বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ এবং কলকাতা প্রেস ক্লাব
[১৯৮০ সালে প্রেস ক্লাবের বাৎসরিক সংখ্যায় প্রকাশিত এই লেখাটি প্রয়াত অজিত চক্রবর্তীর। তিনি প্রেস ক্লাবের প্রাক্তন সম্পাদক এবং যুগান্তর পত্রিকার বর্ষীয়ান সাংবাদিক ছিলেন। অজিত চক্রবর্তী দীর্ঘকাল যুগান্তর পত্রিকার ডেপুটি চিহ্ন রিপোর্টারের দায়িত্ব সামলেছেন।]
১৬ এপ্রিল, ১৯৭১।
ঐ দিনটি এবং তারপরের দিনটি কলকাতা প্রেস ক্লাবের ইতিহাসে সোনার অক্ষরে লিখে রাখার মতো। আমি তখন ক্লাবে সেক্রেটারী। এখন প্রকাশ করা যেতে পারে যে যোগাযোগ ঘটিয়েছিলেন সমর বসু। সমর আমার সহপাঠী, অনেক দিনের বন্ধু। তখন বিএসএফ-এর পিআরও। ঐ যোগাযোগের উপর নির্ভর করেই বিকেল পাঁচটায় প্রেস ক্লাবে একটা প্রেস কনফারেন্স ডেকে দিলুম। লিখিত নয়, মুখে মুখে সকলকে আমন্ত্রণ জানান হল। এখনও সেদিনটির কথা মনে আছে। ক্লাবের টেলিফোন অত ব্যস্ত বুঝি আর কোনোদিন থাকেনি। সকলকে শুধু জানালাম, বিষয় পাক-ভারত যুদ্ধ। সামথিং—ভেরী ইমপরট্যান্ট। কে বা কারা আসবেন—সে সব কিছুই নয়।
খবর কিন্তু ছড়িয়ে পড়ল। কেউ কিছু জানেন না। কিন্তু একটা বড় কিছু গন্ধ পেয়ে গেলেন সকলেই। পাঁচটার আগেই ক্লাব জমজমাট। কিন্তু যাঁরা আসবার কথা তাঁদের পাত্তা নেই। নিখিলেশ এবং ভরত জনে জনে লেবু চা পরিবেশন করলেও বুঝতে অসুবিধে হল না যে সকলেরই ধৈর্যচ্যুতি ঘটছে। পাঁচটা বাজল—ছটাও বাজল। তবুও ওঁদের দেখা নেই। কিন্তু কী আশ্চর্য! রিপোর্টার বন্ধুরা কেউ ক্লাব ছেড়ে যাচ্ছেনও না।
অবশেষে সাড়ে ছটা নাগাদ ওঁরা এলেন। দুজন। সঙ্গে সমর বসু। সমর ক্লাবের বাইরেই থেকে গেল। অপেক্ষা করতে লাগল, ওঁরা ফিরে এলে আবার নিয়ে যাবে।
পরে সমরের কাছে শুনেছি একজন রিপোর্টার ওকে বাইরে ঐভাবে আপেক্ষা করতে দেখে প্রশ্ন করেছিল, কী ব্যাপার, সমরদা, আপনি এখানে? সমর তখন টেনশনে ভুগছে। সমর মিষ্টি স্বভাবের মানুষ। কখনই চটে না। কিন্তু এ দিন হঠাৎই বলে উঠল, আর একটি কথাও বলবেন না। ব্যস, আমাদের বন্ধু আর কথা না বাড়িয়ে ক্লাবের ভিতরে চলে এলেন।
ওঁদের দু’জনের একজন, আবদুল মান্নান, পরে স্বাধীন বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হয়েছিলেন।
কিন্তু তখন তিনি একেবারেই নির্বাক। সবাক ছিলেন আসিরুল ইসলাম। তখন রহমত আলি ছদ্মনামে নিজের পরিচয় দিচ্ছিলেন। বিলেতে ছিলেন অনেক দিন। ব্যারিস্টার, ভীষণ স্মার্ট, সুন্দর ইংরেজি বলেন। তিনিই কথা বললেন, আপনাদের এতক্ষণ বসিয়ে রেখেছি, সেজন্য দুঃখিত। কী করি বলুন, কীভাবে যে আমাদের দিন কাটছে তা কী করে আপনাদের বোঝাব? মাপ করবেন, আজ আর একটি কথা বলারও অনুমতি নেই। আগামীকাল সকাল ছটায় দয়া করে সবাই আসুন। তখন কিছু বলব।
এতক্ষণ বসিয়ে রেখে বলছেন কিনা কাল আসুন। তাও সকাল ছটায়। বিদেশী সাংবাদিকরা তো চটেই লাল। কিন্তু আসিরুলের মুখ থেকে ওঁরা একটি কথাও বার করতে পারলেন না। অনেক শক্ত প্রশ্ন নিক্ষিপ্ত হল। আসিরুলের জবাব একটাই প্লীজ কাম টুমরো।
অতবড় প্রেস কনফারেন্স, কিন্তু একটি লাইনের খবরও হল না। পরের দিন সকাল পাঁচটার পরই ক্লাব রেডি। চেয়ারগুলো সাজানো হয়েছে, ঝাড়পোছ হয়ে গেছে আগেই। লেবু চা আর বিস্কুটের ঢালাও ব্যবস্থা। সাড়ে পাঁচটার মধ্যেই যাকে বলে হাউস ফুল। ছ’টা বাজার মিনিট পনেরো আগেই এলেন আসিরুল ওরফে রহমত আলি আর আবদুল মান্নান। এসেই আসিরুল যে কটি কথা বললেন, তা এখনও আমার কানে বাজছে: জেন্টেলমেন বিহাফ অফ দি গভর্নমেন্ট অব বাংলাদেশ, আই ইনভাইট ইউ টু আওয়ার কান্ট্রি। দুঃখিত আমাদের গরীব দেশ আপনাদের ট্রান্সপোর্ট দিতে পারবে না। আপনাদের আধ ঘণ্টা সময় দিচ্ছি। যে যাঁর গাড়ি নিয়ে আসুন। আমরা আমাদের দেশে ঢুকব। প্লিজ ফলো আস।
প্রশ্নের পর প্রশ্ন হল, কিন্তু আসিরুল আর একটি কথাও বললেন না। যাবার সময় বললেন আমরা সাড়ে ছ’টায় আবার আসছি।
ব্যাপারটা কেউ জানতেন কি? আমার মতো আরও দু-একজন
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments