বর্তমান লেখকদের সমস্যা

লেখক: নারায়ণ চৌধুরী

বর্তমান লেখকের সমস্যা অনেক। তার মধ্যে কতকগুলি পড়ে জীবিকার খাতে, কতকগুলি চিন্তার স্বাধীনতার খাতে। লেখকের জীবিকার সমস্যা অর্থাৎ বেঁচে-বর্তে থাকার সমস্যাটা কেবলমাত্র এখনকারই, সমস্যা নয়, তা সব সময়েই লেখকের ভাগ্যের সঙ্গে সংলগ্ন হয়ে আছে। অর্থাৎ লিখনকর্ম থেকে জীবনধারণোপযোগী আর্থিক নিশ্চিন্ততা লাভের প্রশ্নে লেখককে সব সময়েই ভাবিত থাকতে হয়, বিব্রত থাকতে হয়, সদাসচেষ্ট থাকতে হয়—এটা কিন্তু আজকেরই নতুন সমস্যা নয়।

চিন্তার স্বাধীনতা লেখকের একটি মূলগত স্বাধীনতা। এই স্বাধীনতা ভিন্ন লেখকের লেখনী ধারণেরই কোন অর্থ হয় না। মানুষের বাঁচবার স্বাধীনতা যেমন তার জন্মগত অধিকার, লেখকের চিন্তার স্বাধীনতাও তেমনি লেখকের বৃত্তিগত অখণ্ডনীয় এক অধিকার। এ অধিকার তাঁর নিঃশ্বাস-বায়ুর তুল্য। মাছকে জল থেকে ডাঙায় তুললে যেমন তার খাবি খাওয়ার দশা হয়, স্বাধীনতার পরিমণ্ডল থেকে বিচ্যুত করে লেখককে বশ্যতার আবহাওয়ার মধ্যে টেনে আনলে তেমনি অসহনীয় দশা তাঁর হয়। সে-অবস্থায় তাঁব নিঃশ্বাস নিতেই কষ্ট হয়।

সৃষ্টিশীল লেখকদের সম্বন্ধে এ কথাটা আরও বেশী করে খাটে। ‘সৃষ্টিশীল’ বলতে এখানে আমি কবি নাট্যকার ঔপন্যাসিক গল্পলেখক প্রাবন্ধিক রম্যরচনাকার সকলকেই বোঝাচ্ছি। কবি যদি তাঁর অন্তরের সত্য অনুভব ও কল্পনার মৌলিকত্বকে ভাষা দিতে নাই পারলেন তবে তাঁর কাব্যরচনা বৃথা। নাট্যকার গল্পকার ও ঔপন্যাসিক যদি তাঁদের রচনা কর্মের ভিতর চলমান সমাজের প্রকৃত রূপটি ফুটিয়ে তুলতে নাই পারলেন তবে তাঁদের কলম চালনা করাই নিরর্থক। তাঁরা চলমান সমাজ প্রবাহের ছবি না এঁকে গতদিনের ইতিহাসে আশ্রয় নিতে পারেন কিংবা চিত্র ও চরিত্রের রূপায়ণে বর্তমান জীবনের সঙ্গে অসম্পর্কিত অবাস্তব রোমান্টিকতার কুহক সৃষ্টি করতে পারেন, কিন্তু সেটা জীবন থেকে পালানোরই নামান্তর। লেখকের উপর যুগের দাবী বরাবরই অত্যন্ত বেশী। যে-যুগে যে-লেখক জন্মগ্রহণ করেন সেই যুগের কাছে সেই লেখকের একটা বিশেষ ঋণ থাকে। সেই ঋণ স্বীকার ও পরিশোধ না করে লেখক যদি অব্যাহতি চেয়ে পরের কুমন্ত্রণায় প্রাচীন কাল অথবা মধ্যযুগের ইতিহাসে আশ্রয় গ্রহণ করেন কিংবা কাহিনীচয়নে ও চরিত্রসৃষ্টিতে নিছক বিশুদ্ধ রোমান্টিকতারই চর্চা করেন তাহলে যুগের দাবী পরিপূরণের কৃত্য থেকে তিনি ভ্রষ্ট হন। এ প্রায় অঙ্গীকার খেলাপ করারই সামিল এক বিচ্যুতি। একে পলায়নবাদী বিচ্যুতি ছাড়া বুঝি আর অন্য কোন নাম দেওয়া যায় না।

পক্ষান্তরে প্রাবন্ধিক সমালোচকরাও এক অর্থে সৃষ্টিশীল লেখক। সবাই নন, কেউ কেউ। গতানুগতিক ভাবধারার পুনরাবৃত্তি করাই যেসব প্রবন্ধকার বা সমালোচক তাঁদের রচনার সারকর্ম বলে জেনেছেন, সিলেবাস মিলিয়ে বই লেখা কিংবা অর্থপুস্তক লেখাই যাঁদের কাজের চোদ্দআনা অংশ জুড়ে আছে, সেইসব রোমন্থনধর্মী পুরানোর উপর দাগা বুলনো অধ্যাপকবর্গীয় লেখকদের কথা বলছি না; বলছি তাঁদের কথা যাঁদের কাছে 'আইডিয়া' বা ভাব একটা অতিশয় জীবন্ত বস্তু এবং যাঁরা তাঁদের লেখায় আইডিয়া'কে সমাজ-প্রগতি তথা সমাজ পবিবর্তনের পক্ষে একটা প্রধান হাতিয়ার স্বরূপ গণ্য করেন। 'আইডিয়ার অ্যাডভেঞ্চার' তাঁদের কাছে একটা মস্ত বড় দামী জিনিস। এ কাজে তাঁরা অসীম স্ফূর্তি অনুভব কবেন আর ওই স্ফূর্তির অনুভূতির মধ্য দিয়েই তাঁদের রচনায় সঞ্চারিত হয় সৃষ্টিশীলতার আবেগ। এ কাজ 'নোটমেকার' লেখকদের জন্য নয়, এর জন্য আলাদা গোত্রের প্রাবন্ধিক সমালোচকের প্রয়োজন।

ঠিক এই গোত্রেরই লেখক ছিলেন রুশো, ভলতেয়ার, ফরাসী এনসাইক্লো পিডিস্ট লেখকবর্গ, সুইফট, কাল মার্কস, এঙ্গেলস, বার্নার্ড শ, বার্টরাও রাসেল, রোমা রোলা প্রমুপ চিন্তানায়কগণ। তাঁদের পরস্পরের চিন্তার মধ্যে অনেক পার্থক্য আছে কিন্তু এই এক বিষয়ে তাঁদের মৌলিক মিল যে, তাঁরা প্রত্যেকেই চিন্তার স্বাধীনতায় বিশ্বাসী, উপর থেকে চাপানো কৃত্রিম বিধিনিষেধের দ্বারা তাঁদের লেখকব্যক্তিত্বকে তাঁরা খর্ব করতে দিতে নারাজ। ভলতেয়ারকে তাঁর চিন্তার স্বাতন্ত্র্য অক্ষুণ্ণ রাখবার জন্য ফরাসী দেশ থেকে ইংলণ্ডে গিয়ে সাময়িক আস্তানা গাড়তে হয়েছে। মার্কস তাঁর বৈপ্লবিক চিন্তার দীপশিখাটি জ্বালিয়ে

লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন

আকর্ষণীয় মূল্য

এক বছর

৪৯৯

এক মাস

৯৯
মেয়াদ শেষে নতুন দামে নতুন করে গ্রাহক হতে হবে

যোগাযোগ করতে

+৮৮ ০৯৬০৬০৩৩৩৯৩
রবিবার–বৃহস্পতি: সকাল ১০টা–সন্ধ্যা ৬টা (সরকারি ছুটিরদিন ব্যতীত) অথবা ভিজিট করুন FAQ

You Might Also Like

Comments

Leave A Comment

Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Get Newsletter

Featured News

Advertisement

Voting Poll (Checkbox)

Voting Poll (Radio)

Readers Opinion