মোক্তার ভূত

শিবু-মোক্তার আর বেণী-মোক্তারকে মহকুমার সকলেই চিনত, তাদের মতো ধূর্ত ধড়িবাজ লোক ও তল্লাটে আর ছিল না। লোকে যেমন তাদের চিনত তেমনি ভয়ও করত। একবার তাদের পাল্লায় পড়লে আর কারুর রক্ষে ছিল না—জোঁক যেমন গা থেকে রক্ত শুষে নেয় অথচ জানতে পারা যায় না, তারাও তেমনি মিষ্টি কথায় ভুলিয়ে টাকা শুষে মক্কেলকে সর্বস্বান্ত করে দিত।

আদালতে দু'জনের মধ্যে রেষারেষি চলত, আবার বাইরে ভাবও ছিল। কিন্তু শিবু মক্কেলকে বলত, ‘বেণীটা জানে কি? ওকে এক তুড়িতে উড়িয়ে দেব।' আবার বেণীও নিজের মক্কেলকে বলত, 'শিবুটা একটা আস্ত গাধা— আইনের প্যাঁচে ফেলে ওর দফা রফা করব।' —কিন্তু সন্ধেবেলা একজন আর একজনের দাওয়ায় বসে তামাক না খেলে রাত্রে ঘুম হত না।

এমনিভাবে দুই মোক্তার সারাজীবন পরস্পরের সঙ্গে বাইরে বন্ধুত্ব আর ভিতরে শত্রুতা করে ক্রমে বুড়ো হয়ে এলো। দু'জনেরই বেশ টাকাকড়ি বাড়ি ঘর হয়েছে—বলতে গেলে তারাই দেশের মধ্যে সবচেয়ে গণ্যমান্য হয়ে উঠেছে। বারোয়ারী দুর্গাপূজায় এক বছর শিবু প্রেসিডেন্ট হয়, পরের বছর বেণী প্রেসিডেন্ট হয়—স্কুল কমিটিতেও তাই। কেউ কারুর চেয়ে খাটো নয়।

ওদের দু'জনের মধ্যে বোধ হয় শিবুরই ফিলে বুদ্ধি বেশি ছিল। সে একদিন মনে মনে মতলব আঁটলে—বেণীকে ভাল করে ঠকাতে পারেনি, বুদ্ধির যুদ্ধে কখনো বেণী জিতেছে কখনো শিবু জিতেছে। ফলে কেউই বড়াই করে বলতে পারত না যে, আমি বেশি চালাক।

শিবু-মোক্তার ফন্দি ঠিক করে হঠাৎ একদিন সন্ধ্যাবেলা হন্তদন্ত হয়ে বেণীকে গিয়ে বললে, 'ভাই বেণী, বড় বিপদে পড়েছি, পঞ্চাশটা টাকা ধার দিতে পার, কালই ফেরত পাবে।'

বেণী শিবুর মতলব বুঝতে পারলে না, বললে, তার আর কি। নিয়ে যাও।'

শিবু টাকা নিয়ে নিজের বাড়িতে গ্যাঁট হয়ে বসল। পরদিন টাকা ফেরত দেবার কথা, কিন্তু শিবুর দেখা নেই। বেণীর মন উতলা হয়ে উঠল। তারপর আরো দু'দিন কেটে গেল, কিন্তু শিবুর টাকা দেবার কোন চেষ্টাই দেখা গেল না।

বেণী মহা ফাঁপরে পড়ল। সে বুঝলে শিবু তাকে বিষম ঠকিয়েছে—কিন্তু লজ্জায় সেকথা কারুর কাছে বলতে পারলে না। হ্যাণ্ডনোটে না লিখিয়ে নিয়ে শিবুকে সে টাকা ধার দিয়েছে একথা জানাজানি হলে দেশসুদ্ধ লোক হাসবে; বলবে—‘বেণী-মোক্তারটা গাধা!' শিবুও তাই চায়। বেণী-মোক্তার ভেবে ভেবে আধখানা হয়ে গেল।

শিবুর সঙ্গে যখনি দেখা হয়, বেণী ফিফিস্ করে বলে, “ভাই শিবু, আমার টাকা?'

শিবু হেসে বলে, ‘বেণী ভাই, বুড়ো হয়ে তোমার মাথা খারাপ হয়েছে? টাকা আবার আমি কবে নিলুম?'

বেণী রেগে বলে, ‘দেবে না তাহলে? আচ্ছা আমিও দেখে নেব।'

শিবু হ্যা হ্যা করে হেসে বলে, “বেশ তো, মকদ্দমা কর না, হ্যাণ্ডনোট আছে নিশ্চয় ? ”

বেণী রাগে দাঁত কড়মড় করতে করতে চলে যায়। ক্রমে কথাটা চারিদিকে রাষ্ট্র হয়ে গেল যে, বেণীর পঞ্চাশ টাকা শিবু-মোক্তার বেবাক ঠকিয়ে নিয়েছে।

সবাই আহ্লাদে আটখানা, ভাবলে—'আহা, কাকের মাংসও কাকে খায় ?' বেণীকে সকলে জিজ্ঞাসা করতে লাগল—হ্যাঁ দাদা, তুমি নাকি লেখাপড়া না করেই শিবুকে টাকা ধার দিয়েছিলে? শেষে তোমার এই দুর্বুদ্ধি হল?’

বেণী কিন্তু কিছুতেই মানতে চায় না, ঘাড় নেড়ে বলে, 'আরে না না, ওসব শিবেটার মিথ্যে কথা। দাঁড়াও না, শিবেকে আমি--’

যখন একলা থাকে তখন শিবুর পেজেমির কথা ভেবে দাঁত কড়মড় করে আর গালাগাল দেয়।

এমনিভাবে টাকার কথা ভেবে ভেবে বেণী অসুখে পড়ল। একে বুড়ো বয়স তার উপর টাকার শোক—বেণী যায় যায়। ডাক্তার-বদ্যিরা তার অবস্থা দেখে আশা ছেড়ে দিলে।

বেণী কিন্তু তখনও টাকার আশা ছাড়েনি; কেবলই ভাবছে, কী করে শিবুর কাছে টাকা উদ্ধার করবে! তার আর অন্য চিন্তা নেই। যখন বদ্যি নাড়ী দেখে বললে—“হরি নাম কর!

লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন

আকর্ষণীয় মূল্য

এক বছর

৪৯৯

এক মাস

৯৯
মেয়াদ শেষে নতুন দামে নতুন করে গ্রাহক হতে হবে

যোগাযোগ করতে

+৮৮ ০৯৬০৬০৩৩৩৯৩
রবিবার–বৃহস্পতি: সকাল ১০টা–সন্ধ্যা ৬টা (সরকারি ছুটিরদিন ব্যতীত) অথবা ভিজিট করুন FAQ

You Might Also Like

Comments

Leave A Comment

Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Get Newsletter

Featured News

Advertisement

Voting Poll (Checkbox)

Voting Poll (Radio)

Readers Opinion

Editors Choice