পেশোয়ার বা সিন্ধ এক্সপ্রেস
কৃষণ চন্দরের 'পেশোয়ার এক্সপ্রেস' গল্পটির সঙ্গে বাঙালি পাঠকের পরিচয় অনেক দিনের। দেশভাগের মাত্র পাঁচ বছরের মধ্যেই বাঙলায় কৃষণ চন্দরের একটি গল্প সংকলন প্রকাশিত হয় 'ফুলকি ও ফুল'—তার প্রথম গল্পই ছিল 'পেশোয়ার এক্সপ্রেস'। ১৯৫২ সালে সংকলনটি প্রকাশ করে র্যাডিক্যাল বুক ক্লাব; গল্পগুলি অনুবাদ করেছিলেন পার্থ রায়। দেশভাগের সাহিত্য নিয়ে কোন আলোচনা করতে গেলে 'পেশোয়ার এক্সপ্রেস' গল্পটিকে আমরা কিছুতেই ভুলতে পারি না।
বীভৎস-নির্দয় এই গল্পটির কেন্দ্রীয় চরিত্র, বলা যেতে পারে, পেশোয়ার এক্সপ্রেস নামে একটি ট্রেন। পেশোয়ার থেকে ট্রেনটি যাত্রা শুরু করেছিল হিন্দু আর শিখ শরণার্থীদের নিয়ে। তক্ষশীলা স্টেশনে ট্রেনটিকে থামতে হলো, কাবণ শোনা গেল—আরও কিছু উদ্বাস্তু পরিবার আসছেন। ট্রেনটি অপেক্ষা কবল এবং অবশেষে তাঁরা এলেনও। তবে জ্যান্ত মানুষ নয়-মৃতদেহ। সেই দেহগুলোকে ট্রেনে চাপিযে দিয়ে বলা হলো, এগুলো যেন হিন্দুস্থানে পৌঁছে যায়। শববাহী ট্রেনটি আবার চলতে শুরু করল। কিন্তু এবার চেন টেনে তাকে থামানো হলো এবং ২০০ জন হিন্দু আর শিখকে নামিয়ে হত্যা করা হলো সেই তক্ষশীলা স্টেশনের ওপর। সেই তক্ষশীলা, প্রাচীনকালে যেখানে গড়ে উঠেছিল বিদ্যাচর্চার এক বিশাল কেন্দ্র।
এইভাবে ট্রেনটি এক সময় লাহোরে পৌঁছল। অমৃতসর থেকে মুসলমান শরণার্থীদের নিয়ে আর একটি ট্রেন তখন সেখানে এসে দাঁড়িয়েছে। দুই ট্রেন মুখোমুখি হলো, কথাবার্তাও কিছু হলো। জানা গেল, পথে ৪০০ জন মুসলমানকে নামিয়ে হত্যা করা হয়েছে; ধর্ষিতা হয়েছেন ৫০ জন নারী।
অমৃতসরের বার্তা পেশোয়ারে পৌঁছে গেল। সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো, অমৃতসরের বদলা পেশোয়ার নেবে একেবারে হিসাবে মিলিয়ে। গুণে গুণে ৪০০ জন হিন্দু শিখকে হত্যা করা হবে আর ধর্ষণ করা হবে তাদের ৫০ জন নারীকে।
এ-গল্পের কোন ঘটনাই কাল্পনিক নয়। উদ্বাস্তুরা ট্রেনের জন্যে অপেক্ষা করছেন স্টেশনে আর সেই সময় তাদের খুন করা হয়েছে। এমন ঘটনা সেদিন সত্যিই ঘটেছিল সেখুপুরায়, শিয়ালকোটে। কৃষণ চন্দরের গল্পটির নাম সিন্ধ এক্সপ্রেসও হতে পারত। হিন্দু-শিখ শরণার্থী বোঝাই সিন্ধ এক্সপ্রেসকে হরপ্পা স্টেশনে থামিয়ে, নির্বিচারে হত্যা করা হয়েছিল উদ্বাস্তু পরিবারগুলিকে। একটি কামরায় ৩০০ জন যাত্রীর মধ্যে প্রাণে বেঁচেছিলেন মাত্র ১২ জন। পাকপত্তন স্টেশন ছাড়ানোর পর ট্রেনটিকে আবার থামানো হয় এবং ৪০০ জন 'হিন্দু-শিখকে নামিয়ে হত্যা করা হয়; লুঠ হয়ে যান বেশ করেকজন যুবতী। এই সত্য ঘটনার কথা লিখে রেখেছেন জি.ডি. খোসলা, তাঁর 'স্টার্ন রেকনিং' গ্রন্থে। (পৃ. ১৬৫)
পেশোয়ার এক্সপ্রেস গল্পটি, মনে হয়, ওই ঘটনা অবলম্বনেই লেখা। হরপ্পা স্টেশনকে নাম বদলে করা হয়েছে: তক্ষশীলা। বাদবাকী কাহিনী প্রায় সবটাই সত্য ঘটনা। 'অমৃতসর' গল্পটিও প্রায় একই রকম। লাহোর থেকে হিন্দু-শিখরা এসে পৌঁছলেন অমৃতসরে; আর তাঁদের নির্যাতনের কাহিনী আগুন জ্বালিয়ে দিল সেখানে—নৃশংসভাবে হত্যা করা হলো মুসলমানদের। সে-কাহিনীও লেখা আছে জি ডি খোসলার গ্রন্থে। (পৃ. ১২৫, ২৭৮-৭৯)
খোসলার গ্রন্থটি প্রকাশিত হয় ১৯৪৯ সালে। কৃষণ চন্দরের 'পেশোয়ার এক্সপ্রেস' গল্পটিও ওই সময় নাগাদ লেখা। সেই অমানুষিক বর্বরতার কাহিনীগুলিকে গেঁথে গেঁথে কৃষণ চন্দর যেন সেই সময় একটা ডকুমেন্টেশনের কাজ করে যাচ্ছিলেন। একথা সাদাত হাসান মান্টো সম্পর্কেও বলা চলে। কিন্তু আজ পঞ্চাশ বছর পরে গল্পগুলি ফিরে পড়লে দেখা যায়, শুধু সময়ের সাক্ষ্য নয়, শিল্পের স্বাক্ষরও ওই রচনাগুলিতে কিছু কম ছিল না।
সমস্ত দেশ হয়ে গেছে বধ্যভূমি। পাঞ্জাব যেন এক শবাগার, আর তারই প্রতীক যেন পেশোয়ার এক্সপ্রেস নামের ওই শববাহী ট্রেনটি। তাকে বহন করতে হচ্ছে সময়ের যন্ত্রণা, সময়ের শব। প্রমত্ত হিংসায় জনমন যখন হতচকিত, বিবেক বিড়ম্বিত, ট্রেনের কথাগুলোই তখন হয়ে ওঠে প্রতিবাদের স্বর। ট্রেনটি আমাদের জানায়, 'শুকনো কাঠ দিয়ে তৈরী আমার দেহ; কিন্তু তবুও আমি চাই না যে, প্রতিহিংসা আর ঘৃণায় ভর্তি করে আবার আমাকে
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments