যুদ্ধের ডাইরী
ময়মনসিংহ সেক্টর
৩০শে আগস্ট ১৯৭১
উমা,
মিথ্যে তোমাকে আশ্বাস দিয়েছিলাম। আজো তোমার মা বাবার খবর নিতে পারিনি বন্ধু। সবুজ গালিচা মাড়িয়ে, তেপান্তরের মাঠ পেরিয়ে, কাজলাদিঘীর ধার দিয়ে, বাঁশ বাগানের পাশ দিয়ে খেয়া পারাপার হয়ে, বাঙ্কারে বাঙ্কারে আর বন বীথিকার ডালে ডালে অনেক ঘুরেছি আমি শহীদ তীতুমীর আর সূর্যসেনের মায়াভরা বাংলার অঙ্গনে অঙ্গনে। ক্লান্ত আমি। পরিশ্রান্ত পথ চলতে নয়, টগবগিয়ে রক্তের উম্মাদনার মাদকতার মাঝে অসতর্ক মুহূর্তের মাশুল দিতে গিয়ে নেমে এলো অবসন্নতা। অথর্ব হাত, অবশ পা আর একাকীত্বের অলস মূহূর্তের কর্ম বিমুখতা অষ্টপ্রহর আমাকে আচ্ছন্ন করে রাখলো। একের পর এক ভীড় জমালো ফেলে আসা দিনগুলোর মিষ্টিমধুর স্মৃতি। অনুরন আর শিহরণে আমি বুঁদ হয়ে গেলাম। স্মৃতির মাধুরীর আমেজে চোখ বুজে এলো। হোঁচট খাওয়া হৃদয় আর মোচড়ে উঠা মন নিয়ে ঝাপসা চোখে চেয়ে দেখি সম্মুখে যে শ্যামলিমা আমাকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে তো যে ধুধু করা মরু। পশ্চাতে, দিগন্তের গা ঘেঁঘে ঘন সবুজ ঘেরা গাড়ো পাহাড়ের শাখা-প্রশাখাগুলোকে কেবলি মনে হচ্ছিল গুরু গম্ভীর কোন মহাঋষির ধ্যানমূর্তি-সৌম্য সহাসে মহীয়ান নয়, গৈরিক বসন পরিহিত ডানা মেলে ভেসে বেড়াচ্ছে তা কেন জানি ফ্যাকাসে মনে হচ্ছে। শরাহত পাখী যন্ত্রণায় ছটফট করে ডানা ঝাপটিয়ে বেড়াচ্ছে একটুখানি সান্ত্বনার প্রলেপ পাবার আশায়। উমা তুমি সেদিন কেঁদেছিলে তোমার ডাক্তারী পাস করা যুবতী বোন সবিতাদির জন্য। আমি কিন্তু হেসেছিলাম। সান্ত্বনা দিয়েছিলাম তোমায়। আজ আমার চোখেও জল। বাংলার পথে প্রান্তরে সংগ্রাম স্থলে উল্কার মত ছুটে বেড়িয়ে শত্রুনিধন করার বজ্র কঠোর শপথ নিয়ে অস্ত্র ধরেছিলাম। আজ সফল শপথ, সফল সংকল্প, এমন কি ঝলসানো অস্ত্রের শব্দ সব কিছু উপচে বার বার মনে পড়ছে; আমি দু'টি নিরীহ অসহায় নিষ্পাপ যুবতী বোনের ভাই এক দুঃখিনী মায়ের সন্তান। দুঃখ করো না বন্ধু, আমি ও আমার নিজের মা বাবার ভাই-বোনের কোন খবর নিতে পারিনি আজো। সম্ভব হয়ে ওঠেনি। কান পেতে শোন, বাংলাদেশের পথে প্রান্তরে হাটে বাজারে, শহরে বন্দরে গ্রামে গঞ্জে, দলিত মথিত আলু থালু বেশিনী বাঙালী মায়ের কোটরাগত সজল আঁখির শোকাতুরা চাহনি। অশোক বনে সীতার কাঁদনে বনবীথিকা পর্যন্ত কেঁদেছিল, ঝরেছিল পত্রপল্লব। কারবালা ফোরাতে মা ফাতেমার বুক ফাটা কান্না "হায় হোসেন, হায় হোসেন” স্বর্গমর্ত্য ভূলোক-ধূলোক একাকার করে দিয়েছিল। কিন্তু দুঃখিনী বাঙালী মায়ের জন্য অশ্রু ঝরাবে কে? কে লিখবে দ্বিতীয় রামায়ণ অথবা বিষাদ সিন্ধু।
লোক মুখে যখন শুনলাম হানাদার দস্যুরা দেশের বাড়িতে (ফেনীতে) আটজন আত্মীয়ের সাথে আমার একশ বছরের বৃদ্ধ পিতামহকে নৃশংসভাবে হত্যা করে তাদের মরদেহকে শিয়াল কুকুর দিয়ে খাইয়েছে, তখন চমকে উঠেছিলাম বৈকি। বুকটা ধড়াস করে উঠলো। প্রচণ্ডবেগে জীপে ব্রেক কষলাম যে মুহূর্তে পাশে বসা মেজর আমিনুল হক (ফরিদপুর বাড়ী) আমার দেশের বাড়ীর হত্যাযজ্ঞের কনফারমেশন দিলেন (৩০শে জুলাই '৭১)। যে মেজর আমিনুল হক তিন দিন পর শক্ত বেষ্টনী থেকে নিজের জীবন বিপন্ন করে আমার অজ্ঞান ক্ষত-বিক্ষত দেহটা উদ্ধার করে এনেছিলেন, সেই মেজর আমিনুল হক সেদিন (১৬ই জুন '৭১) পারেননি তার বৃদ্ধ পিতামাতাসহ আর মামা চাচাদের বাঁচাতে। বিনীত অমায়িক সেই দুঃসাহসিক যোদ্ধা সেদিন কাঁদো কাঁদো স্বরে বলেছিলেন, "আমীন আমি তোমার আত্মীয়-স্বজনকে বাঁচাতে পারিনি। জানো একটি লোক হাপাতে হাপাতে আমাকে তুমি ভেবে এক নিঃশ্বাসে বলে গেলো যে "আপনার দাদাসহ বাড়ীর সবাইকে পাক সেনারা মেরে ফেলে রেখেছে, লাশ পর্যন্ত নিতে দিচ্ছে না।"
প্রথম বুঝে উঠতে পারিনি মেজর আমীন (ফরিদপুর বাড়ী) কি বলছেন তড়িৎবেগে ব্রেক কষতে গিয়ে গাড়ীটাকে পাহাড়ের গায়ে লাগিয়ে দিয়েছিলাম আর কি। চোখটা জ্বালা করছিল। কিন্তু জল গড়িয়ে পড়তে দেইনি। ভাবলাম, মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য এটা
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments