বিনয় ভাবনার দুর্বলতা
‘গায়ত্রীকে কি তুমি ভালোবাসতে?’
‘আরে ধ্যুৎ, আমার সঙ্গে তিন-চারদিনের আলাপ, প্রেসিডেন্সি কলেজের নামকরা সুন্দরী ছাত্রী ছিলেন ইংরেজি সাহিত্যের, তারপর কোথায় চলে গেলেন, আমেরিকা না কোথায়, ঠিক জানি না।’
‘তাহলে ওকে নিয়ে কবিতা কেন?’
‘কাউকে নিয়ে তো লিখতে হয়—আমগাছ, কাঁটাগাছ, রজনীগন্ধা নিয়ে কি চিরদিন লেখা যায়!’


উপরের প্রশ্নোত্তর পর্বটিফিরে এসো চাকা-র কবিবিনয় মজুমদারের।

সম্ভবত বিনয় মজুমদারই একমাত্র কবি যার একটি কবিতার বইয়ের নাম তিনবার দেয়া হয়েছে। বইটির প্রথম সংস্করণে নাম ছিল ‘গায়ত্রীকে’, কোনো উৎসর্গপত্র ছিল না, ধরে নেওয়া যায় বইয়ের নামেই উৎসর্গ। দ্বিতীয় সংস্করণে হলো ‘ফিরে এসো চাকা’। আর এর তৃতীয় সংস্করণে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন—কবির কবিতা লেখা বন্ধ, তাই এই বইয়ের নাম আবারও বদল করবেন। এবারের নাম হলো ‘আমার ঈশ্বরীকে’, উৎসর্গে আমার ঈশ্বরীকে। এই ঈশ্বরীর পরিচয় আমরা জানি উপরের দুটো প্রশ্ন ও উত্তর থেকে। পশ্চিমে যিনি এখন খুব দমকে বেড়াচ্ছেন—একাধারে লেখক, তাত্ত্বিক ও একজন চিন্তক হিসেবে—সেই গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক, বিনয় মজুমদারের মানসী।

১.

বিনয় মজুমদার নিয়ে সাম্প্রতিককালে কারো কারো মধ্যে দেখা যায় বেশ উপচে পড়া আবেগ। আবার একইভাবে বিরক্তিও। স্বয়ং বাংলা সাহিত্যের সমকালে অত্যন্ত দাপুটে কবি আল মাহমুদ-ই বলেন, ‘বিনয় অগোছালো একজন কবি আর আমি খুব গোছানো একজন কবি।’

কথাটা শুনে চমকে গেছিলাম—আরে, আল মাহমুদ এই কথা বলেন কিভাবে? তখন আবার আমি আল মাহমুদের কাছে জানতে চাইলাম, কেন বিনয় অগোছালো আর নিজেকে গোছানো বলছেন? উত্তরে মাহমুদ বলেছিলেন, ‘আমি যা করেছি ভেবে করেছি, উল্টোপাল্টা কিছু করি নি।’

বাহ, বেশ তো! আমার তখন মনে হয়েছিল কবিতা দিয়ে আল মাহমুদ অনেক কিছু করেছেন, কিন্তু কবি বিনয় মজুমদার কিছুই করেন নি। ভারতের সর্বকালের সেরা ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ছাত্র হয়েও, এত সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও কিছু করলেন না। হাতছানি দেয়া দামি চাকরি, বিলাসবহুল জীবন সব কিছুকে দু-পায়ে ঠেলে যখন বিনয় দাঁড়ান কবিদের সারিতে তখন সর্বাগ্রে আমি দেখি কেবল তাঁকে, আর কাউকেই দেখি না। অর্থলোভী, ভোল-পাল্টানো কাউকেই দেখি না, কেবল একজন প্রচারবিমুখ কবিকেই দেখি, তাঁর নাম বিনয় মজুমদার। কার্যত, আজ বিনয় ভাবনার দুর্বলতার টুকরো টুকরো কারণ বলছি। এই লেখায় কাউকে তুচ্ছ করে দেখার প্রয়াস আমার নেই, যদিও কোনো কোনো লেখক কবি বিনয় সম্পর্কে অনেক হতাশাজনক কথা বলেছেন তবুও বিনয় বিনয়-ই। কবি বিনয় মজুমদারের বিনয় ও অভিমান সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী।

বিনয় মজুমদার—এই নামের ভেতর থেকে উঠে আসে একটা স্পষ্ট ইন্দ্রিয় অনুভূতি, নির্জন আকাশের ধ্বনি, ছায়াঘন জৈব জ্যামিতি। তাঁর কবিতা একটা অফুরন্ত উদাসীন স্পর্শকাতরতা নিয়ে অপেক্ষা করে পাঠকের আনন্দ ও মর্ম-হাহাকারের জন্যে।

হৃদয়, নিঃশব্দে বাজো, তারকা, কুসুম অঙ্গুরীয়—
এদের কখনো আর সরব সংগীত শোনাবো না।
বধির স্বস্থানে আছে; অথবা নিজের রূপ ভুলে
প্রেমিকের তৃষ্ণা দ্যাখে, পৃথিবীর বিপণিতে থেকে।

কবিতা লিখেছি কবে, দুজনে চকিত চেতনায়।
অবশেষে ফুল ঝ’রে, অশ্রু ঝ’রে আছে শুধু সুর।
কবিতা বা গান... ভাবি, পাখিরা—কোকিল গান গায়
নিজের নিষ্কৃতি পেয়ে, পৃথিবীর কথা সে ভাবে না।



কবি নিজের হৃদয়কে উদ্দেশ্য করে এ কথাগুলো বলেছেন, মানে তা নিজেকে বলছেন। অথচ বলার ভঙ্গিটি পুরোপুরি বস্তুগত না; কারণ হৃদয় বিষয়টি বস্তুগত, অথচ এর অনুভূতি দেখা যায় না, অবস্তুগত, তাই এই কথাগুলো আলাদা করে হৃদয়কে লক্ষ্য করে বলে ওঠেন। ফলে এই কবিতার সুর শুরু থেকেই তন্ময় ব্যক্তিগত; কিংবা মন্ময় বস্তুগত বলা যায়। এই ধরনের অ্যামবিভ্যালেন্স (Ambivalence) বা উপযোজ্যতা আছে সম্পূর্ণ কবিতাটির শরীরে।

এইসব কারণেই, ১ম পঙ্‌ক্তির ‘বাজো’ এই অনুজ্ঞাটি ২য় পঙ্‌ক্তিতে আত্মগত হয়ে ‘শোনাবো না’য় রূপ পেয়ে যায়। আর ‘নিঃশব্দে বাজো’র ভেতর রয়ে

লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন

আকর্ষণীয় মূল্য

এক বছর

৪৯৯

এক মাস

৯৯
মেয়াদ শেষে নতুন দামে নতুন করে গ্রাহক হতে হবে

যোগাযোগ করতে

+৮৮ ০৯৬০৬০৩৩৩৯৩
রবিবার–বৃহস্পতি: সকাল ১০টা–সন্ধ্যা ৬টা (সরকারি ছুটিরদিন ব্যতীত) অথবা ভিজিট করুন FAQ

You Might Also Like

Comments

Leave A Comment

Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Get Newsletter

Featured News

Advertisement

Voting Poll (Checkbox)

Voting Poll (Radio)

Readers Opinion