ভাষা আন্দোলন
সাম্রাজ্য ও সম্পদের লোভে আরব-ইরান থেকে যে মুসলমানরা এ দেশে এসেছিলেন তাঁদের সঙ্গে দেশীয় দীক্ষিত মুসলমানদের একটা মৌল পার্থক্য, এমন কি, এ শতাব্দীতেও দুর্লক্ষ্য নয়। মোগল-পাঠানের সঙ্গে সাম্রাজ্যবাদী ইংরেজদের সাদৃশ্য বরং যথেষ্ট। উভয় গোষ্ঠীই এদেশে এসে শাসনের নামে শোষণ ও স্বৈরাচারে মত্ত হয়েছেন। এরা কখনোই একাত্ম হননি এ দেশীয়দের সঙ্গে। উপরন্তু স্বদেশীয় ভাষা-সংস্কৃতি এবং খানাপিনার প্রতি আত্যন্তিক আনুগত্যবশত এ দেশেই একটি আপন দেশীয় পরিমণ্ডল সৃষ্টি করে, সেই গণ্ডির মধ্যে তাঁরা বাস করেছেন। আর দেশীয় যে-সব নিম্নবর্ণের হিন্দু ও বৌদ্ধরা বর্ণহিন্দুদের অত্যাচার থেকে আত্মরক্ষার উদ্দেশ্যে অথবা সুলতানদের কিংবা মিশনারিদের দয়া ও আর্থিক সুযোগসুবিধার প্রলোভনে ইসলাম বা খৃস্টান ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন, তাঁদের মধ্যেও একটি মিল সহজেই চোখে পড়ে। দীক্ষিতদের প্রথম পুরুষের প্রতি হয়তো আধেক আঁখির কোণে তাকিয়ে সুলতান অথবা মিশরানিরা কিঞ্চিং দয়া বর্ষণ করেছেন, কিন্তু পরিণামে তারা মিশে গেছেন অগণিত দেশীয়দের ভিড়ে।
নতুন নামের আড়ালে আসলে আনুগত্য দেখিয়েছেন পুরোনো ধর্ম ও ঐতিহ্যের প্রতি। এ ছাড়া আরো একদল ছিলেন, যাদের বলা যেতে পারে দোআঁসলা—দোআঁসলা মুসলমান ও দোআঁসলা খৃস্টান (অ্যাংলো-ইণ্ডিয়ান)। এঁরা স্বদেশে চিরদিন পরবাসী—আপনাদের না মোগল পাঠান ইংরেজ বলে ভাবতে পেরেছেন, না পেরেছেন দেশীয় বলে আপনাদের চিহ্নিত করতে।
উনবিংশ শতাব্দীতে বাংলাদেশে মুসলমানদের মধ্যে যাঁরা আদৌ কোনো নেতৃত্ব দান করেছিলেন, তাঁরা এই দোআঁসলা শ্রেণীর। তাঁদের মাতৃভাষা বাংলা একথা তাঁরা কখনোই স্বীকার করেন নি। কেন না, তাঁরা মনে করতেন বাঙালি মুসলমানরা দেশীয় ও দীক্ষিত এবং সে কারণে অন্ত্যজ। অপর পক্ষে, তাঁদের পূর্বপুরুষরা এসেছেন খোদ আরব-ইরান থেকে। তাঁদের ধমনীতে বহমান খাঁটি আর্য অথবা সেমেটিক রক্ত এবং তাঁদের ভাষা আরবি-ফারসি ঘেঁষা উর্দু। বাংলাকে মাতৃভাষা বলে স্বীকার করলে পাছে কাঙ্ক্ষিত কৌলীন্যের হানি হয় এ আতঙ্কে নবাব আবদুল লতীফের মতো পূর্ব বঙ্গীয় বাঙালকে পর্যন্ত ভাণ করতে হতো উর্দুভাষী রূপে। যেহেতু অবাঙালিত্বই ছিলো তখন আভিজাত্যের মাপকাঠি, সে কারণে নবাব আবদুল লতীফ অথবা সৈয়দ আমীর আলী ইংরেজি চর্চার অপরিহার্যতার কথা অনুধাবন করলেও, বাংলাকে আদৌ বাঙালি মুসলমানদের মাতৃভাষা কিংবা শিক্ষার বাহন হিশেবে মেনে নেননি। মুসলমানদের শিক্ষাসম্প্রসারণের চেষ্টা করেছিলেন এই দুই নেতা। তাঁদের আন্তরিকতা অনস্বীকার্য, কিন্তু বাঙালি মুসলমানদের জন্যে মাদ্রাসা-ঘেঁষা যে শিক্ষাব্যবস্থার সুপারিশ করেছিলেন এঁরা, তা কিছু সংখ্যক মুসলমানের আপাত প্রতিষ্ঠা দিলেও, বাঙালি মুসলমান-সমাজকে অন্তত অর্ধ-শতাব্দী পিছিয়ে দিয়েছে।
তাঁদের দৃষ্টির অনচ্ছতা এবং বিজাতীয় মনোভাবের খেশারত দিয়েছেন পরবর্তী মুসলমান জেনারেশন।
উচ্চবিত্ত ও তথাকথিত কুলীন মুসলমানদের সঙ্গে পল্লীর বিপুল সংখ্যক কৃষক শ্রমিক মুসলমানদের ধ্যানধারণার আদৌ কোনো মিল ছিলো না। ইংরেজি শিক্ষা লাভ করে দেশীয়দের ভেতর থেকে মধ্যবিত্ত মুসলমানদের একটি শ্রেণী গড়ে উঠতে অনেক সময় লেগেছিলো। প্রকৃত পক্ষে, এ শ্রেণীর উদ্ভব সম্ভব হয়েছে স্বাধীনতা অর্জনের পরেই। এই মধ্যবিত্তদের মাতৃভাষা বাংলা এবং তা স্বীকার করতে গিয়ে কোনো হীনমন্যতা তাঁদের মনকে পীড়িত করেনি। উপরন্তু চরম ত্যাগের মধ্য দিয়েই তাঁরা মাতৃভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
দ্বিজাতিতত্ত্বের ওপর নির্ভর করে দেশবিভাগের যে আন্দোলন পরিচালিত হয়, তাঁর নায়ক ছিলেন কুলীন নবাবরা—উর্দুকে যাঁরা মাতৃভাষা বলে গণ্য করতেন। এদের পক্ষে উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিশেবে কল্পনা করা অস্বাভাবিক ছিলো না। তদুপরি পাকিস্তানের বিস্তৃত ভৌগোলিক অবস্থান এবং ভাষা-সংস্কৃতির সর্বাত্মক বৈসদৃশ্য একটি সংহত রাষ্ট্র গঠনের প্রতিকূল, মুহম্মদ আলী জিন্নাহ ও তাঁর চেলারা এ সত্য ভালোভাবেই জানতেন। এই জন্যে, প্রথম থেকেই তাঁরা ভাষা ও সংস্কৃতিকে একটি ছাঁচে ফেলে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। তাঁরা ভৌগোলিক দূরত্ব জয় করতে চেয়েছিলেন ধর্মের জিগির তুলে এবং জনগণকে সর্বদা ভারতীয় জুজুর ভয় দেখিয়ে।
বাংলা ও বাঙালির প্রতি শাসকবর্গের মনোভাব মুখোশমুক্ত হয়ে প্রকাশ পায় দেশবিভাগের
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments