মৃত্যুমুখর
লকলকিয়ে বেড়ে ওঠা গোপন দুঃখগুলো হঠাৎ করেই জানান দিচ্ছে জীবন্ত অস্তিত্বের কথা। ফরহাদ স্যার অদূরে চেয়ে ফিরলেন নিজের মধ্যে। নিজে বলতে তিনি আজ অন্যকেউ—দখল হয়েছেন বহুদিন। এ দখল চর দখলের মত নয়, ব্রিটিশ উপনিবেশের মত—সুই হয়ে ঢুকে ফলার মত বেরুনো! দখলমুক্তির কোনো চেষ্টা করতেও সচেষ্ট হননি তিনি। যেন দখল হয়েই বেঁচে গেছেন।
ফরহাদ স্যার সম্ভবত ভীতু মানুষ নন, তবে সাহস বলতে কদাচ স্কুলের দপ্তরী ঝুমুরকে হালকা ধমকের সুরে কথা বলেছেন। কিন্তু আজ তিনি সাহসের সীমান্তের বিপজ্জনক কাঁটাতার পেরিয়ে দুঃসাহসের সীমায় পা রেখেছেন। তিনি শুনেছেন মরার সবচে’ কম কষ্টকর ও ঝুঁকিমুক্ত পদ্ধতি হলো রেললাইনে মাথা দেয়া। তাই আর বিকল্প খোঁজেননি। তবে এর জন্য চাই সাহস—বুকভরা সাহস। আসন্ন মৃত্যুর জন্য এটাই তার কিছুটা খামতি।
ফরহাদ স্যার স্কুল শেষ করেই পেছনের পুকুরপাড়ের ফাড়ির রাস্তা ধরে চৌধুরী বাড়ি পেছন-বাগানের ভেতর দিয়ে কলেজের মাঠ পেরিয়ে লম্বা সিঁড়ি ভেঙে ঘেমে জুবুথুবু হয়ে স্টেশনঘরে পৌঁছালেন। কোনোদিক না তাকিয়ে গটগট করে হেঁটে পূবদিকটায় যথাস্থানে এসে দাঁড়ালেন। তড়িঘড়ি ঘড়িতে দুটো পঁয়তাল্লিশ দেখে জীবনের কী এক অজানা দুঃখবোধকে সঙ্গী করে জীবনানন্দের কবিতা—মরিবার হলো তার স্বাদ—আওড়াতে আওড়াতে শুয়ে পড়লেন রেললাইনের ওপর। মোটেও শুতে পারলেন না, মধ্যদুপুরের তীব্র রোদে উত্তপ্ত পাটাতনে ঘাড় রাখাই দুরূহ। ভাগ্যিস একখানা খবরের কাগজ এনেছেন। ভেবেছিলেন সময়ের রেল অসময়ে এলে লাইনে শুয়ে খবরের কাগজ পড়ে সময় কাটাবেন। আয়েশ করে মরবেন। তা আর হলো কই! ‘দৈনিক আশার আলো’ ঘাড়ের নিচে গুঁজে শুয়ে শুয়ে রোদ্রজ্জ্বল আকাশ দেখছেন আর ভাবছেন ফেলে আসা সময়ের কথা। ঠিক দুটো সাতচল্লিশ বাজে। হররোজ এ সময়ই মৈত্রী এক্সপ্রেস হুইসেল বাজিয়ে এদিক দিয়েই কলকাতা যায়। আজ এখনও এলো না! ফরহাদ স্যার ঘেমে নেয়ে গেলেন। চৈত্রদিনের মধ্যগগন থেকে সামান্য পশ্চিমে হেলে পড়া সূর্যের তাপে তার চেহারা ক্রমশ পুড়ে যাচ্ছে। ‘মৃত্যু-অপেক্ষা’ যেন মৃত্যুর চেয়েও অধিক কষ্টের!
মিরপুর স্টেশনটি বেশ শান্ত আর লোকজনের আনাগোনাও বেশ সীমিত। তবে এটির অবস্থান এতদঞ্চলের জনবসতি থেকে অনেকটা উঁচুতে—প্রায় ২০-২৫ ফুট। প্লাটফর্ম ছাড়িয়ে পূর্বদিকটায় মানুষের আনাগোনা খুব একটা নেই। দুটো পাশাপাশি ব্রডগেজ লাইন পশ্চিম থেকে পূবে ভেড়ামারা হয়ে ঈশ্বরদী গেছে। হঠাৎ রেলের হুইসেলের মতো কিছু একটা শুনে তিনি সমস্ত মনযোগ ‘মরিবার হলো তার স্বাদে’ কেন্দ্রীভূত করে স্কুলের অ্যাসেম্বলির মতো বুক টান টান করলেন। এত সাহসের প্রয়াস যেন ব্যর্থ না হয়ে যায়! রেলের নিচে মরতে যাওয়া বিশেষ ঝুঁকির বিষয়। টাইমিংয়ে একটু গড়বড় হলেই না-মরে চিরতরে পঙ্গু হওয়ার আশঙ্কা আছে। সে আর এক অমানবিক সমস্যা! তারচেয়েও বড় বিষয়, ব্যর্থ আত্মহত্যা-চেষ্টার পর সমাজে মুখ দেখানো যাবে না, আগের দিনের ম্যাট্রিক ফেলের মতো বিষয় আরকি—বেইজ্জতি ব্যাপার-স্যাপার।
যা হোক অবশেষে দূরে কি যেন দেখা যাচ্ছে। কাঙ্ক্ষিত ট্রেনই হবে হয়তো। কিছুটা ভয়-ডর-শঙ্কা নিয়ে এবার স্যার জামা টানটান করলেন, যেন ভাঁজ না ভেঙে যায়। ইস্ত্রি করা সফেদ ফতুয়াটা পরে এসছেন, পরিপাটি মৃত্যুর জন্য। দূরের যমদূত ক্রমশ কাছে এগিয়ে আসছে, তবে বেশ ধীরে। ছবি তোলার জন্য পোজ দেওয়ার মতো করে তিনি বুকভরে নিশ্বাস নিয়ে রেখেছেন। কিন্তু রেলের গতি এত ধীর যে, বারবার নিশ্বাস ফুরিয়ে যাচ্ছে। এদিকে প্রচণ্ড রোদে তার মাথা ঝিমঝিম করছে। তার উপর মৃত্যুর উত্তেজনায় আজ নাস্তা না করেই চলে এসেছেন। এখন পেটও সেটা জানান দিচ্ছে। একহাত মাথার উপর রেখে সূর্যের তাপ থেকে মুখরক্ষা করতে করতে চোখ বন্ধ করে শুয়ে রইলেন।
চেয়ারে বসে বসে দুপুরের ভাতঘুমের মতো ঝিমুনি থেকে আচমকা রাশভারী কণ্ঠের ধমকে তার রেললাইন-তন্দ্রা কেটে যায়। শোনে—‘এই বেকুব, মরবি তো এই
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments