শব্দ তাড়িত
ছোট্ট শহরের একটা বাসায় আমি ও সাজাহান থাকতাম। ঢাকায় একটা দৈনিকে এর আগে চাকরী করেছি এবং এর পরে দুজনাই একসঙ্গে বেতার কেন্দ্রে জয়েন করলাম। এমন কি একই কামরায় আমাদের আসন পাতা হ’ল। ফলে সবদিক থেকে আমাদের ঘনিষ্ঠতা এতই বেড়ে গেল যে, অফিসের খুব কাছাকাছি একসঙ্গে বাসা নিলাম।
ছোট্ট বাসা হলেও দুজনার জন্যে তিনটা কামরা এখন বিলাসিতা বলেই মনে হয়। তিন কামরার একটা ছিমছাম বাসা। ভেতরের দিকে রয়েছে সবুজ ঘাসের বিস্তৃত চত্বর। দু’পাশে রয়েছে ইট বিছানো সরু রাস্তা। আর এই রাস্তার ইটের ফাঁকে ফাঁকে অনাদরে বেড়ে উঠেছে ঘাস। এই রাস্তাই এক দিন আমার জীবনকে করে তুলেছিল বিপন্ন! ঘটনাটি ঘটেছিল মার্চে। তখন সারা বাংলাদেশে আন্দোলনের দুর্বার জোয়ার। পদ্মা-মেঘনা-যমুনার প্রমত্ত ঢেউ যেন শহর-বন্দরে আছড়ে পড়েছে। চব্বিশ দিনের অসহযোগ আন্দোলন যেন চব্বিশ বছরের অত্যাচারের বিরুদ্ধে বাঙালীদের জ্বলন্ত প্রতিবাদ।
সেই সব আন্দোলনের দিনগুলোতে আমাদের কাজের সময়সীমা দ্বিগুণ হ’ল। নির্ধারিত কাজ ছাড়াও আমাদের সহকর্মী পাঁচ জনকে সকাল পাঁচটা থেকে রাত বারোটা পর্যন্ত পালাক্রমে ট্রান্সমিশনে ডিউটি দিতে হ’ত। টান্সমিশনের যখন চার্জ পড়ত তখন সম্পূর্ণ বেতার কেন্দ্রের গুরুদায়িত্ব পড়ত কাঁধে। আর এর জন্য রাত হলে কার্ফু হওয়ার সাথে সাথে সুবেদার থেকে শুরু করে মেজর পর্যন্ত ক্ষিপ্ত কুকুরের মত এসে অফিসার-ইন-চার্জের ওপর হুঙ্কার ছেড়ে বলত, ‘পাঞ্জাবী নাঘমা ক্যিউ বাজায়া নেহী’। তাদেরকে যা বোঝাতাম তার অর্থ এই নয় যে, সব পাঞ্জাবী রেকর্ডগুলো আর কোনদিন বাংলাদেশের বেতার কেন্দ্র থেকে অহরহ বাজবে না।
কার্ফুর সময় মিলিটারিই গাড়ি করে পৌঁছে দিত। এমন একদিন সন্ধ্যার পর বাসায় ফিরেছি। ধরতে গেলে বারো ঘণ্টা ডিউটি দেয়ায় শরীর ও মন দুইই অত্যন্ত ক্লান্ত। তাড়াতাড়ি কোনরকমে খেয়ে দেয়ে ইলেকট্রিক বাতি নিবিয়ে ঘরের এক কোনায় মোমবাতি জ্বালিয়ে রেখেছি। কার্ফু-গ্রাসে সারা শহর। রাত হলে প্রত্যেক ঘরবাড়ি এমনিতে ভূতুড়ে হয়ে পড়ে। যেন শহরে ব্লাকআউট হয়েছে।
কোন বাড়িতে সাড়াশব্দ নেই। মাঝে মাঝে কুকুরের আর্তনাদ আর সেনাবাহিনীর ভারী ভারী গাড়ির দ্রুত চলাফেরার শব্দ ভেসে আসে।
তখনই ঘটনাটি ঘটে গেল। রাত তখন সাড়ে দশটা বেজে গেছে। চার দিক নিস্তব্ধ-নিঝুম। ঘরের দরজা-জানালা ভাল করে আঁটা আছে। ঠিক এমনি মুহূর্তে কথোপকথনের মত ফিসফিস শব্দ ভেসে এল আমার শিয়রের জানলার কাছ থেকে। ভয়ে তাড়াতাড়ি মোমবাতিটি নিবিয়ে দিতেই যেন বাইরের শব্দটা সচকিত হ’ল এবং তখনই বুট জুতোর শব্দ স্পষ্ট শুনতে পেলাম। শব্দটা হয়তো ভাবল, আমি তার উপস্থিতিটা টের পেয়েছি, আর তাই বুঝি আত্মগোপন করতে চেষ্টা করছে। সাজাহান আমার বিছানায় পাথরের মূর্তির মত বসে আছে! অন্ধকার আমাদের চারপাশকে ভয়াবহভাবে জাপটে ধরছে। আমরা কেউ কারো মুখ দেখতে পেলাম না। তবু বুঝলাম, অসন্ন বিপদের মুখে আমাদের মুখ নীল হয়ে গেছে। বিছানা থেকে উঠবার শক্তিটুকুও যেন মুহূর্তের মাঝে লয় হয়ে গেছে পালাবার কোন পথ নেই। মিলিটারি হলে নির্ঘাত এ্যারেস্ট করে নিয়ে যাবে এবং তারপর—ভাবতে পারলাম না। ভেসে উঠল কয়েকদিন আগে কয়েকজন নিরপরাধ নিরস্ত্র পথচারীর মৃত্যুর ভয়াবহ দৃশ্য। ভাবতে ভাবতে আবার সেই শব্দ শুনতে পেলাম। হ্যাঁ, এবার পরিষ্কার শুনলাম দু’-তিন জোড়া বুটজুতোর শব্দ। যেখানটায় শুয়ে শুয়ে রেডিও শুনছিলাম সেদিকটায় যেন ফিসফিস্ শব্দ করে ঘরের দেওয়াল ঘেঁষে এগিয়ে আসছে। আতঙ্কে সারা শরীর ঝাঁকুনি দিয়ে উঠল। কাঁপছি। ঘামে ভিজে যাচ্ছি, তবু নড়তে পারছি না। বুক-মুখ শুকিয়ে আসছে। থাকতে পারলাম না। শুল্ক গলায় দম আটকে গিয়ে হঠাৎ কেশে ফেললাম। আর যায় কোথা? শব্দটা দৌড়ে পিছিয়ে গিয়ে নীরব হয়ে গেল, কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর খালি পায়ে পেছনের কামরায় গিয়ে দরজার হুক খুব সন্তর্পণে খুলে রাখলাম—যে-কোন পরিস্থিতির সম্মুখীন
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments