মার্কসবাদ, ধর্ম ও বৈরী-অবৈরী দ্বন্দ্ব : ঐক্য, সংগ্রাম ও রাজনৈতিক বাস্তবতা
কমিউনিস্টদের প্রধান শত্রু হলো সাম্রাজ্যবাদ, লুটেরা পুঁজিবাদ, সাম্প্রদায়িকতা, ধর্মীয় মৌলবাদ, সামন্তবাদ ও প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি। মার্কসবাদী বিশ্লেষণ মতে, সাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মীয় মৌলবাদ কেবল সাংস্কৃতিক প্রবণতা নয়; বরং এগুলো সাম্রাজ্যবাদী শক্তির হাতিয়ার, যা মানুষের চেতনা বিভক্ত করে, শোষণের বিরুদ্ধে সংগ্রামকে দুর্বল করে। কমিউনিস্টরা পরকাল বা কল্পিত স্বর্গের প্রত্যাশায় নয়—বরং বাস্তব পৃথিবীকে মানুষের মুক্তির উপযোগী করে তুলতেই সংগ্রাম করে। কমিউনিস্টরা এই পৃথিবীকে সবার জন্য বাসযোগ্য করে গড়ে তোলার জন্য সমাজ সংষ্কার করে, রূপান্তরের পথে অগ্রসর হয়। তারা বস্তুবাদী, সেক্যুলার ও বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিচালিত।
কমিউনিস্ট পার্টি শ্রেণি সংগ্রামের পার্টি, বিপ্লবের পার্টি। এই পার্টি পেশাদার বিপ্লবী তৈরি করে, যারা মার্কসবাদ-লেনিনবাদের বিজ্ঞানসম্মত তত্ত্ব ধারণ করে সমাজের সব অত্যাচার, নিপীড়ন, অন্যায় ও শোষণের বিরুদ্ধে নিরন্তর সংগ্রাম চালায়। তারা বিভিন্ন শ্রেণি-পেশা, মত-পথের শোষিত মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে বিপ্লবের মাধ্যমে, শোষণমুক্ত সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য।
নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় যাওয়ার পথে কমিউনিস্ট–বামপন্থীরা অনেক সময় সামাজিক গণতন্ত্রী, উদার গণতন্ত্রী বা নিপীড়িত গোষ্ঠীর প্রতিনিধিদের সঙ্গে কৌশলগত ঐক্য গড়ে তোলে। সে ঐক্য কখনো জোটবদ্ধভাবে আবার কখনো যুগপৎ বা সমান্তরাল পথে অগ্রসর হয়। তবে সে ঐক্যের মধ্যেও সংগ্রাম থাকে যাতে কোন ধরনের বিচ্যুতি না ঘটে। অর্থাৎ বামপন্থীরা শর্তহীন ঐক্য করে না, তারা ‘ঐক্য ও সংগ্রাম’ এই নীতিতে অগ্রসর হয়। প্রশ্ন হলো—এই ঐক্য কতদূর বিস্তৃত করা সম্ভব?
সমাজে এমন বহু মানুষ ও সংগঠন আছে যারা বস্তুবাদে আস্থাশীল নয়, কিন্তু অন্যায়, কুসংস্কার ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই করে। আবার এমন অনেকে আছেন যারা কোনো নির্দিষ্ট ধর্মমত অনুসরণ করেন ও তা প্রচার করেন, তবে একই সঙ্গে উদারনৈতিক। তারা অনেক ক্ষেত্রে নিজেদের ধর্মের কট্টরপন্থী শক্তিরও আক্রমণের শিকার হন। তাহলে কমিউনিস্টরা কি তাদের সঙ্গে ঐক্য গড়ে তুলতে পারে?
দ্বন্দ্ব বা Dialectics বলতে বোঝায় দুটি বিপরীত শক্তি বা প্রবণতার সংঘাত, যার মধ্য দিয়েই পরিবর্তন ও অগ্রগতি ঘটে। তবে সব দ্বন্দ্ব একই প্রকৃতির নয়; তাদের চরিত্র, উৎস এবং সমাধানের পথ ভিন্ন হয়ে থাকে। মার্কসবাদী দ্বন্দ্বমূলক তত্ত্বে সমাজ, প্রকৃতি এবং মানুষের ভাবনার বিকাশ বিশ্লেষণে ‘বৈরী’ ও ‘অবৈরী’ দ্বন্দ্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধারণা।
বৈরী দ্বন্দ্ব হলো এমন দ্বন্দ্ব, যেখানে পক্ষগুলোর স্বার্থ পরস্পর সম্পূর্ণ বিরোধী। এই বিরোধ আপোষ বা আলোচনার মাধ্যমে নয়, বরং সংগ্রাম, সংঘাত এবং কাঠামোগত পরিবর্তনের মাধ্যমেই সমাধান খুঁজে পায়। শোষক বনাম শোষিত, দাস মালিক বনাম দাস, সামন্তবাদ বনাম পুঁজিবাদ, অথবা পুঁজিবাদ বনাম সমাজতন্ত্র—এগুলো বৈরী দ্বন্দ্বের প্রধান উদাহরণ। এই ধরনের দ্বন্দ্ব সাধারণত সমাজে মৌলিক পরিবর্তন ও বিপ্লবের পথ তৈরি করে।
অন্যদিকে, অবৈরী দ্বন্দ্ব হলো এমন দ্বন্দ্ব যেখানে মত, পদ্ধতি বা দৃষ্টিভঙ্গিতে পার্থক্য থাকলেও স্বার্থের ভিতরে মৌলিক বিরোধ নেই। একই শ্রেণির মানুষের ভিন্ন মত, রাজনৈতিক বা গণতান্ত্রিক কাঠামোর ভেতরে মতবৈচিত্র্য, অথবা একটি দলের কৌশলগত বিতর্ক—এসব অবৈরী দ্বন্দ্বের উদাহরণ। এই দ্বন্দ্ব আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব এবং সমাজের উন্নয়নেও অনেক সময় ভূমিকা রাখে।
এই প্রেক্ষাপটে মার্কসবাদী মতাদর্শ ও ধর্ম প্রচারকারীদের অবস্থানের মধ্যে দ্বন্দ্ব একটি ঐতিহাসিক আদর্শগত সংঘাত। মার্কসবাদ ধর্মকে দেখে শোষিত মানুষের বাস্তব বেদনাকে আড়ালকারী একটি আদর্শিক পর্দা হিসেবে। মার্কসের ভাষায়, ধর্ম হলো ‘বঞ্চিত মানুষের দীর্ঘশ্বাস’। এখানে ধর্মকে মানুষের বস্তুগত অবস্থা ও শ্রেণিবৈষম্যের প্রতিফলন হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। বিপরীতে ধর্ম প্রচারকারীরা ধর্মকে চূড়ান্ত সত্য, নৈতিকতার উৎস এবং পরকালীন মুক্তির পথ হিসেবে বিবেচনা করে। এ দুই দৃষ্টিভঙ্গির মৌলিক বিরোধ বাস্তবতার ব্যাখ্যায়, মানুষের মুক্তির ধারণায়, বিজ্ঞান বনাম অতিপ্রাকৃত সত্যের ভিত্তিতে, সমাজ পরিবর্তনের পদ্ধতি নিয়ে, এজন্যই তাদের দ্বন্দ্বকে সাধারণত বৈরী দ্বন্দ্বের পর্যায়ে নিয়ে যায়।
বিশেষত, যখন
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments