বিস্ময়
ক্রুদ্ধ গর্জনে প্ল্যাটফরম কাঁপাইয়া ভীষণ অজগরটা আসিবা মাত্রই, প্রকাণ্ড লোহার দরজাটা আগলাইয়া দাঁড়ায় শ্রীপতি। ইষ্টিশানের টিকিট কালেক্টার সে। প্রচণ্ড বেগে ধূম নির্গত করিয়া নিষ্ফল আক্রোশে ফুঁসিতে ফুঁসিতে গাড়ীটা ক্রমে নিশ্চল হয়ে যায়। যাত্রীর দল হুলস্থুল বাধায়—কার আগে কে নামিবে!
প্ল্যাটফরমের লোহার বেড়ার একটী মাত্র দরজা দিয়া যাত্রীদের যাইতে হয় এক এক জন করিয়া। শ্রীপতি একটা একটা করিয়া টিকিট গনিয়া লয়,—কারো ফাঁকী দিবার জো নাই।
—এই ছোকড়া!
বার-তের বছরের একটি ছেলে থমকিয়া দাঁড়ায়। আহত বিহঙ্গের মতই শঙ্কাতুর দৃষ্টিতে তাকায় শ্রীপতির মুখের দিকে। ধমকা দিয়া শ্রীপতি বলে, হাফ-টিকিট করেছিস যে বড়! লম্বায় তো আর কম হোস নি!
মাথা নীচু করিয়া চুপ করিয়া থাকে ছেলেটি। শ্রীপতি আবার গর্জন করে বলে, দেখি, তোর পুটুলিতে কি আছে?
—কিছু না, শুধু কয়েকখানি কাপড়!
বাম হাতের তর্জনী দ্বারা পুঁটলিতে একটা খোঁচা দিয়া শ্রীপতি বলে, খুলে দেখা!
ছেলেটি খুলিতে চায় না, ইতস্তত করে। দেখিয়া শ্রীপতি জ্বলিয়া উঠিয়া বলে, শীগগির খুল বলছি।
বালকটীর হাত কাঁপে, মুখ বিবর্ণ হয়ে যায়। ভয়ে ভয়ে কাপড়ের প্যাঁচ খোলে।
একখানা ছোট বাঁশের খাঁচা; ভিতরে একটী শালিখ পাখি।
শ্রীপতি রক্তচক্ষু ঘুরাইয়া বলে, বড় যে চালাক হয়েছিস্, ডাকব পুলিশ?
চারিদিকে এতগুলি লোক ঘিরিয়া দাঁড়াইয়াছে। মধ্যে দাঁড়াইয়া বালকের মুখখানা একেবারে সাদা হইয়া যায়। কাঁদিয়া ফেলিয়া বলে, মা বলে দিয়েছে এমন করে লুকিয়ে আনতে—তাইতো এনেছি।
একটী চাষাগোছের প্রৌঢ় ব্যক্তি ছেলেটিকে ঠেলিয়া ফিস্ ফিস্ করিয়া বলে, বোকারাম, ট্যাকে কি আছে, দেনা বাবুর হাতে তুলে, দিয়ে পড়না পায়ে, অমনি?
লোকটার দিকে কটমট দৃষ্টিতে চাহিয়া বালকটিকে মুখ ভেঙচাইয়া শ্রীপতি বলে, মা লুকিয়ে আনতে বলেছে, তাই... বলি রেল কোম্পানী কি কারো বাবার পয়সায় কেনা গোলাম? সরে পড় এখান থেকে...
—একি, পয়সা ক্যানো?
একটী পঞ্চাশ-ষাট বছর বয়সের বুড়া বাম হাতের বাঁশের লাঠিটার উপর শরীরের সবটুকু ভার ছাড়িয়া দিয়া ঘাড় তুলিয়া মিনতির সুরে বলে, টিকিট করতে পারিনি বাবু! সময় পাইনি! গাড়ি হারাব? উঠে পড়েছি—বড় অন্যায়ই করেছি, কি করব। গেছলাম মেয়েটাকে আনতে। বড় কান্নাকাটি করে-ওরা বড় মারে কিনা! জামাই, বেহাই, বেহাইন-সব-সাতচোরে এক জোট! কাকের মুখে বকের মুখে মেয়ে আমার কত খবর পাঠায় বাবাকে বলো আমাকে নিয়ে যেতে। আনতে গেছলাম, দিয়েছেও, পাকে চক্রে দেরী হয়ে গেল। ভাবলাম, আজ গাড়ি হারালে হয়ত ওরা বেঁকে বসবে, মেয়েটাকে দিতেই চাইবে না। মানুষ ত নয়, একদম পশু... তাই কিনা বাবু... এ আধুলিটা... উঠেছি মহেশপুর ইষ্টিশানে।
রাগে শ্রীপতির সমস্ত শরীর রী-রী করিতে থাকে। বলে, কোম্পানীকে ঠকিয়ে আমাকে ঘুষ খাওয়ানো হচ্ছে।
বুড়া আহত হইয়া বলে, ঘুষ নয় বাবু, দুটো পান খাওয়ার জন্য! আহা কি কষ্টই না গেছে মেয়েটার।
শ্রীপতি আরও জ্বলিয়া উঠে, বলে, তোমাদের এ-সব পারিবারিক কেচ্ছা বিনিয়ে বিনিয়ে আমার কাছে বলা কেন?
নিজের কণ্ঠস্বরের তিক্ততায় ও তীক্ষ্ণতায় নিজেই চমকিত হইয়া চাহিয়া দেখে বুড়ার মেয়েটী ঘোমটাখানা একটু উঠাইয়া তাহারই ক্রোধ-বিকৃত মুখখানার দিকে চাহিয়া আছে।
কি মিনতি ভরা করুণ দৃষ্টি-শ্রীপতির চোখ পড়িতেই নত হইয়া যায়...
কোট-পেন্ট-টুপী পরা সাহেব-শ্রীপতিরও কেমন যেন লজ্জা করিতে থাকে। অন্তরটার কোনখানে গিয়া যেন একটু ব্যথাও বাজিয়া উঠে। আধুলিটা বুড়ার হাতে গুঁজিয়া দিয়া অন্যদিকে মুখ ফিরাইয়া বলে, যাও, সরো।
একে একে সকলে চলিয়া যায়। অসংখ্য যাত্রী বুকের ভিতরে পুরিয়া গাড়ীটা আবার ছোটে, নিমেষমধ্যে প্ল্যাটফরম পার হইয়া যায়। আবার চতুর্দিক নীরব, নিস্তব্ধ-উৎসব শেষ হইয়া গেলে বাড়ীর অবস্থা যেমনটি হয়... দুপুরের রোদ ঝাঁ ঝাঁ করে, পশ্চিম দিককার অন্তহীন মাঠটা জ্বলিতে থাকে, চাহিলে চক্ষু ঝলসাইয়া যায়।
প্রকাণ্ড তালাটাতে চাবী ঘুরাইয়া দরজাটা বন্ধ করিয়া
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments