায়ই ছিল না, যদি ইহার মধ্যে একটি আশ্চর্য ঘটনা না হইত। ঘটনাটি এই—জরৎকারু নানাস্থানে ঘুরিতে ঘুরিতে একদিন দেখিলেন যে, একটা ভয়কর অন্ধকার গর্তের মুখে কয়েকটি নিতান্ত দীন-হীন, রোগা হাড্ডিসার মানুষ একগাছি খস্খসের শিকড় ধরিয়া ঝুলিতেছে। উহাদের পা উপর দিকে, মাথা নীচের দিকে। একটা ইঁদুর ক্রমাগত
-
আমাদের ছোটো নদী চলে বাঁকে বাঁকে
বৈশাখ মাসে তার হাঁটু জল থাকে।
পার হয়ে যায় গোরু, পার হয় গাড়ি,
দুই ধার উঁচু তার, ঢালু তার পাড়ি।
চিক্ চিক্ করে বালি, কোথা নাই কাদা,
একধারে কাশবন ফুলে ফুলে সাদা।
কিচিমিচি করে সেথা শালিকের ঝাঁক,
রাতে ওঠে থেকে থেকে শেয়ালের হাঁক।
আর-পারে আমবন তালবন চলে,
গাঁয়ের বামুন পাড়া তারি ছায়াতলে।
তীরে তীরে ছেলে মেয়ে নাইবার কালে
গামছায় জল ভরি গায়ে তারা ঢালে।
সকালে বিকালে কভু নাওয়া হলে পরে
আঁচল ছাঁকিয়া তারা ছোটো মাছ ধরে।
বালি দিয়ে মাজে থালা, ঘটিগুলি মাজে,
বধূরা কাপড় কেচে যায় গৃহকাজে।
আষাঢ়ে বাদল নামে, নদী ভর ভর
মাতিয়া
-
মানুষের স্বভাবই এই যে গ্রীষ্মে তার মন কেমন করে নীলাম তুষার-কণা আর শাসির্তে বরফের নক্সার জন্যে। আবার শীতে তার চাই তপ্ত সূর্য, পল্লবের সবুজ খস-খস, বিলবেরির গন্ধ।
যাচ্ছিলাম আমি গভীর মুড়মুড়ে তুষারের ওপর দিয়ে আর ভাবছিলাম গ্রীষ্মের কথা। অনাড়ম্বর রুশী গ্রীষ্ম নয়, দক্ষিণী গ্রীষ্ম—জ¦লজ¦লে ফুলের গন্ধে যা চনমনে, পাথর যেখানে আতপ্ত, গরমে-সমুদ্র যেখানে অলস, নিস্তেজ। ভাবতে ভাবতে আমার নিজেরই কেমন গরম ঠেকল, ওভারকোটের বোতাম খুলে ফেললাম, টুপিটা সরিয়ে দিলাম কপাল থেকে। তুষার-কণা হয়ে দাঁড়াল ঝুরঝুরে চকমকি বালি, ফর গাছ উঠে দাঁড়াল সাইপ্রাস গাছ হয়ে, পাইনের ডাল নড়ে উঠল পাম গাছের সবুজ পাখার মতো।
এই সময়েই শাদা তুষার স্তূপের ওপর দেখলাম
-
আমার গোলাঘরে বাসা নিয়েছে এক বোলতা। কাছ দিয়ে গেলেই কানে আসে গাঢ় ভন-ভন আর হালকা আওয়াজ। মনে হবে যেন বোলতাটা খুব আড্ডাবাজ, একদল ইয়ার-বোলতা নিয়ে ফুর্তি লুটছে। আসলে মোটেই কোনো ইয়ার-দল ইে। নেহাৎ গরম দিনটার পর বোলতা তার ছোট্ট ফ্যানটা খুলে দিয়ে বাড়িটায় হাওয়া খেলায়। আর তার ক্ষিপ্র-চলা পাখা থেকে উঠে অবিরাম এক জমজমে গুঞ্জন: জজজ-জজজ-জজজ!
দেখা গেল বোলতাটা খুবই মার্জিত রুচির বাসিন্দা: আমার পায়ের শব্দ শোনামাত্র সে তার ফ্যান বন্ধ করে দেয়, যাতে ওর শব্দে আমার অসুবিধা না হয়। ঘরে হাওয়া খেলাতে মুরু করে কেবল আমি চলে যাবার পরে। সাধারণতই সে আমার চোখে না পড়ার চেষ্টা করে। তাই বোলতাটা
-
মৌচাকের জন্যে গল্প চেয়েছেন, একটা ভূতের গল্প হলে ভালো হয় লিখেছেন। গল্প একটা দেবো, তবে ভূতের নয়, এবং গল্প নয়— সত্য ঘটনা।
লাহোর মিউজিয়ামে যখন চাকুরি করতাম, সে সময় লাহোরের বিখ্যাত ‘দেশবন্ধু’ কাগজের সম্পাদক বিনায়ক দত্ত সিং মহাশয়ের সঙ্গে আমার যথেষ্ট আলাপ হয়। মি. সিং প্রাচীন সম্ভ্রান্ত বংশের সন্তান, তাঁদের আদি বাসভূমি পাঞ্জাবে নয়, রাজপুতনার কোটা রাজ্যে। তিন পুরুষ পূর্বে তাঁর পিতামহ রাজকার্য উপলক্ষ্যে এসে পাঞ্জাবে বাস করেন। সেই থেকেই তাঁর দেশ ছাড়া। সন্ধ্যার পর তাঁর বৈঠকখানায় গিয়ে বসতাম এবং দেওয়ালে টাঙানো পুরোনো আমলের বর্ম, কুঠার, পতাকা, বল্লম প্রভৃতি রাজপুতের যুদ্ধাস্ত্র সম্বন্ধে নানা ইতিহাস ও আলোচনা শুনতে বড়ো ভালো লাগত।
-
মৃত্তিকার নীচে অনেক দিন বীজ লুকাইয়া থাকে। মাসের পর মাস এইরূপে কাটিয়া গেল। শীতের পর বসন্ত আসিল। এখন আর লুকাইয়া থাকিবার প্রয়োজন নাই। বাহির হইতে কে যেন শিশুকে ডাকিয়া বলিতেছে, "আর ঘুমাইও না, উপরে উঠিয়া আইস, সূর্য্যের আলো দেখিবে।" আস্তে আস্তে বীজের ঢাক্কাটি খসিয়া পড়িল, দুইটি কোমল পাতার মধ্য হইতে অঙ্কুর বাহির হইল। অঙ্কুরের এক অংশ নীচের দিকে গিয়া দৃঢ়রূপে মাটি ধরিয়া রহিল, আর এক অংশ মাটি ভেদ করিয়া উপরে উঠিল। তোমরা কি অঙ্কুর উঠিতে দেখিয়াছ? মনে হয়, শিশুটি যেন ছোট মাথা তুলিয়া, আশ্চর্য্যের সহিত নূতন দেশ দেখিতেছে।
গাছের অঙ্কুর বাহির হইলে যে অংশ মাটির ভিতর প্রবেশ করে, তাহার নাম
উৎস
আর্কাইভ
লেখক
- অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর (৯)
- ইউরি ইয়াকভলেভ (১২)
- ইয়াকভ আকিম (১)
- উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী (২৬)
- কানিজ ফাতিমা (১)
- কায়ুম তাংগ্রিকুলিয়েভ (৪)
- গোলাম মোরশেদ খান (৩)
- চিত্রা দেব (১)
- জওহরলাল নেহেরু (১)
- জগদীশ চন্দ্র বসু (৩)
- দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার (১)
- প্রক্রিয়াধীন (৬)
- প্রযোজ্য নয় (১)
- বন্দে আলী মিয়া (১৫)
- বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় (১)
- বিপ্রদাশ বড়ুয়া (২)
- বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় (২)
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১)
- সত্যেন সেন (১৯)
- সামিহা সুলতানা অনন্যা (১)
- সুবীর বৈরাগী (১)
- হাসান তারেক (২)
Stay Connected
Get Newsletter
Subscribe to our newsletter to get latest news, popular news and exclusive updates.