খড়ের এঁড়েটা—আলকাতরা গা

এক-যে ছিল বুড়ো আর বুড়ি। বুড়ো গাছ কেটে তার রসে আলকাতরা বানাত আর বুড়ি দেখত ঘরকন্না।

বুড়ি ঝোঁক ধরল: ‘আমায় একটা খড়ের এঁড়ে বাছুর বানিয়ে দাও!’

‘দূর ছাই, খড়ের এঁড়ে নিয়ে কী হবে তোমার?’

‘ওকে চরাব।’

কী আর করে বুড়ো, খড়ের এঁড়ে বাছুর বানাল, তার গায়ে মাখাল আলকাতরা।

সকালে বুড়ি তকলি নিয়ে চলে গেল এঁড়ে বাছুরটা চরাতে।

ঢিপির ওপর বসে বুড়ি সুতো কাটে আর আওড়ায়: ‘চর, চররে খড়ের এঁড়েটা, আলকাতরা গা! চর, চররে খড়ের এঁড়েটা, আলকাতরা গা!’

সুতো কাটতে কাটতে বুড়ি ঘুমিয়ে পড়ল।

হঠাৎ ঘুরঘুটি জঙ্গল থেকে, পঞ্চবটী বন থেকে বেরিয়ে এল ভালুক।

সোজা গেল সে এঁড়ের কাছে: ‘কে রে তুই?’

‘খড়ের এঁড়েটা—আলকাতরা গা!’

‘আলকাতরা দে, কুকুরের কামড়ে আমার গা ছড়ে গেছে, লাগাব।’

আলকাতরা-গা এঁড়ে চুপ করে থাকে।

রেগে উঠল ভালুক, তার আলকাতরা-মাখা গা আঁকড়ে ধরতেই এঁটে গেল তার সঙ্গে।

ঘুম ভেঙে গিয়ে বুড়ি ডাকে বুড়োকে: ‘ওগো, শিগগির ছুটে এসো, এঁড়ে একটা ভালুক ধরেছে!’

ভালুকটাকে ধরে বুড়ো তাকে ফেলে দিল মাটির তলের ভাঁড়ারে।

পরের দিন ফের বুড়ি তকলি নিয়ে গেল এঁড়ে চরাতে। ঢিপির ওপর বসে সুতো কাটে আর আওড়ায়: ‘চর, চররে খড়ের এঁড়েটা, আলকাতরা গা, চর, চররে খড়ের এঁড়েটা, আলকাতরা গা!’

সুতো কাটতে কাটতে ঘুমিয়ে পড়ল।

হঠাৎ ঘুরঘুটি জঙ্গল থেকে, পঞ্চবটী বন থেকে বেরিয়ে এল নেকড়ে।

দেখতে পেল এঁড়ে বাছুরকে: ‘কে রে তুই?’

‘খড়ের এঁড়েটা—আলকাতরা গা।’

‘আলকাতরা দে, কুকুরের কামড়ে আমার গা ছড়ে গেছে।’

‘নাও।’

আলকাতরা মাখা গা জাপটে ধরতেই লেপটে গেল সে।

ঘুম ভাঙল বুড়ির, চেঁচিয়ে উঠল: ‘ওগো এসো, এসো, এঁড়ে নেকড়ে ধরেছে!’

ছুটে এল বুড়ো, নেকড়েকে ধরে ফেলে দিল মাটির তলের ভাঁড়ারে।

পরের দিনও এঁড়ে চরায় বুড়ি, সুতো কাটে।

কাটতে কাটতে ঘুমিয়ে পড়ল।

ছুটে এল শেয়ালি। এঁড়েকে শুধোয়: ‘কে রে তুই?’

‘খড়ের এঁড়েটা—আলকাতরা গা।’

‘দে ভাই একটু আলকাতরা, কুকুরের কামড়ে আমার চামড়া ছড়ে গেছে।’

‘নাও।’

শেয়ালিও আটকে গেল। ঘুম ভাঙল বুড়ির, ডাকল বুড়োকে।

শেয়ালটাকেও বুড়ো ফেলে দিল মাটির তলের ভাঁড়ারে।

হ্যাঁ, অনেকগুলো জুটেছে।

ভাঁড়ারের চালের ওপর বসল বুড়ো, ছুরি শানায় আর বলে:‌‘ভালুকের ছাল ছাড়াব, চমৎকার কুর্তা হবে!’

তা শুনে ভয় পেয়ে গেল ভালুক: ‘কেটো না আমায়, ছেড়ে দাও! আমি তোমায় মধু এনে দেব।’

‘ঠকাবে না তো?’

‘না, ঠকাব না।’

‘দেখো কিন্তু!’ ছেড়ে দিল ভালুককে।

কিন্তু আবার ছুরিতে শান দিতে বসে। নেকড়ে শুধোয়: ‘ছুরি শানাচ্ছ কেন দাদু?’

‘এই তোর ছালটা ছাড়াব, শীতকালের জন্যে বানাব গরম টুপি।’

‘ছেড়ে দাও আমায়! আমি তোমার জন্যে ভেড়ার পাল তাড়িয়ে আনব।’

‘কিন্তু দেখিস, ঠকাস না যেন!’

নেকড়েকেও ছেড়ে দিলে। আবার ছুরি শানায়।

‘বলো-না দাদু, ছুরি শানাচ্ছ কেন?’ জিগ্যেস করে শেয়ালি।

বুড়ো বললে, ‘তোর ফার বেশ ভালো, আমার বুড়ির জন্যে গরম কলার হবে।’

‘না, না, আমার ছাল ছাড়িও না। আমি তোমায় হাঁস-মুরগি এনে দেব।’

‘কিন্তু দেখো, ঠকিয়ো না!’ শেয়ালিকেও ছেড়ে দিলে।

পরের দিন আলো-আঁধারি ভোরে, দরজায় ঠক-ঠক শব্দ।

‘ওগো, দ্যাখো তো গিয়ে দরজায় কে কড়া নাড়ছে।’

গেল বুড়ো, দেখে ভালুক নিয়ে এসেছে পুরো এক চাক মধু।

চাকটা নিয়ে বুড়ো তুলে রাখল, ওদিকে দরজায় আবার ঠুক-ঠুক!

নেকড়ে নিয়ে এসেছে ভেড়া। শেয়ালও নিয়ে এল হাঁস আর মুরগি।

বুড়োর আর আনন্দ ধরে না, বুড়িও খুশি। সেই থেকে সুখে-স্বচ্ছন্দে দিন কাটাতে লাগল তারা।

ইউক্রেনের লোককথা, UKRAINIAN FOLK TALES, সংকলক: ভ্লাদিমির বইকো (ভাষাবিদ্যার ডক্টর), মূল রুশ থেকে অনুবাদ: ননী ভৌমিক, শিল্পী: ব্লাদিমির গর্দিচুক, রাদুগা প্রকাশন, সোভিয়েত ইউনিয়ন, ১৯৮৮

You Might Also Like

Comments

Leave A Comment

Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Get Newsletter

Featured News

Advertisement

Voting Poll (Checkbox)

Voting Poll (Radio)

Readers Opinion

Editors Choice