দ্রবময়ীর কাশীবাস

দু-দিন থেকে জিনিসপত্র গুছোনো চলল। পাড়ার মধ্যে আছে মাত্র তিনঘর প্রতিবেশী—কারো সঙ্গে কারো কথাবার্তা নেই। পাড়ার চারিধারে বনজঙ্গল, পিটুলিগাছ, তেঁতুলগাছ, বাঁশঝাড়, বহু পুরোনো আম-কাঁঠালের বাগান। দ্রব ঠাকরুনের বাড়ির চারিধার বনে বনে নিবিড়, সূর্যের আলো কস্মিনকালে ঢোকে না, তার ওপর বাড়ির সামনে একটা ডোবা, বর্ষার জলে টইটম্বুর, দিনরাত ‘ষাঁকো’ ‘ষাঁওকো’ ব্যাঙের একঘেয়ে ডাক, দিনেরাতে মশার বিনবিনুনি।

দ্রব ঠাকরুনের নাতি বললে—ঠাকুমা, সাবু আছে ঘরে, না বাজার থেকে আনব?

দ্রব ঠাকরুনের কণ্ঠস্বর অতি ক্ষীণ শোনাল, কারণ আজ দু-মাসকাল তিনি ম্যালেরিয়ায় ভুগছেন—পালাজ্বর, ঘড়ির কাঁটার নিয়মে তা আসবে একদিন অন্তর অন্তর ঠিক বিকেল বেলাটিতে। দ্রব ঠাকরুন পুরোনো কাঁথা-লেপ চাপা দিয়ে শুয়ে পড়বেন, উঃ-আ : করবেন—জ্বরের ধমকে ভুল বকবেন।

ও বাড়ির নঠাকরুন এসে জিজ্ঞেস করবেন জানালার কাছে দাঁড়িয়ে—বলি ও দিদি, অমন করচ কেন? জ্বর এল নাকি?

—আর ন-বউ! মলেই বাঁচি! নিত্যি জ্বর, নিত্যি জ্বর—ওরে, হাত-পা কী কামড়ানটা কামড়াচ্চে!…একটু উঠে হেঁটে বেড়াতে দেবে না—এ কী কাণ্ড, হ্যাঁ গা?

পরে মিনতির সুরে বলবেন—ও ন-বউ, নক্ষী দিদি, শীত তো আজ ভাঙল না, কাঁথা গায়ে দিইচি, নেপ গায়ে দিইচি—তুমি ওই বাঁশের আলনার পুরোনো তোশকটা পেড়ে আমার গায়ে যদি দিয়ে দ্যাও–

—চেপে ধরব, হ্যাঁ দিদি?

—ধ—রো–ন-বউ—চেপে ধ-রো—আমার হয়ে গেল!

–ভয় কী, অমন ক’রো না, ছিঃ। টেবু আসবে চিঠি পেলেই, কানু আসবে, বিন্দে আসবে—তোমার নাতিরা বেঁচে থাক, অমন সোনার চাঁদ নাতি সব, ভাবনা কী তোমার দিদি?

—কে-উ-আ-মা-কে—দেখে–না—ন-বউ—

—কেন দেখবে না দিদি—সবাই দেখবে। তুমি বেশি বোকো না, চুপটি করে শুয়ে থাকো–

—আমার গো-রু! গো-রু উ-ও-র-মা-ঠে—

—কোথায় গোরু দিয়ে এসেছিলে?

—জ-টে গ-য়-লা-র অ-ডু-ল খে-তে-র পাশে–

—আচ্ছা আমি এনে দেব এখন গোরু। আমারও গোরু রয়েচে জটে গোয়ালার জমির কাছেই। তুমি শুয়ে থাকো।

আরও ঘণ্টাখানেক পরে বৃদ্ধা ন-ঠাকরুন আবার এসে জানালায় দাঁড়িয়ে বললেন—কম্প থেমেছে দিদি?

ক্ষীণস্বরে লেপ-কাঁথার ছেড়া ভ্রুপের মধ্যে থেকে জবাব এল—গোরু! আমার গোরু তো—

—কোনো ভয় নেই। সে আমি এনেচি। কম্প থেমেচে?

—হুঁ।

সারা বর্ষা দ্রবময়ী এমনি ম্যালেরিয়ায় ভোগেন। তাঁর বড়ো নাতি শ্রীশচন্দ্র ওরফে টেবু কাজ করে ইছাপুরে বন্দুকের কারখানায়, মেজো নাতি পাকশীতে ই. বি. আর.-এ–ছোটো নাতিও ওদিকে যেন কোথায় থাকে। বড়ো নাতি ছাড়া অন্য দুটি অবিবাহিত, বড়ো নাতির আবার একটি ছেলে হয়েছে। আজ বছর পাঁচ-ছয় আগে নাতি ছেলে-বউ নিয়ে বাড়ি এসে দিনসাতেক ছিল। নাতবউ মনোরমা হুগলি জেলার মেয়ে, সে এখানে এসে নাকসিঁটকে থাকে, ‘বাড়ি তো ভারি, মোটে একখানা চালাঘর, হেঁচার বেড়া, এমনিধারা জঙ্গল যে দিনমানেই বুনো শূয়োর লুকিয়ে থাকে—মশার তো ঝাঁক! মাগো, কী কাদা ঘাটের পথে! এখেনে কী মানুষ থাকে নাকি?’ মনোরমার খাঁড়ার মতো নাক আরও উঁচু ও তীক্ষ হয়ে ওঠে। সাতদিন পরে দ্রবময়ীকে নাতির ছেলে খোকনমণির মায়া কাটাতে হয়। তাঁর চোখের জলে বুক ভেসে যায়।

ন-ঠাকরুনকে বলেন—সুদের সুদ, ও যে কি মিষ্টি তা তোমাকে কী বোঝাব ন বউ—

দ্রবময়ীর আকুল ক্রন্দনের মধ্যে যে কতকালের পিপাসিত প্রতীক্ষা সুদূর ভবিষ্যতের দিকে নিষ্পলকে চেয়ে আছে, স্বামীহীনা বন্ধ্যা বিধবা ন-ঠাকরুন তা বুঝতে না-পেরে কেমন অবাক হয়ে যান, হয়তো বা-ভাবেন—দিদির সবই বড়াবাড়ি!

ন-ঠাকরুন আপনার জন কেউ নয়—পাড়ার পাশের বাড়ির প্রতিবেশিনীমাত্র। বছরের মধ্যে গড়ে তিন-চার মাস দুই বৃদ্ধার মধ্যে কথাবার্তা বন্ধ হয়ে যায়, মুখ দেখাদেখি থাকে না—তবুও ঝগড়া কেটে গেলে পাড়ার মধ্যে একমাত্র ন ঠাকরুনই দ্রবময়ীকে দেখাশোনা করেন সবচেয়ে বেশি, জ্বরে শয্যাশায়ী হয়ে থাকলে তাঁর গোরুটাও নিজের গোরু দুটোর সঙ্গে মাঠে বেঁধে দিয়ে আসেন, একটু সাবু হয়তো করে নিয়ে আসেন, অন্তত জানালায় উঁকি মেরে দু-একটা কথাও বলেন।

কিন্তু

লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন

আকর্ষণীয় মূল্য

এক বছর

৪৯৯

এক মাস

৯৯
মেয়াদ শেষে নতুন দামে নতুন করে গ্রাহক হতে হবে

যোগাযোগ করতে

+৮৮ ০৯৬০৬০৩৩৩৯৩
রবিবার–বৃহস্পতি: সকাল ১০টা–সন্ধ্যা ৬টা (সরকারি ছুটিরদিন ব্যতীত) অথবা ভিজিট করুন FAQ

You Might Also Like

Comments

Leave A Comment

Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Get Newsletter

Featured News

Advertisement

Voting Poll (Checkbox)

Voting Poll (Radio)

Readers Opinion

Editors Choice