পাভলভের সংক্ষিপ্ত পরিচয়
ইভান্ পেত্রোভিচ, পাভলভ, (১৮৪৯-১৯৩৬) আমাদের দেশে এখনও অপরিচিত বললেই চলে। তাঁর ‘কন্ডিশন্ড্-রিফ্লেক্স’ কথাটি অল্পাধিক জানা আছে অনেকের কিন্তু এর সঠিক তাৎপর্য এবং চিকিৎসা-বিজ্ঞান, শিক্ষাবিজ্ঞান, ভাষাবিজ্ঞান ও প্রধানত মনোবিজ্ঞানের উপর পাভলভের এই ‘কন্ডিশন্ড্-রিফ্লেক্স’ আবিষ্কারের প্রভাব সম্বন্ধে আমাদের দেশের পণ্ডিত ব্যক্তিরাও সম্পূর্ণ সজাগ নন।
মনোবিজ্ঞান এই সেদিনও দর্শনশাস্ত্রের আওতার মধ্যে আটকা ছিলো। সত্যিকারের বিজ্ঞানের পর্যায়ে আসবার ও স্বাতন্ত্র্য লাভের চেষ্টা দেখতে পাই ১৮৭৮ খ্রীষ্টাব্দের পর থেকে। এই সময় জার্মানীতে ওয়েবার, মুলার, হেল্মহোজ প্রভৃতি ফিজিওলজিষ্টরা দর্শন ও শ্রবণইন্দ্রিয় বিষয়ক বহু নতুন তথ্য আবিষ্কার করেন, ইংলণ্ডে “Expression Of The Emotions In Men And Animals” বইখানি এই সময় প্রকাশিত হয় এবং ১৮৭৯ খৃষ্টাব্দে জার্মানীতেই ভোকনার ও উন্দ, মনস্তত্ত্বের পৃথক গবেষণাগার স্থাপন করেন। আমেরিকায় জন হপকিন্স ইউনিভারসিটিতে মনস্তত্ত্বের পরীক্ষা-নিরীক্ষামূলক কাজকর্মের সূত্রপাত হয় ১৮৮১ সাল থেকে। এর কিছু আগে আবার মস্তিষ্কে বিভিন্ন ইন্দ্রিয়ের কেন্দ্রস্থান আবিষ্কার-পর্ব শেষ হয়েছে। মোট কথা উনিশ শতাব্দীর শেষ দিকে রহস্যবাদ ও অধ্যাত্মবাদের আওতা থেকে মনোবিজ্ঞান বেরিয়ে এলো স্বকীয় স্বাতন্ত্রের ওপর প্রতিষ্ঠিত হবার জন্যে। প্রকৃতি বিজ্ঞানের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার, এ্যানাটমী, ফিজিওলজী ও বায়োলজীর ক্রমোন্নতিই ক্রমশ দর্শনশাস্ত্র থেকে মনস্তত্ত্বকে সম্পূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন করে নিয়ে এলো। কিন্তু মনোবিজ্ঞানের অগ্রগতি ব্যাহত হচ্ছিল পদে পদে। মস্তিষ্ক যে মনন-ক্রিয়ার ভিত্তি এ ধারণা বৈজ্ঞানিকদের মনে বদ্ধমূল হয়ে গেলেও বিজ্ঞানের পক্ষে এ ধারণাকে বৈজ্ঞানিক সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব হচ্ছিল না। মস্তিষ্ক যে কিভাবে কাজ করে—এ তাঁরা জানতেন না এবং মস্তিষ্ক-বিজ্ঞানের সূত্রগুলি আবিষ্কারের পদ্ধতিও তাঁরা খুঁজে পাচ্ছিলেন না। কাজেই নানারকম কল্পনার আশ্রয় নেওয়া ছাড়া গত্যন্তর ছিলো না।
মনন-ক্রিয়া ও চৈতন্য সম্পর্কে দার্শনিকদের মতোই বৈজ্ঞানিকরাও অনুমানের ওপর নির্ভর করে এগুতে চাইলেন। বলা বাহুল্য, এ পন্থা বিজ্ঞানে অচল। ফল হল—হাজার রকমের থিওরী ও মনস্তাত্ত্বিকদের মধ্যে বিবদমান হাজার রকমের সম্প্রদায়। এইরকম ক্ষেত্রে যা ঘটে থাকে তাই ঘটলো। এঁরা সবাই সামন্ততান্ত্রিক যুগের “অমর, অপরিবর্তনীয়” আত্মাকে নস্যাৎ করলেন, এবং বললেন, মন মস্তিষ্কের ক্রিয়ার ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু আবার, মস্তিষ্ক কতকগুলো জন্মগত অপরিবর্তনীয় বিশেষ বিশেষ গুণাবলীর আধার—এ-তত্ত্বের অবতারণা করে “নতুন বোতলে পুরণো মদ” পরিবেশনের কাজ করলেন। উইলিয়ম জোনের কথাই ধরা যাক। আত্মাকে অস্বীকার করে বললেন মস্তিষ্কই মনের আধার। এই মস্তিষ্কের দুটো দরজা; সামনের ও পেছনের। সামনের দরজা হচ্ছে ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য চৈতন্যের রাজ্য আর পেছনের দরজায় আছে অপরিবর্তনীয় সহজাত আদিম প্রবৃত্তি ও আবেগ ইত্যাদি। এই আদিম প্রবৃত্তির মধ্যে আছে ব্যক্তিগত সম্পত্তিলাভের বাসনা, সেই সম্পত্তি রক্ষার্থ লড়াই-এর তাগিদ ও আরও নানা রকমের হিংসাত্মক ও পাশব মনোভাব। ভদ্রলোক বা শ্রমিক হবার যোগ্যতা ও জন্মগত অধিকার নিয়ে মানুষ জন্মায়। ‘বিধিদত্ত’ কথাটাকে উহ্য রেখে পূর্ববর্তীকালের প্লেটো, সেন্ট জন, সেণ্ট টমাসের কথারই পুনরুক্তি করলেন মাত্র। পরবর্তীকালের ফ্রয়েডের মনের ত্রিস্তর গঠন-তত্ত্বের—(ইগো, সুপার ইগো, ইদ) মধ্যে ভিয়েনার তৎকালীন সামাজিক স্তরবিন্যাসের প্রতিফলন দেখা যায়। মানুষের নির্জ্ঞান মনই আসলে মানুষের ব্যবহার ও চিন্তাধারার নিয়ামক;—এই তত্ত্ব জন্মগত সূত্রে আয়ত্ত প্রবৃত্তিগুলির প্রাধান্যই ঘোষণা করে না শুধু, মনোজগতের অপরিবর্তনীয়তারও ইঙ্গিত দিয়ে থাকে। নির্জ্ঞানতত্ত্ব আসলে মস্তিষ্কের ক্রিয়াকলাপের অজ্ঞতার স্বীকারোক্তি। মোট কথা, মস্তিষ্কের ক্রিয়াকলাপের অজ্ঞতা থেকেই মনস্তত্ত্বের এই দুর্যোগ। মস্তিষ্ক-বিজ্ঞানের অনগ্রসরতার মূলে ছিল নতুন পদ্ধতির অভাব। পরীক্ষা-নিরীক্ষার বিশেষ পদ্ধতির আবিষ্কার বিজ্ঞানে নতুন থিওরি আবিষ্কারের মতই গুরুত্বপূর্ণ। পাভলভ মস্তিষ্ক-বিজ্ঞানের গবেষণার জন্য একটি বিশেষ স্বকীয় পদ্ধতি আবিষ্কার করেন। এই পদ্ধতির ওপর বহুলাংশে নির্ভর করছিলো মনোবিদ্যার ভবিষ্যৎ। একটু পরেই এই পদ্ধতি নিয়ে আমরা আলোচনা করবো।
পাভলভ ও তাঁর আবিষ্কারের সম্যক্ পরিচয় দিতে হলে পাভলভের পূর্বসূরী সেচেনফ, (Sechenov) সম্বন্ধে দুই একটি কথা বলা দরকার। এই সেচেনফই বোধ হয় প্রথম
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments