সার্কাসের মেয়ে
একবার আমরা গোটা ক্লাস গেলাম সার্কাসে। ভারী আনন্দ হল আমার, কেননা শিগগিরই আমার আট বছর পেরুবে, অথচ সার্কাসে গেছি কেবল একবার, তাও অনেক দিন আগে। আর সবচেয়ে বড়ো কথা, আলিয়োঙ্কার সবে ছয় বছর বয়স, কিন্তু সার্কাস দেখেছে তিন তিনবার। কষ্ট হয় না? তারপর তো গোটা ক্লাসই আমরা এলাম সার্কাসে। ভাবলাম, ভাগ্যি এখন আমি বড়ো হয়েছি, যেমন করে দেখা দরকার সব দেখব। তখন আমি ছিলাম ছোট, সার্কাস কী তা ভালো বুঝিনি। সেবার যখন খেলা দেখাতে এসে একজন আরেকজনের মাথায় উঠে দাঁড়ায় তখন আমি হো-হো করে হেসে উঠেছিলাম, ভেবেছিলাম এটা ওরা ইচ্ছে করে করছে, রগড়ের জন্যে, কেননা বাড়িতে তো আমি কখনো দেখিনি যে অমন বড়ো সড়ো সব লোকে এ ওপর ঘাড়ে ডিগবাজি খাচ্ছে। রাস্তাতেও দেখিনি। তাই একেবারে হো-হো করে হেসে উঠেছিলাম। মোটেই বুঝিনি যে খেলোছাড়রা তাদের কসরত দেখাচ্ছে। তাছাড়া সেবার আমি সবচেয়ে বেশি করে দেখছিলাম অর্কেস্ট্রাটা, কীভাবে বাজাচ্ছে, কে ড্রামের কাছে, কে শিঙায়, কনডাক্টর ছড়ি দোলাচ্ছে, কিন্তু কেউ তার দিকে চেয়ে দেখছে না, নিজের মনেই বাজিয়ে চলেছে। সেটা ভারী ভালো লেগেছিল আমার, কিন্তু আমি যখন বাজিয়েদের দেখছিলাম, তখন ওদিকে খেলা দেখাচ্ছিল আর্টিস্টরা। কিন্তু আমি খেয়ালই করিনি, কত ভালো ভালো ফসকে গেল। তবে তখন তো আমি একেবারেই হাঁদা ছিলাম।
তা গোটা ক্লাসই আমরা এলাম সার্কাসে। ভারী ভালো লাগল যে সার্কাসটায় কেমন একটা অদ্ভুত গন্ধ, দেয়ালে জ্বলজ্বলে সব ছবি, চারদিক আলোয় আলো, মাঝখানে একটা চমৎকার গালিচা, সিলিঙটা ভয়ানক উঁচু সেখানে নানা ধরনের ঝকমকে সব দোলনা। এই সময়ে বাজনা বেজে উঠল, সবাই তাড়াতাড়ি গিয়ে সিটে বসল, তারপর আইসক্রিম কিনে খেতে লাগল। হঠাৎ লাল পর্দার ওপাশ থেকে বেরিয়ে এল নানা রকম সব লোক, চমৎকার তাদের সাজ, হলদে হলদে ডোরাকাটা লাল লাল স্যুট। পর্দার দুপাশে দাঁড়িয়ে গেল তারা, আর মাঝখান দিয়ে হেঁটে এল কালো স্যুট পরা তাদের ম্যানেজার। জোরে কী যেন সে বলল, তত বোঝা গেল না, সঙ্গে সঙ্গে বাজনা শুরু হয়ে গেল ঝাঁপতালে, আর খেলা দেখাতে ছুটে এল জাগলার। সে যা ব্যাপার! দশটা কি একশটা করে গোলা ছুঁড়ে দিয়ে সে লোফালুফি করল। তারপর একটা ডোরাকাটা বল নিয়ে খেলা শুরু হল...মাথা দিয়ে, চাঁদি দিয়ে, কপাল দিয়ে, পিঠ দিয়ে, গোড়ালি দিয়ে সে সেটাকে ঠেলা দেয় আর বলটা তার গোটা শরীর বেয়ে গড়াগড়ি করে, পড়ে না। ভারী সুন্দর খেলাটা। হঠাৎ জাগলার বলটা ছুঁড়ে দিল আমাদের দিকে, সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয়ে গেল সত্যিকারের রগড়; কেননা বলটা লুফেছিলাম আমি, তারপর ছুঁড়ে দিলাম সেটা ভালেরকাকে, ভালেরকা মিশকাকে, মিশকা হঠাৎ বলা নেই, কওয়া নেই ছুঁড়ল কনডাক্টরকে লক্ষ করে, তবে কনডাক্টরের গায়ে লাগল না, লাগল ড্রামটায়। দুম! ড্রাম সে বাজাচ্ছিল, রেগে গিয়ে সে বলটা ছুঁড়ল ফের জাগলারের দিকে, কিন্তু পৌঁছাল না, পড়ল গিয়ে সুন্দর খোঁপা করা এক মাসির মাথায়। ফলে খোঁপার দফারফা। হেসে আমরা তখন মরি আর কি।
জাগলার পর্দার ওপারে চলে যাবার পরও আমরা অনেকক্ষণ শান্ত হতে পারিনি। সেই সময় গড়িয়ে নিয়ে আসা হল এক মস্ত নীল গোলা, আর যে লোকটা সব ঘোষণা করে সে মাঝখানে এগিয়ে এসে কী সব বলল, কিছুই বোঝা গেল না। ফের একটা ফুর্তির বাজনা শুরু হল অর্কেস্ট্রায় হবে আগের মতো অত ঝাঁপতালে নয়।
হঠাৎ ছুটে এল একটা বাচ্চা মেয়ে। অত ছোট্ট আর সুন্দর মেয়ে আমি কখনো দেখিনি। একেবারে টলটলে নীল চোখ, লম্বা রোঁয়া। পরনে রুপোলী ফ্রক, হাওয়াই রেইনকোট, হাত দুখানা বেশ লম্বা, ডানার মতো দুলিয়ে মস্ত গোলাটার ওপর
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
৳৯৯
এক মাস
৳৩০
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments