পূর্ব বাংলার শিক্ষাব্যবস্থায় সরকারি নিয়ন্ত্রণ
দুর্বল ভিত্তির ওপর দণ্ডায়মান সুউচ্চ মিনারের পতন শুধু সময়সাপেক্ষ। চারিদিক থেকে টানা দিয়ে তার অস্তিত্বকে চিরস্থায়ী করার প্রচেষ্টা করতে পারেন গম্বুজনির্মাতা; কিন্তু পরিণতি তাতে অপরিবর্তিত থাকে। একথা পুনর্বার প্রমাণিত হয়েছে পাকিস্তানের ইতিহাস থেকে। জাতীয়তার একটি মিথ্যা সংজ্ঞার ওপর নির্ভর করে একদা পাকিস্তান সৃষ্টি হয়েছিলো। মুহম্মদ আলী জিন্নাহ অথবা লিয়াকত আলী খান, মুখে যাই বলুন, ভালো করে জানতেন ধর্ম জাতীয়তার একমাত্র শর্ত নয়, সর্বপ্রধান শর্ততো নয়ই: অথচ পূর্ব বাংলা ও পশ্চিম পাকিস্তানের বাস্তবিক ঐক্যসূত্রতো ধর্ম ব্যতীত অন্য কিছু নয়! এই মিথ্যা মিলনকে অমর করার জন্যে দূরদর্শী নেতারা স্বধর্মপ্রীতি, আরো স্পষ্ট করে বললে বলতে হয় স্বধর্মান্ধতা ও পরধর্মের প্রতি বিজাতীয় ঘৃণাবোধ জাগিয়ে তুলতে চেয়েছিলেন—বিশেষ করে পূর্ব বাংলার লোকদের মধ্যে। সরকারি নীতিকে বাস্তবায়িত করার উদ্দেশ্যে পাকিস্তানে গঠিত হয়েছিলো অনেকগুলি কার্যকর প্রচারযন্ত্র। চতুর ফন্দিবাজরা বুঝেছিলেন, বুড়ো ঘোড়াকে নতুন কিছু শেখানো শক্ত, সুতরাং বর্তমান জেনারেশনকে ইসলামের ডুগডুগি বাজিয়ে তাঁরা নাচতে চেয়েছিলেন, আর সাম্প্রদায়িক শিক্ষাকে মিশিয়ে দেওয়ার জন্যে নির্বাচন করেছিলেন ভাবী প্রজন্মকে।
ভাবের অবাধ চলাচল যেখানে নিষিদ্ধ, শিক্ষাকে সেসব দেশে ছেটে-কেটে বিশেষ আকৃতি দিয়ে নিয়ন্ত্রিত অবস্থায় বিতরণ করা হয় শিশুদের মধ্যে। এ শিক্ষা লাভ করে যে যুবক বা যুবতী বেরিয়ে আসে বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডী থেকে, সে কথা বলে তোতা পাখির মতো এবং শেখানো রীতিতে ন্যায়-অন্যায়, ভালো-মন্দ, শত্রুমিত্র বিচার করে, এককথায় স্বাধীন চিন্তা করার ক্ষমতাকে চিরকালের জন্যে পঙ্গু করে তাকে শ্রদ্ধাশীল করে তোলা হয় একটি কৃত্রিম মূল্যবোধের প্রতি। দ্বিজাতিতত্ত্বকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অঙ্গীভূত করার উদ্দেশ্য নিয়েই পাকিস্তানের নেতারা প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত এমন একটি শিক্ষা দিতে চেয়েছেন, যা পাকিস্তানের উভয়াংশের ঠুনকো যোগসূত্রকে দৃঢ় করতে সমর্থ হবে। এই কারণে, মুক্ত চিন্তার বদলে ছাত্রদের তাঁরা দিতে চাইলেন ধর্মীয় সংকীর্ণ শিক্ষা যা তরুণদের যুগপৎ ইসলামের প্রতি মোহাচ্ছন্ন এবং হিন্দু-ভারতের প্রতি বিদ্বিষ্ট করে তুলবে।
একদেশদর্শী শিক্ষানীতিকে ব্যাপ্ত করে দেওয়ার জন্যে প্রথমে সরকার সবগুলি পাঠক্রম নির্ধারক সংস্থার ওপর আপন কর্তৃত্ব স্থাপন করেন। দেশের সাহিত্যের নামে মুসলিম সাহিত্যিকদের পাঠ্য-অপাঠ্য রচনাকে নির্বিচারে উপস্থাপিত করা হলো ছাত্রদের সামনে আর দেশের ইতিহাসের নামে শেখানো হলো আরব-ইরান এবং মুসলিম লীগের ইতিহাস। বালকবালিকারা জানলো সুলতান মাহমুদ বীর সৈনিক, মহম্মদ ঘোরি মহান মুসলিম সুলতান, পৃথ্বিরাজ কাপুরুষ হিন্দু রাজা; ঔরঙ্গজীব দেশপ্রেমিক, শিবাজী দেশদ্রোহী: সুরেন ব্যানার্জি, গোখলে, বিপিন পাল, গান্ধীজী, চিত্তরঞ্জন, সুভাষচন্দ্র, জওহরলাল মুসলিম স্বার্থবিরোধী কূট রাজনীতীক, সৈয়দ আহমদ, আবদুল লতীফ, সলিমুল্লাহ, জিন্নাহ, লিয়াকত আলী উদার স্বাধীনতাসংগ্রামী।
কিন্তু যেহেতু শুধুমাত্র পাঠক্রম নির্ধারণ করেই শিক্ষাকে উদ্দিষ্ট খাতে প্রবাহিত করা যায় না, তার জন্যে প্রয়োজন সে শিক্ষার অনুকূল পাঠ্যপুস্তক, সে কারণেই অতঃপর আইয়ুব খাঁর আমলে একটি টেকস্ট-বুক কমিটি গঠিত হয়। এই কমিটির প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণে রচিত হয়েছে এক-এক শ্রেণীর লক্ষ লক্ষ ছাত্র-ছাত্রীর জন্যে একখানি মাত্র পাঠ্যপুস্তক। আর সে পুস্তকে সত্যের চেয়ে বেশি খাতির পেয়েছে সরকারি বক্তব্য। পাকিস্তান যে মিথ্যার ওপর নির্মিত, তাকে সত্যের চেহারা দিতে এই সকল গ্রন্থে শত মিথ্যার প্রলেপ দেওয়া হয়েছে। বাংলা ভাষা ও সাহিত্য এবং ইতিহাসের সঙ্গে সম্পর্কিত কতিপয় তথাকথিত শিক্ষিত লোক এই পাঠ্যপুস্তকগুলিব নীতি নির্ধারণ করেছেন এবং সেগুলি রচনা করেছেন। স্বার্থান্ধ এই অসাধু বুদ্ধিজীবীরা আদর্শ এবং সত্যকে বিসর্জন দিয়েছেন সবকারি প্রলোভন ও ক্ষুদ্র আর্থিক লাভের মুখে।
কর্তৃপক্ষ যখন দেখলেন বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে তাঁরা কিছুতেই বর্জন করতে পারবেন না, তখন সূক্ষ্মতার পথে তাকে খর্ব করতে উদ্যত হলেন। বিভাগপূর্ব বাংলা সাহিত্য থেকে সকল হিন্দু নামকে ধুয়ে ফেলে তাকে একটা ইসলামি রূপ দেওয়ার চেষ্টা চললো। এই কারণে পূর্ব বাংলার স্কুলপাঠ্য সাহিত্য সংকলনগুলি বাংলা
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments