-
ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে : বন্দীশালার ভিতর থেকে
নলিনী দাস
১৯৩০-১৯৩১ সালে ধরা পড়ে আমরা বিপ্লববাদীরা যখন জেলে গেলাম—তখন ফ্যাসিবাদ কেন, সাম্রাজ্যবাদ কথাটারও সঠিক মানে বুঝতাম না। আমরা বুঝতাম আমাদের শত্রু বিদেশী ইংরেজ রাজত্ব; তারা শোষক ও লুণ্ঠনকারী। তাদের তাড়াতে হবে, পরাধীনতার শৃঙ্খল চূর্ণ করতে হবে। আন্দামানে দ্বীপান্তরে যখন গেলাম, তখনও এই রকমই মনোভাব।
আন্দামানেই প্রথম শুরু হল সবকিছু তলিয়ে বুঝবার চেষ্টা। পৃথিবীর নতুন নতুন ঘটনাবলী, নিজেদের তিক্ত অভিজ্ঞতা এবং দেশকে স্বাধীন করবার উদগ্র বাসনা—সবকিছু মিলিয়ে আমরা অসীম আগ্রহ নিয়ে জানতে চাইলাম, বুঝতে চাইলাম—সাম্রাজ্যবাদ কি, সমাজতন্ত্রই বা কি, মুক্তির পথই বা কি রকম?
আন্দামানে প্রথম দিকে ওরা আমাদের কাছে খবরের কাগজ, পত্রিকা,
-
রাশিয়ার রণাঙ্গনে নির্ধারিত হবে গণতন্ত্রের জীবনমরণ। মিত্রশক্তির ভাগ্য এখন কমিউনিস্টদের হাতে। রাশিয়া যদি পরাভূত হয়, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ও সমৃদ্ধ মহাদেশ এশিয়া চলে যাবে নাৎসিদের অধীনে। প্রায় পুরো প্রাচ্যদেশ জাপানীদের করতলগত হওয়ায় নাৎসিরা পৃথিবীর প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ রণসামগ্রী একেবারে নাগালের মধ্যে পেয়ে যাবে। এরপর হিটলারকে হারাবার আর কি সুযোগ থাকবে আমাদের?
এদিকে যানবাহনের অসুবিধা, হাজার হাজার মাইল দূরে আমাদের যোগাযোগ রক্ষার সমস্যা, ইস্পাত, তেল ও রাবারের সমস্যা এবং বিভেদ সৃষ্টি করে জয় করার হিটলারি রণকৌশল—এ অবস্থায় রাশিয়া যদি পরাজিত হয়, আমাদের অবস্থা হবে সঙ্গিন।
কেউ কেউ বলেন, তাতে আর কি? যুদ্ধ না হয় আরও দশ কি কুড়ি বছর চলবে। আমার
-
কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের কার্যনির্বাহী কমিটির ত্রয়োদশ প্লেনাম সঠিকভাবেই শাসনক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ফ্যাসিবাদকে সবচেয়ে প্রতিক্রিয়াশীল, সবচেয়ে জাতিদাম্ভিক এবং লগ্নী পুঁজির সবচেয়ে সাম্রাজ্যবাদী প্রতিভূর প্রকাশ্য সন্ত্রাসবাদী একনায়কত্ব বলে বর্ণনা করেছিল।
সবচেয়ে প্রতিক্রিয়াশীল ধরনের ফ্যাসিবাদ হল জার্মান ফ্যাসিবাদ। এর নিজেকে জাতীয় সমাজতন্ত্র বলে অভিহিত করায় ধৃষ্টতা রয়েছে, যদিও সমাজতন্ত্রের সঙ্গে এর কোনই মিল নেই। হিটলারের ফ্যাসিবাদ শুধুমাত্র বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদ নয়, এ হল পাশবিক জাতিদম্ভ। এ হল রাজনৈতিক দস্যুতার এক শাসনব্যবস্থা, শ্রমিকশ্রেণী, কৃষক, পেটি বুর্জোয়া ও বুদ্ধিজীবীদের বিপ্লবী অংশের বিরুদ্ধে প্ররোচনা ও নির্যাতনের ব্যবস্থা। এ হল মধ্যযুগীয় বর্বরতা ও পাশবিকতা, অন্যান্য জাতিদের সম্পর্কে বল্গাহীন আক্রমণ।
জার্মান ফ্যাসিবাদ আন্তর্জাতিক প্রতিবিপ্লবের উদ্যত খড়গ হিসাবে, সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধের প্রধান প্ররোচক
-
যুদ্ধের গোড়ার দিকে কয়েকমাস আমাদের সৈনিকরা ফ্যাসিস্ট সৈন্যদের প্রকৃতি সম্পর্কে সম্পূর্ণ অন্ধকারে ছিল। কাজেই বিপক্ষের সৈনিকদের ওরা শত্রু বলে ভাবতে পারত না। ঐ সময় আমাদের সৈনিকদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনায় কখনও নিরাশ হয়েছি, আবার কখনও গৌরব বোধ করেছি।
গৌরবের বিষয় এই যে আমাদের সৈনিকরা সৌভ্রাত্রের শিক্ষা পেয়েছে, আর নৈরাশ্য এজন্য যে ফ্যাসিস্ট সৈনিকদের প্রকৃতি না বুঝে ওদের উপর আমাদের-সৈন্যরা আস্থা রেখেছিল।
যখন হিটলারের সৈন্য একটার পর একটা শহর অধিকার করে এগিয়ে আসছে, তখনও লালফৌজ ভাবছে জার্মানির শ্রমিক-কৃষক-যারা এই যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে—কখনও ফ্যাসিজমকে মেনে নিতে পারবে না। হিটলারের জার্মানি ফ্যাসিস্ট জার্মানি; সে তুলনায় এই সব সাধারণ সৈনিকদের জার্মানির প্রকৃতি ভিন্ন; যখনই সুযোগ আসবে,
-
বণিক, শিল্পপতি, মূলধনী—ধনতন্ত্রের তিন মূর্তিরই মোক্ষ হইল মুনাফার রাজত্ব বিস্তারে। কিন্তু ইহার বাধাও অনেক। প্রথমত ধনতন্ত্রের ভিতরে ধনিক গোষ্ঠীতে গোষ্ঠীতে বিরোধ থাকে। সকল দেশের ধনতন্ত্রের উন্নতি সমান তালে চলে না। কাজেই কোনো কোনো দেশের ধনিকগোষ্ঠী মুনাফা শিকারের প্রতিযোগিতায় পিছনে পড়িয়া থাকে। ইহাদের অগ্রগতির বাধা দু’দিকে। প্রথমত, শোষণের বিরুদ্ধে নিঃস্ব মজুরশ্রেণীর প্রতিবাদ, বিদ্রোহ এবং সংঘবদ্ধ প্রতিরোধশক্তি বাড়িতে থাকে। দ্বিতীয়ত, অন্য দেশের প্রতিদ্বন্দ্বী ধনিকগোষ্ঠীর দুনিয়ার ব্যবসার বাজার দখল করিয়া ফেলিতে থাকে। ধনতন্ত্রের এই সংকটে-দেশে দেশে ধনিকগোষ্ঠীগুলির মধ্যে দুনিয়ার বাজার ভাগবাটোয়ারা নিয়া-কাড়াকাড়ি মারামারি শুরু হয়। জাপানের মাঞ্চুরিয়া দখল, ইটালির আবিসিনিয়া দখল, নাৎসি জার্মানির উপনিবেশ দাবি এই সকলই নিজেদের দেশের ধনিক-গোষ্ঠীর মুনাফা শিকারের পথ
-
পয়লা মে-র ভোর।
জেলখানার গম্বুজের ঘড়িতে বাজল তিনটে। এই প্রথম আমি স্পষ্ট শুনতে পেলাম। এখন আমি পূর্ণ সচেতন। খোলা জানলা দিয়ে বিশুদ্ধ-হাওয়া আসছে, মেঝেয় পাতা গদির চারদিকে খেলে বেড়াচ্ছে, হাঁ, অনুভব করতে পারছি খড়গুলো লাগছে। নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে, আমার দেহের-প্রতি জায়গায় যেন হাজার বেদনা জড়িয়ে আছে। হঠাৎ জানালা খুলে দিলে যেমন সব স্পষ্ট দেখা যায়, তেমনি স্পষ্ট বুঝলাম আমার অন্তিমকাল এসেছে। আমি মরছি।
অনেক দেরি করে এলে মরণ। একসময়ে আশা ছিল, বহু বহুদিন পরে তোমার সঙ্গে হবে আমার পরিচয়। স্বাধীন মানুষ হয়ে বাঁচতে চেয়েছিলাম। কত কাজ করতেও তো চেয়েছিলাম, চেয়েছিলাম ভালোবাসতে। ভেবেছিলাম ঘুরে বেড়াব পৃথিবীতে, আনন্দে গান গাইব। তখন
-
[১৯৩৫ সালে কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের সপ্তম কংগ্রেসে কমরেড জর্জি ডিমিট্রভের যুক্তফ্রন্ট তত্ত্ব গৃহীত হওয়ার পূর্বই ১৯৩৪ সালে গ্রেট ব্রিটেনের কমিউনিস্ট পার্টি এবং বিশ্ব-কমিউনিস্ট আন্দোলনের সুপরিচিত নেতা ও তাত্ত্বিক কমরেড রজনী পাম দত্ত ‘ফ্যাসিজম অ্যান্ড সোশাল রেভলিউশন’ গ্রন্থ মারফত শ্রমিকশ্রেণীর হাতে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামের একটি তীক্ষ্ণ তত্ত্বগত হাতিয়ার তুলে দেন।
আর্থনীতিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে তিনি দেখান ফ্যাসিবাদ হচ্ছে ক্ষয়িষ্ণু পুঁজিবাদের মরিয়ার মতো টিকে থাকার চেষ্টা। ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে আপসহীন সংগ্রাম তাই শ্রমিকশ্রেণীর আন্তর্জাতিক কর্তব্য।বইটির দ্বাদশ অধ্যায়ে তিনি পুঁজিবাদের প্রথম মহাযুদ্ধ পরবর্তী বিশ্বজোড়া সংকট, ‘পুজিবাদের স্থিতিশীলতা’ তত্ত্বের অন্তঃসারশূন্যতা এবং ক্ষয়িষ্ণু পুঁজিবাদের গর্ভ থেকে কিভাবে ফাইনান্স ক্যাপিটালের মালিকদের সাহায্যপুষ্ট চরম সন্ত্রাসবাদী ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রযন্ত্র
-
রবীন্দ্রনাথের সমগ্র চিন্তা ও সাহিত্যসৃষ্টির ধারা অনুসরণ ও অনুধাবন করলে দেখা যায় তাঁর প্রথম প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ‘কবিকাহিনী’ থেকে শুরু করে জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত এক বিশেষ মৌল জীবনসত্তার অনুভব বিকশিত ও পুষ্ট হতে হতে চলেছিল—যাকে আমরা বলতে পারি অন্যায় অত্যাচারের বিরুদ্ধে, লোভী হিংস্র আগ্রাসনের বিরুদ্ধে—অতন্দ্র অভিযান, শাণিত প্রতিবাদ।
উচ্চ অভিজাতকুলে জন্মে, তৎসাময়িক জীবনধারা ও ধারণাকে আত্মস্থ করেও পদে পদে তিনি নিজেকে উত্তীর্ণ করে চলেছেন প্রাগ্রসর জীবনবোধের দিকে। মনে হয়, যেন ব্রাহ্মসমাজদর্শন ও উপনিষদের মূল ধারাকে তিনি অঙ্গীকৃত করেও রূপান্তরিত করেছিলেন বৈজ্ঞানিক সমাজচেতনা ও মূল্যায়নের দিকে। তাই দেখতে পাই যখনই বিশ্বমানবসমাজের কোনো অংশ হিংস্র আগ্রাসনের শিকার, তখনই সদাজাগ্রত রবীন্দ্রনাথ প্রতিবাদে মুখর।
ক্যাটাগরি
ট্যাগ
লেখক
- আর্নেস্ট হেমিংওয়ে (১)
- আলেকজান্ডার ওয়ার্থ (১)
- ইলিয়া এরেনবুর্গ (১)
- কিরণশঙ্কর সেনগুপ্ত (১)
- গ্যাব্রিয়েল পেরি (১)
- চার্লি চ্যাপলিন (১)
- জঁ-পল সার্ত্র (১)
- জর্জ বার্নার্ড শ (১)
- জর্জি ডিমিট্রভ (১)
- জুলিয়াস ফুচিক (১)
- নলিনী দাস (১)
- নৃপেন্দ্রনাথ বন্দোপাধ্যায় (১)
- বুদ্ধদেব বসু (১)
- মিখাইল শলোখভ (১)
- মোহিত সেন (১)
- রজনীপাম দত্ত (১)
- সরোজ আচার্য (১)
- সুরেন্দ্রনাথ গোস্বামী (১)
- হাসান তারেক (১)
- হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় (১)
Stay Connected
Get Newsletter
Subscribe to our newsletter to get latest news, popular news and exclusive updates.