মহল্লা

লেখক: আবদুল্লা কাখহার

চুল্লির চাকতিটা খুলে দাদী রোখাৎ পায়ে আঁচ পোয়াচ্ছিল। কিছুকাল থেকে পা দুখানা বড়ো ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে, কনকন করছে, ঘর তেমন ঠান্ডা না হলেও ভারি শীতে জমে যাচ্ছে সে। নাতি বইয়ের মলাট ছিঁড়ে ফেলেছিল, জানলার কাছে সেটা আঁটা দিয়ে জুড়তে জুড়তে বুড়ো বললে: ‘আগুন পোয়াতে হয় কী করে তা আর তোমায় শেখানো গেল না! চুল্লির দরজা খোলা রাখা আর আকাশ গরম করা একই কথা।’

দাদী রোখাৎ দরজা বন্ধ করে সোফায় গা এলালে। তারপর শুয়েই থাকল। প্রথমটা উঠতে ইচ্ছে করছিল না, পরে আর উঠতেই পারল না। তৃতীয় দিনে বুড়ি মারা গেল।

হিকমৎ-ববো দাঁড়িয়ে রইল একেবারে বজ্রাহতের মতো। ঘরে যখন ছুটে এল ছেলে, পুত্রবধূ, নাতিরা, কান্না উঠল বাড়িতে, তখন ধীরে ধীরে বুড়োর কাঁপুনি ধরল। ‘এ কী করলে আল্লা সর্বশক্তিমান? আমার এ কী দশা করলে? হুড়মুড়িয়ে সবই যে নেমে এল আমার ওপর…’ তিপ্পান্ন বছর বুড়ো বুড়ি একসঙ্গে কাটিয়েছে। একই থালা থেকে খেয়েছে, গুটি পোকার মতো একই আচ্ছাদনে ঢাকা পড়েছে তাদের চিন্তা ভাবনা, অভ্যাস। কল্পনাই করা যেত না যে এদের একজন ছেড়ে যাবে, একজন থাকবে...

কৃত্যকর্ম করার পর কাফন যখন কাঁধে উঠল, তখন হিকমৎ-ববোর ভেতরে একটা কী যেন ছিঁড়ে গেল, বুকের মধ্যে রইল শুধু একটা শূন্যতা আর ব্যথা। কোঁদে ফেলল সে। মাটি দেওয়া হল রোখাৎকে, সমাধির পর ঘর আর আঙিনা ভরে উঠল লোকে। সমবেদনা জানাতে এল মহল্লার প্রায় সবাই। শোকার্ত হিকমৎ-ববো মাথা নুইয়ে উদাসীনের মতো বসে রইল এক কোণে, যেন দুনিয়ায় তার আর কেউ নেই, কিছু নেই।

পরের এক সপ্তাহে বুড়ো একেবারে ভেঙে পড়ল, যেন সেচ না পেয়ে শুকিয়ে যাওয়া একটা অঙ্কুর। মাঝে মাঝে এমন চুপচাপ শুয়ে থাকত যে বোঝা কঠিন হত মরে আছে নাকি বেঁচে, হয়ত বা মরেই গেছে। মাঝে মাঝে মনে হত, বুড়ি যখন তার ঠান্ডা পা গরম করতে বসেছিল তখন কী বিচ্ছিরি ভাবেই না সে ধমক দিয়েছিল স্ত্রীকে। চমকে চমকে উঠত সে, যেন ভোঁতা ছাঁচ দিয়ে কে তাকে বেধাচ্ছে।

ঘরের লোকেরা হিকমৎ-ববোকে একলা থাকতে দিত না। ছোট নাতি আসত তার খেলনা নিয়ে, কিন্ডেরগার্টেন থেকে ছাড়া পাওয়া মাত্রই এসে জুটত দাদুর কাছে। বড়ো নাতিটা দিনে বার পাঁচেক করে ফটো তুলত দাদুর, নানা রকম ভঙ্গিতে। ছেলে তাকে ট্যাক্সি করে শহর ঘোরাত, হিকমৎ-ববোকে যদি বা বহু কষ্টে রাজী করানো যেত, সখেদে বিড়বিড় করত: ‘তোর মা বেঁচে থাকতে তো আমাদের গাড়ি চাপিয়ে ঘোরাবার কথা তোর মনে হয় নি।’

একদিন জোর বৃষ্টি হল, আঙিনায় ছেয়ে রঙের যে তুষারগুলো তখনো লেগেছিল তা শেষ পর্যন্ত ধুয়ে সাফ হল। আইভানে[১]থামে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়েছিল বুড়ো, চেয়েছিল বাতাসে জড়ানো ভারি ভারি বৃষ্টি ধারার দিকে। হঠাৎ দেখল তন্দুরের কাছে পুরনো একটা গালোশ[২]পড়ে আছে। বৌয়ের গালোশ চিনতে দেরি হল না তার। বেচারা রোখাতের পা শেষের দিকে ফুলে গিয়েছিল, গালোশের ওপর দিকটা তাই ইচ্ছে করে কাটা। বুড়ো সেটাকে কুড়িয়ে মুছে নিয়ে গেল নিজের ঘরে। বুকে তার ফের সেই আর্ত শূন্যতাটা ফিরে এল—ঘর থেকে মড়া বার করার সময় যা হয়েছিল। সন্ধে পর্যন্ত কাঁদল সে।

রাতে হিকমৎ-ববোর ঘুম হত না। ওষুধ খেলেও ঘুমের আমেজ আসতে না আসতেই ঘুম ভেঙে যেত মাঝ রাতে, নিশ্চল হয়ে বসে থাকত সকাল পর্যন্ত, নয়ত চুপচাপ পায়চারি করত। আর কেবলি মনে হত রোখাতের কথা। প্রায়ই সে আচ্ছন্ন হয়ে যেত স্মৃতিতে, মাঝে মাঝে মনে হত যেন জীবন আগের মতোই বয়ে চলেছে, মাত্র দিন কয়েকের জন্যে বৌ কোথাও

লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন

আকর্ষণীয় মূল্য

এক বছর

৪৯৯

এক মাস

৯৯
মেয়াদ শেষে নতুন দামে নতুন করে গ্রাহক হতে হবে

যোগাযোগ করতে

+৮৮ ০৯৬০৬০৩৩৩৯৩
রবিবার–বৃহস্পতি: সকাল ১০টা–সন্ধ্যা ৬টা (সরকারি ছুটিরদিন ব্যতীত) অথবা ভিজিট করুন FAQ

You Might Also Like

Comments

Leave A Comment

Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Get Newsletter

Featured News

Advertisement

Voting Poll (Checkbox)

Voting Poll (Radio)

Readers Opinion

Editors Choice