পরিচালনা সম্পর্কে প্রশ্নোত্তর
[নির্মাতা ঋত্বিক ঘটকের এই সাক্ষাৎকারটি বাংলা চলচ্চিত্রচর্চার ইতিহাসে এক অনন্য দলিল। এখানে তিনি চলচ্চিত্রের অর্থনৈতিক বাস্তবতা, শিল্পগত উৎকর্ষ, সাহিত্যনিরপেক্ষতা, এবং নিজের নির্মাণ-প্রক্রিয়া নিয়ে গভীর ও তীক্ষ্ণ বিশ্লেষণ করেছেন। তাঁর উত্তরগুলো শুধু ব্যক্তিগত মতামত নয়—চলচ্চিত্রের দর্শন, দর্শকের রুচি, এবং শিল্পের অন্তর্নিহিত জটিলতা নিয়ে এক অন্তর্দৃষ্টিপূর্ণ আলোচনা। চ্যাপলিন থেকে ‘পথের পাঁচালী’, ফ্ল্যাহাটি থেকে আইজেনস্টাইন—ঘটক তাঁর উত্তরগুলোতে তুলে এনেছেন বিশ্বচলচ্চিত্রের নানা দৃষ্টান্ত, যা পাঠককে ভাবায়, প্রশ্ন তোলে, এবং চলচ্চিত্রকে নতুন চোখে দেখতে শেখায়। এই সাক্ষাৎকারটি শুধু পরিচালনার প্রশ্নোত্তর নয়, বরং চলচ্চিত্রের গভীরতর সত্যের সন্ধান।—বাংলাপুরাণ]
প্রশ্ন: আপনার মতে অর্থনৈতিক দিক বজায় রেখে উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রসৃষ্টি সম্ভব কি না?
উত্তর: সম্ভব। অবশ্য উল্লেখযোগ্য চিত্রনির্মাণ বলতে আপনারা কী বলতে চান, ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। উল্লিখিত হবার মতো যোগ্যতা নানা ধরনের ছবির থাকতে পারে—‘টেন কম্যান্ডমেন্টস’ থেকে আরম্ভ করে ‘অ্যাশেস অ্যান্ড ডায়মন্ডস’-এর মতো ছবি। আপনাদের মাথায় যদি এই থেকে থাকে যে, চিত্রের স্বকীয় শিল্পগত বৈশিষ্ট্য বজায় রেখে পয়সা পাবার মতো ছবি—তা হলেও বলব সম্ভব।
অর্থনৈতিক দিক মানেই জনপ্রিয়তা। অর্থাৎ দেশ, কাল অনুপাতে মানুষের শিক্ষা ও রুচির ন্যূনতম যে পরিমাপ তাকে ভিত্তি করে শিল্পগত উৎকর্ষে পৌঁছবার প্রশ্ন। এটা যে সম্ভবপর তা চ্যাপলিন থেকে ‘পথের পাঁচালী’ পর্যন্ত প্রমাণ করেছে। চ্যাপলিন-এর সেন্টিমেন্টাল মেলোড্রামাগুলি—‘সিটি লাইট্স’ ‘গোল্ড রাস’ অথবা ‘লাইমলাইট’ (বড়ো ছবিগুলোর কথাই বললাম) সাধারণ মানুষের বোধগম্য মানবিক সম্পর্ক এবং তার আবেদনগত বিকাশকে আশ্রয় করেই পৃথিবী সম্পর্কে এক ব্যক্তিগত শিল্পীর দৃঢ়তম উপলব্ধিকে পরিষ্কারভাবে প্রকাশ করতে পেরেছেন।
অর্থাৎ সম্ভব। কিন্তু খুব কঠিন। উত্তীর্ণ রসশিল্পী যাকে ইংরাজিতে বলে, completely consummated artist, এঁদের দ্বারা ছাড়া আর কারও এ-কর্ম মানাবে না সহজে। সাধারণত মোদ্দা ব্যাপারটা জোলো হয়ে যায়, ফিকে হয়ে যায় ওই অর্থনৈতিক দিকের কথা ভাবতে গেলে। কাজেই ঘটনাটা ঠিক ব্যক্তিগত মতামতের অপেক্ষা রাখে না—দৃষ্টান্তের অপেক্ষা রাখে। যখন হয় তখন অপূর্ব সমন্বয়ের ভেতর দিয়ে এক অখণ্ড রূপানুভূতিতে পরিব্যাপ্ত হয়ে সে শিল্পকর্ম দেখা দেয়, আর যখন হয় না, তখন সুকুমার রায়ের বকচ্ছপ মূর্তি নিয়ে দেখা দেয়।
এই তো মনে হয় মোট ব্যাপারটা।
প্রশ্ন: আপনার অভিজ্ঞতায় চলচ্চিত্রের দুরূহতম দিক কোনটি এবং কেন?
উত্তর: আপনাদের দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর প্রথমের মধ্যেই পাবেন।
প্রশ্ন: আপনার শ্রেষ্ঠ ছবি কোনটি? তার নির্মাণে আপনি কী ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন?
উত্তর: তৃতীয় প্রশ্নের উত্তর দেওয়া আমার পক্ষে একেবারেই সম্ভবপর নয়। আমার হাত আসতে আসতেই আরও বছর দশেক কেটে যাবে বলে মনে হচ্ছে। তখন হয়তো এ ধরনের প্রশ্নের কথা ভাবা যেতে পারে।
এই প্রশ্নের দ্বিতীয় অংশ যেটা সেটারও পরিষ্কার ব্যাখ্যা করা এরকম প্রশ্নোত্তরের পরিধির মধ্যে সম্ভবপর নয়। পরে বিস্তৃতভাবে বলার ইচ্ছা রইল সুযোগ পেলে।
প্রশ্ন: বর্তমানে কয়েকজন য়ুরোপীয় চলচ্চিত্রশিল্পীর ধারণা এই যে, চলচ্চিত্র-শিল্পের চরম উৎকর্ষ তখনই, যখন তা সাহিত্যনিরপেক্ষ হয়ে স্বাধীনভাবে শিল্পসৃষ্টিতে সমর্থ হবে। আপনার মত কী?
উত্তর: কয়েকজন য়ুরোপীয় চলচ্চিত্রশিল্পী বলতে আপনারা আরও পরিষ্কার হতে পারতেন। বিশেষ করে মস্কো ফিল্ম ফেস্টিভাল-এর সেমিনার-এর আলোচনাটা তুলে ধরতে পারতেন। কারণ কয়েকজনের মধ্যে প্রত্যেকেই নিজস্ব একটি করে দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে এগিয়েছেন এবং তাঁদের নিজেদের মধ্যে তফাত আছে। কাজেই এ তর্কের জের না টেনে সোজাসুজি সাহিত্য-নিরপেক্ষ নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে।
চলচ্চিত্রের উন্নতি বলতে আপনারা কি তার স্বাধীন বিকাশের কথা জিজ্ঞেস করছেন? এমন ছবি তো বহু হয়ে গেছে। ফ্ল্যাহাটি-র সবকটা ছবি, আইজেনস্টাইন-এর প্রধান ছবিগুলি, দেসিকা ও জাভাতিনি-র কাজগুলি, হাজার হাজার দৃষ্টান্ত দেওয়া যায়। তাই বলে কি আমি ভাবব পদভকিন-এর ‘মাদার’ চলচ্চিত্রের উন্নতি করেনি? এ ধরনের ছবিও তো প্রচুর রয়েছে। তর্কটি Source
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments