দাদু

ঠাকুরদাদা আমার শৈশবের অনেকখানি জুড়ে আছেন। সমস্ত শৈশব-দিগন্তটা জুড়ে আছেন। ছেলেবেলায় জ্ঞান হয়েই দেখেছি আমাদের বাড়িতে তিনি আছেন।

তাঁর বয়স হয়েছিল প্রায় একশো। জ্ঞান হয়ে পর্যন্ত দেখেছি তিনি আমাদের পশ্চিমের ঘরের রোয়াকে সকাল থেকে বসে থাকতেন। একটা বড়ো গামলায় গরমজল করে দিদি তাঁকে নাইয়ে দিত।

ঠাকুরদাদা চোখে ভালো দেখতে পেতেন না। তাঁকে সকালে হাত ধরে রোয়াকে নিয়ে এসে তাঁর জায়গাটিতে বসিয়ে দিতে হত। তামাক সেজে দিত দিদি। কেবল মা ঠাকুরদাদার ভাতের থালাটি নিয়ে গিয়ে তাঁকে খাইয়ে আসতেন। দিদি আবার তামাক সেজে দিত।

কিছুক্ষণ পরে ঠাকুরদাদা বসে বসে আপনমনে কী বকতেন। একটু বেশি বেলায় বাবা নায়েবি করে কাছারি থেকে ফিরে বাড়ি ঢুকলেই ঠাকুরদাদা অমনি কান খাড়া করতেন। কে এল? হরিশ?

—হ্যাঁ বাবা।

—বাবা হরিশ, আমার বড্ড খিদে পেয়েছে।

—সে কী বাবা, আপনাকে এখনও ভাত দেয়নি?

—না বাবা। খিদেয় মরছি, অ হরিশ। ভাত দিতে বলে দে। বা

বার বয়স পঞ্চাশের ওপর। মাথার চুল প্রায় সব সাদা হয়ে গিয়েছে, বেশ মোটা-সোটা নাদুস-নুদুস চেহারা, সবাই বলে বাবা নাকি দেখতে সুপুরুষ।

বাবা মাকে অনুযোগ করলেন—আচ্ছা বাবাকে এখনও ভাত দাওনি? ছি ছি, এত বেলা হল!

মা বললেন—ওমা, সে কী গো! দশটার সময় যে আমি নিজের হাতে খাইয়ে এসেছি।

বাবা চেঁচিয়ে ডেকে বললেন-ও বাবা—

—কী হরিশ?

—আপনাকে আপনার বউমা খাইয়ে এসেছে যে? কী বলছেন আপনি?

—না না, অ হরিশ, মিথ্যে কথা। আমারে কেউ ভাত দেয়নি, না-খেয়ে মলাম আমি—

বলেই ঠাকুরদাদা ছেলেমানুষের মতো খুঁতখুঁত করে কান্না শুরু করে দিলেন।

মা রাগ করে বলে উঠলেন—বুড়ো বাহাত্তুরে, মরেও না, সাতকাল জ্বালাবে। তোমার সাধের হিমি গিয়ে তোমায় খাওয়াক মাখাক—আমি আর যদি কাল থেকে তোমায় দেখি, তবে আমি বেণী মুখুজ্যের—

বাবা দুঃখিত স্বরে বললেন—আহা-হা, বড়োবউ-ছেলেপিলের সামনে—

—কী ছেলেপিলের সামনে? কে না-জানে সোহাগের হিমির কথা? বাহাত্তুরে বুড়ো, চারকালে গিয়ে ঠেকেছে—

—আহা-হা বড়োবউ! অমন করে গুরুজনকে বলতে আছে? ছি, ছি, তোমার মুখখানা আজকাল বড্ড—

ঠাকুরদাদা তখনও কিন্তু কাঁদছেন ছেলেমানুষের মতো।

কান্নার মধ্যে ডাকলেন—অ হরিশ।

যেন অসহায় আর্ত বালক তার একমাত্র আশ্রয়স্থল পিতাকে ডাকছে।

বাবা জামা-টামা না-খুলেই ছুটে গেলেন, সান্ত্বনার সুরে বললেন—কী বাবা, কী?

—আমি ভাঁত খাঁব—আঁমি না-খেঁয়ে মলাম, অ হঁরিশ! ওরা আমায় নাঁ-খেতে দিয়ে মরবে—খুঁত—খুঁত—

—বাবা, কাঁদবেন না। কাঁদতে নেই। ছিঃ, অমন কাঁদতে আছে!

মা অমনি এ রোয়াক থেকে বলে উঠলেন—আ মরণ, বুড়ো বাহাত্তুরের মরণ দ্যাখো না, যেন দু-বছরের খোকা, ছেলের কাছে কেঁদেই খুন—যমের ভুল এমনও হয়।

বাবা বলেন—আঃ, চুপ করো না বড়োবউ—কী করো!

ঠাকুরদাদা আবার বলেন—খিদে পেয়েছে—ভাত খাব—

—আচ্ছা আচ্ছা, আমি দেখছি—আপনি চুপ করুন।

অবশেষে আবার সামান্য দুটি ভাত বাবা নিয়ে দিয়ে এলেন। ঠাকুরদাদা দিব্যি খেতে বসে গেলেন আবার। মুখে আর হাসি ধরে না।

আমরাও ঠাকুরদাদার কাণ্ড দেখে হেসে বাঁচিনে।

এমনি একদিন নয়, মাসের মধ্যে দশ দিন হত। ইতিমধ্যে দিদি শ্বশুরবাড়ি চলে গেল।

বাবাকে দেখতাম, ঠাকুরদাদার যত কিছু কাজ নিজের হাতে করতেন। কিন্তু তাঁর সময় নেই, সকালে উঠে সন্ধ্যাহ্নিক করে জল-বাতাসা খেয়ে তিনি বেরিয়ে যেতেন কাছারির কাজে। দুপুরে এসে খেয়ে সামান্য বিশ্রাম করে কাজে বেরুতেন, ফিরতে রাত আটটা ন-টা বাজত। এসেই ঠাকুরদাদার ঘরে ঢুকে জিজ্ঞেস করতেন—বাবা, শরীর ভালো আছে? এদিকে ঠাকুরদাদাও সারাদিনের যত অভাব অভিযোগের কাহিনি জমিয়ে রাখতেন ছেলের সামনে পেশ করবার জন্যে সেই সময়।

—আর বাবা, শরীর ভালো! একটু তামাক, তা কেউ দেয় না। টিকে ভিজে, আগুনও ধরল না। আজ এমন মশা কামড়াতে লাগল দুপুরবেলা, মশারিটা কেউ টাঙিয়েই দিলে না—এই দ্যাখো না

লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন

আকর্ষণীয় মূল্য

এক বছর

৪৯৯

এক মাস

৯৯
মেয়াদ শেষে নতুন দামে নতুন করে গ্রাহক হতে হবে

যোগাযোগ করতে

+৮৮ ০৯৬০৬০৩৩৩৯৩
রবিবার–বৃহস্পতি: সকাল ১০টা–সন্ধ্যা ৬টা (সরকারি ছুটিরদিন ব্যতীত) অথবা ভিজিট করুন FAQ

You Might Also Like

Comments

Leave A Comment

Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Get Newsletter

Featured News

Advertisement

Voting Poll (Checkbox)

Voting Poll (Radio)

Readers Opinion

Editors Choice