অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স এবং অ্যান্টিবায়োটিকের ভবিষ্যৎ
সাবর্ণি সরকার
পৃথিবীর যেকোনো বহুকোষী জীব একটি কসমোপলিটন শহরের মতো। এই বহুজাতিক শহরে যেমন জীবটির নিজের বিভিন্ন কোষ বাস করে, তেমনি বাস করে অন্যান্য বিভিন্ন প্রজাতির এককোষী কিংবা বহুকোষী জীব। মানুষের কথাই ধরা যাক। একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষের শরীরে তার নিজের কোষের থেকে ‘বিদেশি’ কোষের সংখ্যাই বেশি। এই বিদেশিরা বাস করে অন্ত্র ও ত্বকে। তাদের প্রজাতির সংখ্যাই কয়েক হাজার [প্রায় ১০ হাজার]। এসব ‘বিদেশি’ জীবের মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির ব্যাকটেরিয়া, রয়েছে অ্যামিবা, রয়েছে কিছু কৃমি, আর্থোপড (যেমন, মুখের Demodex folliculorum) ইত্যাদি)। এই কসমোপলিটন শহরে সবাই সুখে-শান্তিতে বসবাস করে। তবে, মানুষের সমাজের মতো এখানেও একজন আরেকজনকে ধোঁকা দেয়। মানুষের নিজস্ব কোষ আর অন্য কোষগুলোর শান্তিচুক্তি প্রায়ই ভেঙে পড়ে। ধরা যাক, Escherichia coli-এর কথা। এই জাতীয় ব্যাকটেরিয়া মানুষের অস্ত্রে সুখে-শান্তিতে বসবাস করে। মানুষের কোনো ক্ষতি করে না তারা। তবে, অনেক সময় এর কিছু কিছু প্রকরণ বিভিন্ন রকমের রোগ তৈরি করতে পারে। এসব রোগের মধ্যে সবচেয়ে বেশি পরিচিত E. coli-এর কারণে মূত্রনালির সংক্রমণ। মানুষও এই শহরের পরিবেশকে অশান্ত করে তুলতে পারে। আরও নিষ্ঠুরভাবে! এমনিতে বহিরাগত ব্যাকটেরিয়া যখন আমাদের আক্রমণ করে, তখন বিভিন্ন প্রহরী কোষ, বিভিন্ন প্রোটিন অণু [যেমন, অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল পেপটাইড] এসব ব্যাকটেরিয়াকে প্রতিহত করে। তবে, প্রায় আশি বছর ধরে মানুষ আক্রমণকারী ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে এক ধরনের ওষুধ প্রয়োগ করে আসছে। এই ওষুধের সমস্যা হল, এটা শরীরে বসবাস করা এবং পুষ্টিলাভে যারা সহায়তা করত সেসব ব্যাকটেরিয়া: সেগুলোকেও মেরে ফেলে। বলা যায়, তাদের মেনে নিতে হয় বিনা দোষে মৃত্যু। শান্তিচুক্তি লঙ্ঘনকারী এসব ‘ওষুধ’ অ্যান্টিবায়োটিক নামে পরিচিত।
আজকাল অবশ্য শোনা যায়, অনেক ব্যাকটেরিয়া এসব ওষুধকে না কি পাত্তা দিচ্ছে না! বিজ্ঞানীরা বলছেন, অ্যান্টিবায়োটিক ‘রেজিস্ট্যান্ট’ ব্যাকটেরিয়া তৈরি হয়েছে! অ্যান্টিবায়োটিক কখন এল, ব্যাকটেরিয়া কী করে এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলল, এই প্রতিরোধের মুখে আমাদের করণীয় কিংবা এই ওষুধের ভবিষ্যৎ কী তা নিয়ে বর্তমান আলোচনা সাজানো।
অ্যান্টিবায়োটিকের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস
অ্যান্টিবায়োটিক শব্দটির ইতিহাস খুব আধুনিক। চিকিৎসাবিজ্ঞানের পারিভাষিক শব্দ হবার আগে উনিশ শতকে বিশেষণ হিসেবে শব্দটির ব্যবহার ছিল। ১৮৭১ সালে একজন ফরাসি বিজ্ঞানী শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন। তিনি antibiotique বলতে বুঝিয়েছিলেন: ‘প্রাণরোধী বা জীবনবিরোধী’। ব্যবহারটা অনেকটা বর্তমানে ব্যবহৃত বিশেষণ ‘symbiotic’-এর মতো [‘symbiotic-এর বাংলা পরিভাষা মিথোজীবী: যারা পরস্পর সহযোগিতা করে এমন জীব]। সেলম্যান আব্রাহাম ওয়াক্সম্যান ১৯৪১ সালে যখন শব্দটি প্রস্তাব করেন, এবং সেটি প্রতিষ্ঠা করার জন্য চেষ্টা করেন, তখনও পেনিসিলিন, পায়োসায়ানেজ ইত্যাদি ওষুধকে বিজ্ঞানীরা bacteriostatic শব্দে অভিহিত করতেন। ওয়াক্সম্যান প্রস্তাব করলেন, যেসব দ্রব্য bacteriostatic [ব্যাকটেরিয়ার বংশবৃদ্ধি রোধ করে] ও bactericidal (ব্যাকটেরিয়াকে হত্যা করে); সেসব দ্রব্য যদি অন্যকোনো অণুজীব থেকে উৎপাদিত হয়: তাদের অ্যান্টিবায়োটিক বলা হোক। antibiotic শব্দটি বিশেষণ থেকে আস্তে আস্তে হয়ে গেল বিশেষ্য, বহুবাচ্যে হয়ে গেল antibiotics [উল্লেখ্য, ওয়াক্সম্যান একটি গুরুত্বপূর্ণ অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কার করেছিলেন: স্ট্রেপটোমাইসিন]। এই সংজ্ঞার বিশেষত্ব হল: যারা ‘অ্যান্টিবায়োটিক’, তারা সবাই কোনো না কোনো অণুজীবের উৎপাদিত বস্তু হতে হবে। তাহলে ব্যাপারটি দাঁড়ায় এমন, অ্যান্টিবায়োটিক দ্রব্যগুলো এমন দ্রব্য প্রকৃতিতে আগে থেকেই ছিল এবং অণুজীবেরা এই রাসায়নিক দ্রব্য বহুকাল ধরে পরস্পরের বিরুদ্ধে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। অনেকটা আণবিক জৈবযুদ্ধ! এই জৈবযুদ্ধে মানুষের আবিষ্কৃত সিনথেটিক দ্রব্যগুলোও কিন্তু রয়েছে। যেমন: ফোরোকুইনোলোন, সালফোনামাইড কিংবা ট্রাইমিথোপ্রিম জাতীয় ব্যাকটেরিয়ানাশক! বর্তমানে কিছু লেখায় এদেরও অ্যান্টিবায়োটিক হিসেবে বলার একটা প্রবণতা লক্ষ করা যায়।
ওয়াক্সম্যানের সংজ্ঞা অনুসারে পৃথিবীর প্রথম কার্যকরী অ্যান্টিবায়োটিক হল পেনিসিলিন। এই ওষুধ আবিষ্কারের একটি মুখোরোচক কাহিনি প্রচলিত আছে। ১৯২৮ সালে অণুজীববিদ আলেক্সান্ডার ফ্লেমিং তার ব্যাকটেরিয়ার কলোনি না ধুয়ে
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments