দিবা শিশু যত্ন কেন্দ্র
দেশে নারী চাকরিজীবীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। তারপরও বহু নারী কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রি শেষ করে আজ গৃহিণী। নারীদের এ অবস্থানের পেছনে অন্যতম কারণ-সন্তান। বিয়ের পর অনেক নারী পারিবারিক বাধাবিপত্তি জয় করে চাকরি চালিয়ে গেলেও সন্তানের দেখাশোনা ও লালন-পালনের জন্য চাকরি ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। ইচ্ছা থাকলেও চাকরি করতে পারেন না। কারণ, শহরে একা বাসায় নবজাতককে রেখে কোনো মায়ের পক্ষে চাকরি চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। আগে যৌথ পরিবারের কারণে অনেক সময় নারীরা সন্তানকে নানি বা দাদির কাছে রেখে চাকরি করতে পারতেন। বর্তমানে একক পরিবারে থাকার কারণে তা-ও সম্ভব নয়। অনেক নারী মনে করেন সন্তানের বয়স নয় বা দশ বছর হলে আবার চাকরিতে যোগ দেবেন, কিন্তু ততদিনে তার সহকর্মীরা চাকরিতে বহুদূর এগিয়ে যান। ফলে সম্পূর্ণ নতুনভাবে আবার শুরু করা কঠিন হয়ে পড়ে। দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হলে এ অবস্থার পরিবর্তন করতে হবে। সন্তানকে রাখার জায়গার অভাবে যেন কোনো নারীকে চাকরি ছাড়তে না হয়, সেজন্য সব সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে দিবা শিশু যত্ন কেন্দ্র থাকা উচিত। প্রতিটি মায়ের নিজ কর্মপ্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে এ সুবিধা পাওয়ার অধিকার রয়েছে।
মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকায় ব্যাংকসহ বহু প্রতিষ্ঠান থাকা সত্ত্বেও ২০০৬ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকে প্রথম দিবা শিশু যত্ন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয়। ব্যাংকে কর্মরত নারীদের বহু বছরের সংগ্রামের ফল এ দিবা শিশু যত্ন কেন্দ্র্র। ‘সেবা’র (সেবামূলক একটি সংস্থা) পক্ষ থেকে দিবা শিশু যত্ন কেন্দ্র করার প্রস্তাব করা হয়। অনেক আলোচনার পর দিবা শিশু যত্ন কেন্দ্র করার অনুমোদন দেওয়া হয় এবং এর দায়িত্ব নেয় ‘সেবা’। এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে তিন থেকে সাড়ে তিন বছর সময় লাগে। এখানে ৬ মাস থেকে ১২ বছর বয়সের শিশুদের রাখা হয়। অফিস চলাকালীন প্রায় ৩০ জন শিশুর দেখাশোনার ব্যবস্থা রেখে শুরু হয় এই দিবা শিশু যত্ন কেন্দ্র। এখানে শিশুদের গান, ছড়া শেখানো হয়। এছাড়া পড়ানোও হয়। ছোট শিশুদের অনেক সময় খাইয়ে দিতে হয়। তাদের গোসল করানো, সঠিক সময়ে নাশতা দেওয়া ও দেখাশোনার দায়িত্বে একজন প্রধান ও তিনজন চাইল্ড মাইন্ডার এবং পাঁচজন পরিচ্ছন্নতা কর্মী রয়েছেন। সবাই নারী। মায়েদের সঙ্গে শিশুদের দেখা করার নির্দিষ্ট সময় রয়েছে। সে সময়ে মায়েরা সন্তানের সঙ্গে দেখা করে যান। অনেকে খাবার খাইয়ে দেন। এতে মা যেমন তার কাজ চিন্তামুক্তভাবে করতে পারেন, তেমনি সন্তানও একজন অচেনা কাজের মেয়ের সঙ্গে একাকী থাকার কষ্ট থেকে মুক্তি পায়। কর্মক্ষেত্রে দিবা শিশু যত্ন কেন্দ্রে অনেক শিশু একসঙ্গে ভাইবোনের মতো মিলেমিশে থাকে, যা তাদের মানসিকতাকে সুস্থভাবে গড়ে তুলতে সাহায্য করে। স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস উপলক্ষে নানা অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করা হয়। এতে শিশুরা নাচ-গান করে। এ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশ ব্যাংক প্রচুর অনুদানসহ জায়গা দিয়েছে। তাই সেখানকার নারীরা এ সুবিধা ভোগ করতে পারছেন। ভবিষ্যতে আরও দিবা শিশু যত্ন কেন্দ্র গড়ে তোলার পরিকল্পনা ‘সেবা’র রয়েছে।
বর্তমানে দশটি বেসরকারি ব্যাংকের উদ্যোগেও মতিঝিলে একটি দিবা শিশু যত্ন কেন্দ্র চালু হয়েছে। যদিও চাহিদার তুলনায় তা যথেষ্ট অপ্রতুল। সচিবালয়ে কর্মরত নারীদের জন্য সচিবালয়ের বাইরে একটি শিশু রক্ষণাবেক্ষণ কেন্দ্র রয়েছে। এছাড়া বেসরকারি কিছু কিছু দিবা শিশু যত্ন কেন্দ্র ধানমন্ডি, আজিমপুর, উত্তরায় গড়ে উঠেছে, যা প্রয়োজনের তুলনায় নগণ্য। তাই আরও বহু কেন্দ্র গড়ে ওঠা উচিত। যেসব এলাকায় বেশি ব্যাংক রয়েছে, যেমন মতিঝিল, গুলশান-এসব এলাকায় বেসরকারিভাবে এ ধরনের দিবা শিশু যত্ন কেন্দ্র গড়ে উঠতে পারে। প্রতিটি অফিসে শিশু রক্ষণাবেক্ষণ কেন্দ্র গড়ে ওঠার ওপর অনেকাংশে নির্ভর করছে চাকরিতে নারীদের অংশগ্রহণের হার বৃদ্ধি এবং দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে নারীদের অংশগ্রহণ।
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments