১৮৮০–১৯৬০
রাজশেখর বসু
সাহিত্যজগতে অনন্য প্রতিভা। সবসময়ই নিজের লেখা দিয়ে পাঠকের মন ছুঁয়েছেন, ভাবনা জাগিয়েছেন ভিন্নতার। মফস্বলে বেড়ে ওঠা। নিত্য দিনের জীবন থেকেই লেখার অনুপ্রেরণা খুঁজে নিয়েছেন। প্রকাশনার ক্ষেত্রে নতুন হলেও তাঁর হৃদয়গ্রাহী বর্নণার মাধ্যমে জীবন, প্রকৃতির জীবন্ত এক চিত্রই পাঠকের সামনে হাজির করেন।
See more >>-
কালিদাসের মেঘদূত ব্যাপারটা কি বোধ হয় আপনারা জানেন। যদি ভুলে গিয়ে থাকেন তাই একটু মনে করিয়ে দিচ্ছি। কুবেরের অনুচর এক যক্ষ কাজে ফাঁকি দিত, সেজন্য প্রভুর শাপে তাকে এক বৎসর নির্বাসনে থাকতে হয়। সে রামগিরিতে আশ্রম তৈরি করে বাস করতে লাগল। আষাঢ়ের প্রথম দিনে যক্ষ দেখল, পাহাড়ের মাথায় মেঘের উদয় হয়েছে, দেখাচ্ছে যেন একটি হস্তী বপ্রক্রীড়া করছে। অঞ্জলিতে সদ্য ফোটা কুড়চি ফল নিয়ে সে মেঘকে অর্ঘ্য দিল এবং মন্দাক্রান্তা ছন্দে একটি সুদীর্ঘ অভিভাষণ পাঠ করল। তার সার মর্ম এই।—ভাই মেঘ, তোমাকে একবার অলকাপুরী যেতে হচ্ছে। ধীরে সুস্থে যেয়ো, পথে কিঞ্চিৎ ফুর্তি করতে গিয়ে যদি একটু দেরি হয়ে যায় তাতে ক্ষতি
-
বহু কারবারের মালিক ত্রিক্রমদাস করোড়ী তাঁর দিল্লির অফিসের খাস কামরায় বসে চেক সহি করছেন। আরদালী এসে একটা কার্ড দিল—এম. জুলফিকার খাঁ। ত্রিক্রমদাস বললেন, একটু সবুর করতে বল।
কিছুক্ষণ পরে সহি করা চেকের গোছা নিয়ে কেরানী ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। ত্রিক্রমদাস ঘণ্টা বাজিয়ে আরদালীকে ডেকে কার্ডখানা দিয়ে বললেন, আসতে বল।
জুলফিকার খাঁ এসে বললেন, আদাব আরজ। শেঠজী, আমি ইনটেলিজেন্স ব্র্যাঞ্চ থেকে আসছি।
উদ্বিগ্ন হয়ে শেঠজী প্রশ্ন করলেন, ইনকমট্যাক্স নিয়ে আবার কিছু গড়বড় হয়েছে নাকি?
—তা আমার মালুম নেই। আমার ডিপার্টমেণ্টে আপনার নামে একটা সিরিয়স চার্জ এসেছে।
—কেন, আমার কসুর কি?
—আপনি তিনটি শাদি করেছেন।
একটু হেসে ত্রিক্রম এললেন, য়হ বাত? যদি
-
নূতন দিল্লির গোল মার্কেটের পিছনের গলিতে কালীবাবুর বিখ্যাত দোকান ক্যালকাটা টি ক্যাবিন। এই আড্ডাটির নাম নিশ্চয়ই আপনারা শুনেছেন।
সতরোই পৌষ, সন্ধ্যা ছটা। পেনশনভোগী বৃদ্ধ রামতারণ মুখুজ্যে, স্কুলমাষ্টার কপিল গুপ্ত, ব্যাংকের কেরানী বীরেশ্বর সিংগি, কাগজের রিপোর্টার অতুল হালদার, এবং আরও অনেকে আছেন। আজ নিউইয়ার্স ডে, সেজন্য ম্যানেজার কালীবাবু একটু বিশেষ আয়োজন করেছেন। মাংসের চপ তৈরি হচ্ছে। রামতারণবাবু নিষ্ঠাবান সাত্ত্বিক লোক, কালীবাড়ির বলি ভিন্ন অন্য মাংস খান না। তাঁর জন্য আলাদা উননে মাছের চপ ভাজবার ব্যবস্থা হয়েছে।
সিগারেট তামাক আর চপ ভাজার ধোঁয়ায় ঘরটি ঝাপসা হয়ে আছে, বিচিত্র গন্ধে আমোদিত হয়েছে। উপস্থিত ভদ্রলোকদের জনকয়েক পাশা খেলছেন, কেউ খবরের কাগজ পড়ছেন, কেউ বা
-
ষাট বৎসর আগেকার কথা, কুইন ভিক্টোরিয়ার আমল। তখন কলকাতায় বিজলী বাতি মোটর গাড়ি রেডিও লাউড স্পীকার ছিল না, আকাশে এয়ারোপ্লেন উড়ত না, রবীন্দ্রনাথ প্রখ্যাত হন নি, লোকে হেমচন্দ্রকে শ্রেষ্ঠ কবি বলত। কিন্তু রাখাল মাষ্টার মনে করত সে আরও উঁচু দরের কবি, হতাশের আক্ষেপের চাইতেও ভাল কবিতা লিখতে পারে। সে তার অনুগত ছাত্র নারানকে বলত, আজ কি একখানা লিখেছি শুনবি?—ক্ষিপ্ত বায়ু ধূলি মাখে গায়। আর একটা শুনবি?—শুষ্ক বৃদ্ধে ঝটিকার প্রভাব কোথায়। আর কেউ পারে এমন লিখতে?
রাখাল মুস্তাফী শুধু এনট্রান্স পাস, কিন্তু বিদ্বান লোক, বিস্তর বাংলা ইংরেজী বই পড়েছিল। সেকালে বেশী পাস না করলেও মাস্টারি করা চলত। কবিতা রচনা ছাড়া গান
-
বিষ্ণুপুরাণে রাজা রৈবত-ককুদ্মী ও তাঁর কন্যা বেবতীর একটি বিচিত্র আখ্যান আছে। সেই ছোট আখ্যানটি বিস্তারিত করে লিখছি। এই পবিত্র পুরাণকথা যে কন্যা শ্রদ্ধাসহকারে একাগ্রচিত্তে পাঠ করে তার অচিরে সর্বগুণান্বিত বাঞ্ছিত পতি লাভ হয়।
পুরাকালে কুশস্থলী নগরীতে বৈবত-ককুদ্মী নামে এক ধর্মাত্মা রাজা ছিলেন। তিনি রেবত রাজার পুত্র সেজন্য তাঁর এক নাম রৈবত, এবং ককুদ্যুক্ত বৃষ অর্থাৎ ঝুঁটিওয়ালা ষাঁড়ের তুল্য তেজস্বী সেজন্য অপর নাম ককুদ্মী। সেকালে মহত্ত্ব ও বীরত্বের নিদর্শন ছিল সিংহ ব্যাঘ্র ও বৃষ, সেজন্য কীর্তিমান লোকের উপাধি দেওয়া হত—পুরুষসিংহ, নরশার্দূল, ভরতর্ষভ, মুনিপুংগব, ইত্যাদি।
রৈবত রাজার রেবতী নামে একটি কন্যা ছিলেন, তিনি রূপে গণে অতুলনা। রেবতী বড় হলে তাঁর বিবাহের জন্য
-
বদনচন্দ্র চৌধুরী একজন নবাগত নারকী, সম্প্রতি রৌরবে ভরতি হয়েছেন। যমরাজ আজ নরক পরিদর্শন করে বেড়াচ্ছেন। তাঁকে দেখে বদন হাত জোড় করে উবুড় হয়ে শুয়ে পড়লেন।
যম বললেন, কি চাই তোমার?
—আজ্ঞে, দু ঘণ্টার জন্যে ছুটি।
—কবে এসেছ এখানে?
—আজ এক মাস হল।
—এর মধ্যেই ছুটি কেন? ছুটি নিয়ে কি করবে?
—আজ্ঞে, একবার মর্ত্যলোকে যেতে চাই। আজ বিকেলে পাঁচটার সময় ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউটে আমার জন্যে শোকসভা হবে, বড্ড ইচ্ছে করছে একবার দেখে আসি।
যমালয়ের নিবন্ধক অর্থাৎ রেজিস্ট্রার চিত্রগুপ্ত কাছেই ছিলেন। যম তাঁকে প্রশ্ন করলেন, এই প্রেতটার প্রাক্তন কর্ম কি?
চিত্রগুপ্ত বললেন, এর পূর্বনাম বদনচন্দ্র চৌধুরী, পেশা ছিল ওকালতি তেজারতি আর নানা রকম
-
সকল লোকেরই কথায় ও আচরণে নানাপ্রকার ভঙ্গী থাকে। এই ভঙ্গী যদি ব্যক্তিগত লক্ষণ হয় এবং অনর্থক বার বার দেখা যায় তবে তাকে মুদ্রাদোষ বলা হয়। যেমন লোকবিশেষের তেমনই জাতি বা শ্রেণী বিশেষেরও মুদ্রাদোষ আছে। দক্ষিণ ভারতের পুরুষ লজ্জা জানাবার জন্য হাত দিয়ে মুখ ঢাকে। সকৌতুক বিস্ময় প্রকাশের জন্য ইংরেজ শিস দেয়। অনেক বাঙালী নবযুবক পথ দিয়ে চলবার সময় কেবলই মাথায় হাত বুলোয়-চুল ঠিক রাখবার জন্য। অনেক বাঙালী মেয়ে নিম্নমুখী হয়ে এবং ঘাড় ফিরিয়ে নিজের দেহ নিরীক্ষণ করতে করতে চলে—সাজ ঠিক আছে কিনা দেখবার জন্য। বাঙালী বৃদ্ধদেরও সাধারণ মুদ্রাদোষ আছে, অবৃদ্ধরা তা বলতে পারবেন।
জাতি বা শ্রেণী বিশেষের অঙ্গভঙ্গী বা বাক্যভঙ্গী
-
ষষ্ঠীপূজার পর সুকুমারী তার ছেলেকে পিঁড়ির ওপর রেখে স্বামীকে প্রণাম করে পায়ের ধুলো নিলে। সুকুমারীর বয়স চল্লিশ, তার স্বামী গোকুল গোস্বামীর চুয়ান্ন।
গোকুলবাবু বললেন, ইঃ, কি চমৎকার দেখাচ্ছে তোমাকে সুকু, যেন উর্বশী স্নান করে সমুদ্র থেকে উঠে এলেন!
সুকুমারী হাত জোড় করে বললে, তোমার পায়ে পড়ি এইবারে রেহাই দাও। সাত বৎসর তোমার কাছে এসেছি, তার মধ্যে ছটি সন্তান প্রসব করেছি। পাঁচটি গেছে, একটি এখনও বেঁচে আছে। আমি আর পারি না, শরীর ভেঙে গেছে। আবার যদি পোয়াতি হই তো মরব, এ খোকাও মরবে।
গোকুলবাবু সহাস্যে বললেন, বালাই, মরবে কেন। সন্তান জন্মায়, বাঁচে, মরে, সবই ভগবানের ইচ্ছা অর্থাৎ পূর্বজন্মের কর্মফল। আমি স্পষ্ট
-
ক্যালকাটা ফিজিসার্জিক ক্লাবের সাপ্তাহিক সান্ধ্য বৈঠক বসেছে। আজ বক্তৃতা দিলেন ডাক্তার হরিশ চাকলাদার, এম ডি, এল আর সি পি এম আর সি এস। মৃত্যুর লক্ষণ সম্বন্ধে তিনি অনেকক্ষণ ধরে অনেক কথা বললেন। চার-পাঁচ ঘণ্টা শ্বাসরোধের পরেও আবার নিঃশ্বাস পড়ে, ফাঁসির পরেও কিছুক্ষণ হৃৎস্পন্দন চলতে থাকে, দুই হাত দুই পা কাটা গেলেও এবং দেহেব অর্ধেক রক্ত বেরিয়ে গেলেও মানুষ বাঁচতে পারে, ইত্যাদি। অতএব রাইগার মর্টিস না হওয়া পর্যন্ত, অর্থাৎ দ্বিজেন্দ্রলালের ভাষায় কুঁকড়ে আড়ষ্ট হয়ে না গেলে একেবারে নিঃসন্দেহ হওয়া যায় না।
বক্তৃতা শেষ হলে যথারীতি ধন্যবাদ দেওয়া হল, কেউ কেউ নানা রকম মন্তব্যও করলেন। বক্তার সহপাঠী ক্যাপ্টেন বেণী দত্ত বললেন, ওহে
-
যাদের জন্য বিজ্ঞান বিষয়ক বাংলা গ্রন্থ বা প্রবন্ধ লেখা হয় তাদের মোটামুটি দুই শ্রেণীতে ভাগ করা যেতে পারে। প্রথম, যারা ইংরেজী জানে না বা অতি অল্প জানে। অল্পবয়স্ক ছেলে মেয়ে এবং অল্পশিক্ষিত বয়স্থ লোক এই শ্রেণীতে পড়ে। দ্বিতীয়, যারা ইংরেজী জানে এবং ইংরেজী ভাষায় অল্পাধিক বিজ্ঞান পড়েছে।
প্রথম শ্রেণীর পাঠকদের বিজ্ঞানের সঙ্গে পূর্ব পরিচয় নেই। গুটিকতক ইংরেজী পারিভাষিক শব্দ হয়তো তারা শিখেছে, যেমন টাইফয়েড, আয়োডিন, মোটর, ক্রোটন, জেব্রা। অনেক রকম স্থূল তথ্যও তাদের জানা থাকতে পারে, যেমন জল আর কর্পূর উবে যায়, পিতলের চাইতে অ্যালিউমিনিয়ম হালকা, লাউ কুমড়ো জাতীয় গাছে দু রকম ফুল হয়। এই রকম সামান্য জ্ঞান থাকলেও সুশৃঙ্খল
-
কেদার চাটুজ্যে মহাশয় বলিলেন-'আজকাল তোমরা সামান্য একটু বিদ্যে শিখে নাস্তিক হয়েছ, কিছুই মানতে চাও না। যখন আর একটু শিখবে তখন বুঝবে যে আত্মা আছেন। ভূত, পেতনি-এঁরাও আছেন। বেম্মদত্যি, স্কন্ধকাটা-এঁনারাও আছেন।'
বংশলোচনবাবুর বৈঠকখানায় গল্প চলিতেছিল। তাঁহার শালা নগেন বলিল-'আচ্ছা বিনোদ-দা, আপনি ভূত বিশ্বাস করেন?'
বিনোদ বলিলেন-'যখন প্রত্যক্ষ দেখব তখন বিশ্বাস করব। তার আগে হাঁ-না কিছুই বলতে পারি না।'
চাটুজ্যে বলিলেন-'এই বুদ্ধি নিয়ে তুমি ওকালতি কর! বলি, তোমার প্রপিতামহকে প্রত্যক্ষ করেছ? ম্যাকডোনাল্ড, চার্চিল আর বান্ডুইনকে দেখেছ? তবে তাদের কথা নিয়ে অত মাতামাতি কর কেন?'
'আচ্ছা আচ্ছা, হার মানছি চাটুজ্যে মশায়।'
'আপ্তবাক্য মানতে হয়। আরে, প্রত্যক্ষ করা কি যার তার কম্ম? শ্রীভগবান কখনও
Page 1 of 1
ক্যাটাগরি
উৎস
Stay Connected
Get Newsletter
Subscribe to our newsletter to get latest news, popular news and exclusive updates.
