যে স্বপ্ন আমরা সংবিধানে লিখেছিলাম
লেখক: কামাল হোসেন
স্বাধীনতার স্বপ্ন বলতে গেলে প্রথমে সেই ষাটের দশকের কথা যদি আমরা চিন্তা করি, আমরা সবাই তরুণ ছিলাম। আমি নিজেও একজন তরুণ আইনজীবী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ শিক্ষক। আজকে যাঁরা নেতৃস্থানীয়, ষাটের দশকে তাঁদের বেশির ভাগই ছিলেন তরুণ ছাত্র। সেই পাকিস্তানে আমরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়েও অসহায় বোধ করতাম।
ষাটের দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে লেখালেখি শুরু হলো অর্থনৈতিক বৈষম্য নিয়ে। আমরা বাঙালিরা সংখ্যায় বেশি হয়েও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে, শিক্ষার সুযোগের ক্ষেত্রে, সিভিল সার্ভিসে, সামরিক বাহিনীতে বিভিন্ন ধরনের কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার ছিলাম। ১৯৪৬ সালে পূর্ব বাংলায় যখন ভোট হয়েছিল, আমরা ভোট দিয়েছিলাম। আমরা চেয়েছিলাম, এই রাষ্ট্রটি হোক। তখন কেউ কেউ এটা সাম্প্রদায়িক রাজনীতি কি না এরূপ মন্তব্য করেছিল। আমি মনে করি, সেটা ছিল জনগণের ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে। আমরা সংখ্যাগরিষ্ঠ, শোষিত। আমরা অর্থনৈতিক মুক্তি লাভ করব। সমাজ পরিবর্তন করতে পারব গণতান্ত্রিক শাসনকাঠামোর মধ্য দিয়ে। সেই কারণে ভোট দেওয়া হলো যে একটা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হবে, যেখানে সেই সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ, আমাদের পূর্ব বাংলার জনগণ এই রাষ্ট্রে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সমাজ পরিবর্তনের পদক্ষেপ নিতে পারবে এবং অর্থনৈতিক মুক্তি আনতে পারবে। শুরুতেই আমরা দেখলাম যে তারা আমাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতাকে কোনো মূল্যই দিচ্ছে না। বিষয়টা আমরা প্রথম বুঝতে পারলাম, যখন ভাষার ব্যাপারে তারা অন্যায়ভাবে অবস্থান নিল যে, বাংলা রাষ্ট্রভাষা হতে পারে না। আমাদের ভাষাকে তারা স্বীকৃতি দেবে না। ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আমাদের সেই অনুভূতি, আমাদের সেই স্বপ্ন ষাটের দশকের ছয় দফা, ১১ দফার মধ্য দিয়ে আমরা তুলে ধরলাম। এটার ওপর ভর করে আমরা স্বপ্ন দেখেছি। আমরা বুঝতে পেরেছি জনগণের শক্তি ঐক্যবদ্ধ শক্তি।
'৫২, '৫৪ সালের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে আমরা বুঝতে পারলাম, কায়েমি স্বার্থবাদী শাসকগোষ্ঠী ধর্মকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে বিভেদ সৃষ্টি করতে চায়। আমরা দেখলাম যে উগ্র সাম্প্রদায়িক কথাগুলো তারা মাঠে নিয়ে আসে। বলে বাংলা তো মুসলমানদের ভাষা না। সংস্কৃতের সঙ্গে এর সম্পর্ক আছে। এটাই কিন্তু প্রত্যাখ্যান করেছে বাংলার তরুণ সমাজ, বাংলার সচেতন জনগণ। এই কথাটা গ্রামে গ্রামে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তরুণ ছাত্র সমাজ এটা নিয়ে গেছে। বায়ান্নতে বরকত, সালাম, জব্বার শহীদ হওয়ার পর শহীদ মিনার হয়ে গেল আমাদের স্বপ্নের প্রতীক। বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিকাশ সেখানে ভাষাভিত্তিক। আমরা সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান, এটা নিয়ে কোন বিতর্ক নেই। কিন্তু ভাষাভিত্তিক হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান আমাদের ঐক্যের ভিত। এখানে কিন্তু একটা সুন্দর সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি গড়ে উঠেছে। উপমহাদেশে যেখানে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি থাকেনি, কিন্তু পূর্ব বাংলায় আমরা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ধরে রাখতে পেরেছি। '৬৪ সালে অবশ্য জঘন্য একটা চেষ্টা হয়েছিল।
'৫৪ সালে নির্বাচন হয়। তার পাঁচ বছর পর '৫৯ সালে সাধারণ নির্বাচন হতে যাবে, তখন '৫৮ সালের শেষ দিকে মার্শাল ল জারি করা হলো, বাঙালিরা যাতে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে রাষ্ট্রকে তাদের নিয়ন্ত্রণে আনতে না পারে। সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়েও আমরা তাই ক্ষমতাহীন থাকলাম। সামরিক শাসন আমাদের ক্ষমতাহীন করে দিল।
আমাদের প্রথম স্বপ্নের কথা হলো জনগণের ক্ষমতায়ন। দুই নম্বর কথা হলো আমাদের যে শাসনকাঠামো ছিল, কেন্দ্রে সবকিছু কুক্ষিগত করে তখন ২২ পরিবার সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করত, সেখান থেকে মুক্ত হয়ে দেশ ও সম্পদকে জনগণের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা।
ষাটের দশকে এ বিষয়টি মানুষের সামনে আসতে শুরু করল। তরুণ সমাজ এটা ধরতে শুরু করল যে, আমাদের একটা মৌলিক গুণগত পরিবর্তনের প্রয়োজন আছে। এর মধ্য দিয়ে কিন্তু এল ছয় দফা ও ১১ দফা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন। তিনি এই কথাটা মানুষের সামনে তুলে ধরে মানুষকে ভরসা দিলেন। জনগণের ক্ষমতায়ন যদি হয় লক্ষ্য, তার পথ হবে জাতীয়
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments