আফগান বিজয়ের প্রাক্কালে বাংলা
পঞ্চদশ শতকের শেষদিকে এক রাজনৈতিক পরিবর্তন বাংলার সালতানাত সংলগ্ন বর্তমান বিহার প্রদেশ এবং জৌনপুরের সালতানাত নিয়ে গঠিত উত্তর ভারতের অঞ্চলসমূহে ক্ষমতার ভারসাম্য বিনষ্ট করেছিল। ১৪৯৪ সালে লোদীরা জৌনপুর থেকে সারকীদের সমূলে উৎখাত করে এবং জৌনপুরের শাসক সুলতান হুসেন শাহ সারকী বাংলার সুলতান আলাউদ্দিন হুসেন শাহের নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করেন। পরবর্তীকালে লোহানী আফগানরা দিল্লির লোদী সুলতানদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন এবং বিহারে একটি স্বাধীন রাজ্য গড়ে তোলেন। বাংলার সৌভাগ্য যে এই সংকটময় সন্ধিক্ষণে সুলতান আলাউদ্দিন হুসেন শাহের মতো একজন শক্তিশালী শাসক বাংলার সিংহাসনে আসীন ছিলেন। তাঁর পূর্বে অর্থাৎ শেষের দিকের ইলিয়াস শাহী শাসকদের পতনের পর এবং হাবশীদের (আবিসিনীয়দের) ক্ষমতা দখলের সময় থেকে প্রায় এক দশক ধরে বাংলা অস্থিতিশীলতার মধ্যে সময় অতিবাহিত করছিল। বাংলার ইতিহাসে হাবশী শাসনকাল হচ্ছে খুন ও হত্যার রাজনৈতিক কাহিনি; একের পর এক খুন হওয়ার জন্যই যেন তাদের সিংহাসন বা ক্ষমতা দখল। এই সংঘাতময় সময় দেখেই সম্রাট জহির আল দীন মোহাম্মদ বাবর শ্লেষাত্মক মন্তব্য করেছিলেন যে বাংলার একটা বিস্ময়কর প্রথা হচ্ছে যে এখানে বংশানুক্রমিক উত্তরাধিকারী শাসন দুর্লভ। রাজকীয় কর্মক্ষেত্রটা স্থায়ী...এ কর্মক্ষেত্রকে বাঙালিরা সম্মানের চোখে দেখে...তারা বলে, আমরা রাজাসনের প্রতি বিশ্বস্ত, যেই এটা দখল করুক আমরা অনুগতের মতো তার অনুসরণ করি।
সারকী রাজ্যের পতনের ফলে সুলতান আলাউদ্দিন হুসেন শাহ সতর্ক হয়ে ওঠেন। সারকী রাজ্য ও পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশ সমূহ দিল্লি ও গৌড়ের শাসকদের মধ্যে নিরপেক্ষ অঞ্চল (buffer zone) হিসেবে কাজ করতো। লোদীরা সুলতান হুসেন শাহ সারকীকে শুধু পরাভূত ও ক্ষতাচ্যুতই করেনি; তারা তার রাজ্যকে নিজেদের মধ্যে বণ্টন করে অন্তর্ভুক্ত করে নেয়। সুলতান হুসেন শাহ সারকী বাংলার সুলতানের অধীন খালগাঁও (kahlgaon) এ আশ্রয় নেন। পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশসমূহে সারকীদের তাড়া করে লোদীরা বাংলার সীমান্তবর্তী এলাকা পর্যন্ত অগ্রসর হয় এবং বাংলার সার্বভৌমত্ব ও শান্তির প্রতি হুমকি হয়ে ওঠে। বাংলার শাসক হুসেন শাহ সারকী নামীয় পলাতক সুলতানকে সম্মানের সাথে গ্রহণ করেন, সর্বপ্রকার সুবিধা প্রদান করেন এবং ভাগলপুর জেলার খলগাঁও (colgong) পরগণার দায়িত্ব অর্পণ করেন। এখানেই সারকী তার নির্বাসিত সরকার গঠন করেন। জৌনপুরের ক্ষমতাচ্যুত শাসকের প্রতি বাংলার শাসকের এই বন্ধুত্বকে দিল্লির শাসক সুলতান সিকান্দার শাহ অবজ্ঞা করতে পারেন নি। তিনি বাংলায় একটি অভিযান চালিয়ে এই অবস্থার বিপক্ষে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। সুলতান আলাউদ্দিন এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে শক্তভাবে তার মোকাবিলা করেন। তিনি বারহ নামক স্থানে দিল্লির সৈন্যদের প্রতিরোধ করার উদ্দেশ্যে তার পুত্র দানিয়েল এর অধীনে সৈন্য প্রেরণ করেন। কিন্তু প্রতিদ্বন্দ্বি সৈন্যদের মুখোমুখি কোনো সংঘর্ষ ঘটার আগেই এই মর্মে একটি সন্ধি চুক্তি সম্পাদিত হয় যে উভয় পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে শত্রুতা বন্ধ করা উচিৎ এবং পরস্পরের শত্রুদের রক্ষা করা থেকে বিরত থাকা উচিৎ। এর পরই দিল্লির সুলতান সিকান্দার শাহ লোদী বিহার, তুঘলকপুর ও শরনের গবর্নর মনোনীত করে দিল্লি ফিরে যান।[৪]
সুতরাং এটা মনে হয় যে দিল্লি ও বাংলার মধ্যে বিহার বিভক্ত হয়েছিল। পূর্বাঞ্চল বাংলার দখলেই ছিল। সুলতান আলাউদ্দিন হুসেন শাহের মতো বিচক্ষণ ও শক্তিশালী শাসক তাঁর দেশের পশ্চিম সীমান্তের কৌশলগত গুরুত্ব অবজ্ঞা করতে পারেন না। দক্ষিণ বিহারের বিহার শরীফ, মুঙ্গের ও ভাগলপুরসহ রাজমহল থেকে পাটনা পর্যন্ত, পূর্বে গঙ্গা ও কোসীর সম্মিলন স্থল থেকে পশ্চিমে ঘাঘরা এবং বালিয়া জেলা পর্যন্ত, উত্তরে বিহারের দক্ষিণ বাঁক পর্যন্ত সমগ্র অঞ্চলের কৌশলগত গুরুত্ব ও তাৎপর্য দিল্লির ও বাংলার শাসকদের নিকট ছিল অতীব গুরুত্বপূর্ণ। রাজমহল পর্বতমালার নিকট তেলিয়াগড়ের গিরিপথ এবং মধ্যযুগীয় বাংলার ঐতিহ্যগত সীমানা কোসীর প্রস্তর সমূহ (fords) প্রতিরক্ষার জন্য এই অঞ্চলের উপর নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা একটি
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments