জননেতা মণি সিং
মণি সিং—রহস্য আর রোমাঞ্চ দিয়ে ঘেরা একটি নাম। পূর্ব পাকিস্তানের অধিবাসীদের মুখে মুখে প্রচারিত এই নামটি। তার সঠিক পরিচয় আর কার্যকলাপের ইতিহাস অনেকেরই জানা নেই। তাঁকে কেন্দ্র করে বাস্তবে আর কল্পনায় মিশানো বহু কাহিনি রচিত হয়ে উঠেছে। ময়মনসিংহ জেলার গ্রামাঞ্চলের বুড়ো চাষীরা তাঁদের নাতি-নাতনীদের কাছে রূপকথার মতো সেই সমস্ত কাহিনি শোনায়। ছোটরা অবাক কৌতুহলে বড় বড় চোখ করে সেই সব কথা শোনে। আধুনিক যুগের রূপকথার নায়ক মণি সিং।
কমরেড মণি সিং ময়মনসিংহ জেলার সুসং-দুর্গাপুরের রাজ পরিবারের ছেলে—এই কথাটা, কে জানে কেমন করে, ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়ে গেছে। এমনকি তাঁর পরিচিত মহলেও অনেকের মনে এই ধারণাটা বদ্ধমুল হয়ে আছে। কিন্তু কথাটা সত্যি নয়। তবে সেখানকার জমিদার বাড়ির সঙ্গে তাঁর আত্মীয়তা ছিল। তাঁর মাতামহী জমিদার বাড়ির মেয়ে। তাঁর একটিমাত্র মেয়ে। মণি সিং তাঁরই ছেলে। তাঁর পিতা উনিশ শতকের শেষ ভাগে জীবিকা অর্জনের উদ্দেশ্যে সস্ত্রীক কোলকাতায় চলে যান। সঙ্গে তাঁদের দুটি ছেলে। তিনি কোলকাতায় পৌঁছে একটা চাকরী জুটিয়ে নিয়ে সেখাইে বসবাস করতে লাগলেন। ১৯০১ সালে কোলকাতায় মণি সিংএর জন্ম হয়। তাঁর বয়স যখন মাত্র আড়াই বছর সে সময় তাঁর পিতা অকালে মারা গেলেন। তিনি কোনোই সঞ্চয় রেখে যেতে পারেননি। ফলে তাদের সম্পূর্ণভাবে মামাদের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়তে হলো। বড় দুই ভাই কোলকাতায় দুই মামার বাসায় থেকে লেখাপড়া করতে লাগল। মণি সিং-এর মা তাঁর মেয়ে নির্মলা আর মণি সিংকে নিয়ে ঢাকায় তাঁর এক ভাইয়ের বাসায় এসে রইলেন।
এই সময় সুসং জমিদারী এষ্টেট থেকে তাঁদের সংসার নির্বাহের জন্য তাঁর মাতামহের ভিটার উপর একটি বাড়িসহ নয় একর জমি লিখে দেওয়া হয়। তার মাতামহীর নামে যেই টংক জমিগুলি ছিল, সেগুলিই তাঁর মার নামে লিখে দেওয়া হয়েছিল। তাছাড়া মা-র বছরের খোরাকীর ধান ও মাসোহারার ব্যবস্থা জমিদারী এষ্টেট থেকে করা হয়েছিল। সুসং এর এই বাড়ি তৈরী হলে পর তাঁর মা তাঁর দিদি ও তাঁকে নিয়ে সুসং এ চলে এলেন। সুসংএর নীচু ক্লাসের পড়া শেষ হলে তাঁকে লেখাপড়া করানোর জন্য কোলকাতায় পাঠানো হয়। কোলকাতায় তাঁর থাকার ব্যবস্থা হয়েছিল সুসং-এর জমিদার মহারাজ কুমুদচন্দ্রের বাড়িতে। এক সুরম্য অট্টালিক। ঠাকুর, চাকর, ঝি, দারোয়ান, কোচোয়ান, কর্মচারী—এক এলাহী ব্যাপার! এই পরিবার আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত ছিল এবং এঁদের বিনয়ী ও ভদ্র বলেও নাম ছিল। এখানে বেশ ভালোভাবেই তাঁর শিক্ষাজীবনের দিনগুলো কাটছিল।
কিন্তু এই বাড়িতে কিছুকাল থাকার পর এক নতুন চিন্তা তাঁর মাথায় এসে চাপল। এখানে এসে প্রথমে নতুন নতুন কতগুলি কথা শুনলেন। দেশের পরাধীনতার কথা, ইতিপূর্বে তাঁর মনে কোনোদিনই জাগেনি। এখানে এসে নানাজনের বলাবলির মধ্য দিয়ে তিনি জানতে পারলেন যে, বৃটিশরা ভারতকে গোলাম করে রেখেছে; দিনে ডাকাতি করে কোটি কোটি টাকা বিলেতে নিয়ে যাচ্ছে; সারা গারো পাহাড়টা সুসংএর জমিদারদের হাত থেকে জবরদস্তি করে কেড়ে নিয়েছে ইত্যাদি ইত্যাদি। এসব কথা শুনতে শুনতে তাঁর মনে ব্রিটিশ বিরোধীতার ভাব ক্রমে ক্রমে অঙ্কুরিত হয়ে উঠছিল। এরপর ১৯১৪ সলের প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। এই যুদ্ধ শুরুর সঙ্গে সঙ্গে একটা জিনিস পরিষ্কারভাবে দেখা গেলো, এদেশের মানুষ সবাই জার্মানীর পক্ষে, ইংরেজদের পক্ষে কেউ নেই। সেই সময় ঘরে বাইরে সর্বত্র এই নিয়ে আলোচনা চলেছে। এদের এই সমস্ত আলাপ-আলোচনার মধ্য দিয়ে তাঁর ব্রিটিশ বিরোধী মনোভাবের সুচনা হয়েছিল।
অনুশীলন দলে যোগদান
এই সময় বাংলাদেশের রাজনৈতিক আবহাওয়া ছিল খুবই গরম। ‘অনুশীলন’ আর ‘যুগান্তর’ এই দুটি সন্ত্রাসবাদী দল তখন বিশেষভাবে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। তিনি অনুশীলনদলের সংস্পর্শে এলেন এবং তার সশস্ত্র সংগ্রামের সাহায্যে ইংরেজ বিতাড়নের আদর্শ গ্রহণ করে সেই দলে যোগ দিলেন।
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments