অতীশের ভিটে
সম্ভবত ৯৮২ সালে বিক্রমপুবের বজ্রযোগিনী গ্রামে চন্দ্রগর্ভেব জন্ম। চন্দ্রগর্ভের বাবার নাম কল্যাণশ্রী, মায়ের নাম প্রভাবতী। চন্দ্রগর্ভ মা-বাবার দ্বিতীয় সন্তান। চন্দ্রগর্ভ একজন রাজপুত্র।
বজ্রযোগিনী গ্রামে চন্দ্রগর্ভের ভিটে।
খুব অল্প বয়সেই চন্দ্রগর্ভকে বিদ্যাশিক্ষার জন্য মা-বাবা পাঠালেন অবধূত জেগরির কাছে। তাঁর কাছে চন্দ্রগর্ভ পঞ্চবিজ্ঞান শিখেছেন।
তারপর অবধূত জেগরি একদিন চন্দ্রগর্ভকে বললেন-তুমি এবার নালন্দায় যাও।
বিদ্যাচর্চার জন্য নালন্দার খ্যাতি অনেকদিন আগেই দেশ ছাড়িয়ে বিদেশেও ছড়িয়েছে। নালন্দায় অজস্র বিষয়ে শিক্ষার বিচিত্র ও বিপুল ব্যবস্থা। পালযুগে রাজারা দুহাতে নালন্দাকে সাহায্য করেছেন-নালন্দার তখন চূড়ান্ত খ্যাতি ও সমৃদ্ধি।
অবধূত জেগরির কথামতো চন্দ্রগর্ভ চলে এলেন নালন্দায়, দেখা করলেন আচার্য বোধিভদ্রের সঙ্গে। আচার্য বোধিভদ্র শ্রমণরূপে বরণ করে নিলেন চন্দ্রগর্ভকে; নতুন নাম দিলেন-দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান। ৯৯৪ সালের কথা।
দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞানকে নিয়ে আচার্য বোধিভদ্র এলেন রাজগৃহে। ৯৯৪ সাল থেকে ১০০০ সাল পর্যন্ত দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান রাজগৃহে আচার্য অদ্বয়বজ্রের কাছে নানা রকম শাস্ত্র পড়েছেন। এখানে দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞানের আরও কয়েকজন আচার্যের নাম লিখে রাখা ভালো-রাহুলগুপ্ত, শীলরক্ষিত, ধর্মকীর্তি, শান্তি-পা, নারো-পা, অবধুতি-পা।
রাজগৃহের পর বিক্রমশীল মহাবিহার। রাজা ধর্মপাল রাজমহল পাহাড় অঞ্চলে একটি বৌদ্ধ বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করেছেন; এই বৌদ্ধ বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম বিক্রমশীল মহাবিহার। বিক্রমশীলের খ্যাতি একদা নালন্দাব খ্যাতিকেও ছাড়িয়ে গিয়েছে। বিক্রমশীল মহাবিহারে দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান তন্ত্রশাস্ত্র শিখেছেন ১০১১ সাল পর্যন্ত। তারপর তিনি গেলেন বজ্রাসন (বৃদ্ধগয়া)। সেখানে মহাবিনয়ধব শীলরক্ষিতের কাছে দীক্ষা নিয়ে তিনি ভিক্ষু হয়েছেন। দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞানের বয়স তখন উনত্রিশ বছর।
সুমাত্রা, যবদ্বীপ ইত্যাদি পূর্বাঞ্চলীয় দ্বীপপুঞ্জের সাধারণ নাম ছিল সুবর্ণদ্বীপ। আমাদের দেশ থেকে সমুদ্র ছাড়া সুবর্ণদ্বীপে যাওয়ার অন্য কোনও পথ ছিল না। ১০১৩ সালে দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান সমুদ্রপথে রওনা হলেন সুবর্ণদ্বীপের দিকে। সমুদ্রপথে চোদ্দ-পনর মাস কেটেছে।
সমগ্র বৌদ্ধজগতে তখন সুবর্ণদ্বীপের আচার্য ধর্মকীর্তির অসামান্য খ্যাতি। সেখানে তাঁর কাছে দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান বারো বছর বিস্তর পড়াশোনা করেছেন।
তারপর দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান সুবর্ণদ্বীপ থেকে ফিরে এসেছেন ভারতবর্ষে। ফেরার পথে তিনি ঘুরে এসেছেন রত্নদ্বীপ এবং আরও কয়েকটি দেশ।
সুবর্ণদ্বীপ থেকে ফিরে আসার পর দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান কিছুকাল থেকেছেন বজ্রাসনের মহাবোধি বিহারে। তারপর মগধের রাজা নয়পালের অনুরোধে তিনি বিক্রমশীল মহাবিহারের অধ্যক্ষ হয়েছেন।
বিক্রমশীল মহাবিহারের অধ্যক্ষ বটে, কিন্তু আরও অন্তত তিনটি মহাবিহারের সঙ্গে দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক-নালন্দা মহাবিহার, ওদন্তপুরী মহাবিহার, সোমপুরী মহাবিহার।
দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান যখন বিক্রমশীল মহাবিহারের অধ্যক্ষ তখন একজন রাজা মগধ আক্রমণ করেছেন। প্রথমে মগধের রাজা নয়পালের সৈন্য-বাহিনী পরাস্ত হয়েছে, শত্রুপক্ষ মগধের রাজধানী পর্যন্ত এগিয়ে এসেছে। শেষ পর্যন্ত রাজা নয়পাল জয়ী হয়েছেন। পরাস্ত শত্রুপক্ষ শান্তির আবেদন করেছে। আবেদন ব্যর্থ হয়নি, শান্তি স্থাপিত হয়েছে, দুই বাজ্যে বন্ধুত্ব হয়েছে। এই শান্তি স্থাপনে দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান প্রধান ভূমিকা নিয়েছেন।
দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান যখন বিক্রমশীল মহাবিহারের অধ্যক্ষ সম্ভবত তখনই তাঁব নামের আগে আরেকটি শব্দ যুক্ত হয়েছে-অতীশ। অতঃপর পুরো নাম হল-অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান।
বজ্রযোগিনী গ্রামের চন্দ্রগর্ভ হয়ে গেলেন বিক্রমশীল মহাবিহারের অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান।
বিক্রমশীল মহাবিহারে একদিন দেখা গেল ঠিকমতো ভিক্ষা না পেয়ে একটি ভিক্ষুক অতীশ দীপঙ্করের পিছনে ছুটতে ছুটতে বলতে লাগল-ভালা হো, ও নাথ অতীশ, ভাত-ওনা, ভাত-ওনা (হে নাথ অতীশ, তোমার কল্যাণ হোক, আমাকে ভাত দাও)।
'অতীশ' মানে 'মহাপ্রভু'।
বিক্রমশীল মহাবিহারের সামনের দেয়ালের বাঁদিকে একদা অঙ্কিত হয়েছে অতীশ দীপঙ্করের মূর্তি।
অতীশ দীপঙ্করের খ্যাতি চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়েছে।
সুদূর তিব্বতের রাজা দেবগুরু জ্ঞানপ্রভের দ্রুত হয়ে দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে বীর্যসিংহ নামে একজন তিব্বতী একদিন বিক্রমশীল মহাবিহারে এলেন অতীশ দীপঙ্করের কাছে।
অতীশ দীপঙ্করের জন্য বীর্যসিংহের সঙ্গে বিস্তর দামী উপহার পাঠিয়েছেন রাজা দেবগুরু জ্ঞানপ্রভ। তিব্বতে যাওয়ার জন্য তিনি সনির্বন্ধ অনুরোধ জানিয়েছেন অতীশ দীপঙ্করকে।
বীর্যসিংহের মুখে সব কথা শুনে অতীশ দীপঙ্কর বললেন-সোনার
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments