মিখাইল বাখতিন তত্ত্বের সীমায় প্রয়োগের আকাশে
লেখক: তাপসী বন্দ্যোপাধ্যায়
যাগটা উদারিকরণের। নিবাস এক অগাধ ভুবনগ্রামে। ভাবনার ডানা যত্রতত্র বিহারী। স্থানিক-দূরত্বকে বেঁধে ফেলি হাতের মুঠোয়, আবার সময় পলায়নপর সেই বন্ধনী খুলে। জীবনের এই আকাশপাতাল অমিল অথবা মিল্লিশ্ নিয়ত ধরা দিচ্ছে সৃষ্টির বিচিত্র পথে। আর সাহিত্যের ক্ষেত্রটি এপথে সর্বাধিক প্রশস্ত ও ফলস্ত। এই উত্তর-আধুনিক কালে সাহিত্যের মূল্যায়নে নানা 'বাঁধি বোল' আর 'বাঁধা ওজন'-এর বাড়-বাড়ন্ত। ঔপনিবেশিক্ষতার বাঁধনমুক্ত এইসব সাহিত্যের মূল্যায়নকর্তারা আসলে নানা তত্ত্বকথার আধারে প্রত্যাশা করেছেন অবাধ স্বাধীনতা। নির্মাণ থেকে বিনির্মাণ কিংবা পুনর্নির্মাণ এসবই এখন সাহিত্যের উপভোক্তার কুক্ষিগত। এমনকি সাহিত্যের আস্বাদনে স্রষ্টার ওপর নির্ভরতারও দায়মুক্ত আজ পাঠক। একালের পাঠক প্রবল দাপটে সৃষ্টিকর্তার অধিকারকে অস্বীকার করে পুনঃপাঠ প্রক্রিয়ায় নিমগ্ন হয়। কালান্তরে পাঠক পুনঃপাঠের সূত্রে আবিষ্কার করে নতুন তাৎপর্য। সাহিত্যের সত্য আর অনড় থাকে না। পর্বে-পর্বান্তরে ভিন্ন বর্গীয় পর্যবেক্ষকের কাছে জীবনের পাঠ বদলে যায় বারবার। যাদের কথা এতদিন ছিল আধিপত্যবাদীদের আড়ালে সেই অপাংক্তেয়জনেদের ভাষ্য এবার নতুন পাঠ-পরিক্রমাকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করেছে। অন্তেবাসীদের কণ্ঠস্বর প্রকট হয়ে উঠছে এখনকার সাহিত্য-বিষয়ক অভিসন্দর্ভে। উত্তর-ঔপনিবেশিক এই ধারাবাহিকতায় এভাবেই আশির দশক চিহ্নিত হল 'বাখতিন দশক' হিসেবে।
যদিও মিখাইল মিখাইলোভিচ বাখতিন—এই রাশিয়ান ভাষাতাত্ত্বিক, নীতিতাত্ত্বিক ও উপন্যাসের বহুমুখী শৈলীবিচারকের জন্ম ১৮৯৫-তে। দস্তয়েভস্কির রচনাকে অবলম্বন করে তিনি উপন্যাস পাঠের নতুন অভিজ্ঞতা আবিষ্কার করলেন ১৯২০-তে। জীবনের ও রাষ্ট্রের এবং রাষ্ট্রনীতির নানা উচ্চাবচতা পেরিয়ে ৬০-এর দশকে তাঁর পুরোনো লেখাগুলো আবিষ্কৃত হল। তবে ১৯৭৫-এ তাঁর মৃত্যুর পরে সেইসব রচনা রাশিয়ান ভাষায় এবং ইংরেজিতে প্রকাশ পেতে থাকে। ১৯২০ থেকে ১৯৬৫-র জীবনের বিভিন্ন পর্বে একাধিক গবেষণা সূত্রে মিখাইল বাখতিন সাহিত্য পাঠের ভাষা ও পদ্ধতিতে একাধিক নতুন বাভঙ্গী ও শৈলী যোগ করলেন। বিশেষত তাঁরই দৌলতে উত্তর-আধুনিক যুগে উপন্যাস পড়া কিংবা লেখার ভাষায় এল কতিপয় নতুন শব্দ, ডায়ালগিজম্, হেটেরোগ্লসিয়া, ক্রনোটোপ, পলিফনি এবং কার্নিভ্যাল। একবিংশ শতকের একটি দশক প্রায় পেরিয়ে এসে এইসব শব্দগুলি এখন বহুচর্চিত ও বহুবিতর্কিত। তাই বলে বহু প্রয়োগে জীর্ণ হয়েও যায়নি। তবে তুল্যমূল্য বিচারে না গিয়েও অভিজ্ঞতার নিরিখে একথা সম্ভবত সর্বৈব স্বীকৃত যে, ধ্রুপদি সাহিত্যতত্ত্বগুলি বহুল প্রয়োগের মধ্যে দিয়েই চিরনতুন হয়ে আছে। এখনও নতুনতর ব্যাখ্যার অপেক্ষায় অম্লান। অথচ ভারতীয় অলঙ্কারশাস্ত্রের তত্ত্বকথা কেবল ব্যবহারের অভাবে সিন্দুকধৃত রত্নতুল্য সসম্মানে সাহিত্যের ব্যবহারিক জগত থেকে বর্জিত। তাই প্রথম আধুনিক বাঙালি সাহিত্যসমালোচক বঙ্কিমচন্দ্রকেও ভবভূতির রচনা বিচারকালে আলঙ্কারিকগণকে দূর হতে নমস্কার জানাতে দেখা যায়। এমনকি রবীন্দ্রনাথও অগণন 'রস'-এর কথা বললেও রসতত্ত্বের কথা তেমন করে বলেন না। একারণেই বলা যে, সাহিত্যতত্ত্বের প্রাণভোমরাটি গচ্ছিত তার প্রয়োগ-বহুলতায়। আরও কি, যদি তাত্ত্বিকের আদি নির্দেশকে অপহার না করে তার বিবিধ কৌণিকতা, ভিন্ন ভিন্ন প্রয়োগমাত্রা আবিষ্কার করা যায় তবে বহু বছরের সাহিত্যসূত্রগুলো আরও শানানো, আরও যেন উপযুক্ত হয়ে ওঠে। একথাও মনে হয় যে, সংস্কৃতির আদানপ্রদানের মতোই অন্য দেশের, অন্য ভাষার, অন্য সামাজিকতার সাহিত্যতত্ত্ব ভিন্ন পরিমণ্ডলে যখন গৃহীত ও প্রযুক্ত হয় তখন সেখানেও একপ্রকার এ্যাকালচারেশন ঘটে থাকে। চল্লিশ-পঞ্চাশ-ষাটের দশকের রাশিয়াব সাহিত্যতাত্ত্বিক বাখতিনের তত্ত্বকথাকে যখন একবিংশ শতকে তৃতীয় বিশ্বের কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের বঙ্গভাষী পাঠক তাঁর পাঠসীমায় প্রয়োগের চেষ্টা করেন তখন তা বাখতিনের নির্দেশের হুবহু প্রতিবিম্ব নাও হতে পারে। কিন্তু তাতে বোধহয় মহাভারত অশুদ্ধ হয় না। কেবল সাধ্য আর সাধনের যুগলবন্দিতে ফাঁক না থাকলেই হল। সুতরাং সাধ্যের ক্ষেত্রটিকে প্রথমে যথোপযুক্ততায় তুলে ধরা আবশ্যক। অর্থাৎ বাখতিন-তত্ত্বের আদত চেহারাটি কেমন তার একটি রেখা-অবয়ব দেখে নেওয়া সঙ্গত।
স্বভাবতই তত্ত্বের পরিচিতি দেওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে তত্ত্বগুলির উৎস তথা মূল রচনাগুলির উল্লেখও প্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে। সেইসূত্রে আমরা, পৃথিবীর যে-কোনো প্রান্তের বাখতিন-পাঠকরাই আজ অন্তর্জাল মাধ্যমে জানতে পারি—
সম্ভবত
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments