সংস্কৃতির কথা

মনে হয় মানুষ স্বভাবত পৌত্তলিক: কোনো বিশেষ প্রতিমা বিশেষ তত্ত্ব বিশেষ আচার বা বিশেষ ধরন-ধারণ—এ না হলে যেন তার চলতে চায় না। আর এরই সঙ্গে সঙ্গে সে পরিবর্তনপ্রিয়—তার প্রতিমাতত্ত্ব আচার বা ধরন-ধারণ ক্রমাগত বদলায়।

সংস্কৃতির কথাটা ইউরোপে প্রবল হয় ঊনবিংশ শতাব্দীতে। অষ্টাদশ শতাব্দীতে ইউরোপে নানা ধরনের বিপ্লব দেখা দেয়—ভাব-বিপ্লব, অর্থনৈতিক বিপ্লব, রাষ্ট্রিক বিপ্লব, সবই। সেই বিপ্লবের পরে ঊনবিংশ শতাব্দীতে আসে নতুন সংগঠনের কাল। সেই দিনে অতীতের ধর্মের স্থান দখল করে সংস্কৃতি।

সংস্কৃতি বলতে বোঝা হয় এক বিশেষ সমন্বয়—খ্রিস্টান অখ্রিস্টান সমস্ত রকমের জ্ঞান ও উৎকর্ষ এর অন্তর্ভুক্ত হয়। এর সংজ্ঞা দেওয়া হয়—অতীতের শ্রেষ্ঠ ভাব-সম্পদের সমাহার। প্রথমে এর প্রবণতা হয় ব্যক্তিতান্ত্রিকতার দিকে—ব্যক্তিত্বের উৎকর্ষই হয় এর প্রধান লক্ষ্য। কিন্তু ইউরোপে সঙ্ঘবদ্ধ জীবন অনেক বেশি সক্রিয়, তাই অচিরেই এই ব্যক্তিতান্ত্রিকতার মোড় ফেরে সামাজিকতার দিকে।

ভারতবর্ষ চিন্তার দিক দিয়ে ইউরোপের অন্তত পঞ্চাশ বৎসর পেছনে পড়ে রয়েছে; ইউরোপের উনবিংশ শতাব্দীর ঢেউ ভারতবর্ষে যে এসে লাগবে বিংশ শতাব্দীতে এতে আশ্চর্য হবার তেমন কিছু নেই। সংস্কৃতির ব্যক্তিতান্ত্রিক প্রবণতা আমাদের দেশে দুই চার বৎসর আগেও অত্যন্ত প্রবল ছিল। ভদ্রলোক হওয়া বা একটি ভদ্রপরিবার গড়ে তোলা এইই ছিল আমাদের দেশের শিক্ষিতদের লক্ষ্য। সম্প্রতি দেশে যে গণতান্ত্রিক শাসন-নীতি প্রবর্তিত হয়েছে আর সাম্প্রদায়িক বিরোধ তীব্র হয়ে উঠেছে তার ফলে আমাদের সাংস্কৃতিক চেতনায় সমাজ-বোধ একটা বড়ো জায়গা করতে চাচ্ছে।

ভারতবর্ষের একালের সাংস্কৃতিক চিন্তার ইতিহাসে দুই জনের নাম বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য—একজন বাংলার বঙ্কিমচন্দ্র অপরজন পাঞ্জাবের ইকবাল। এঁদের চাইতে শ্রেষ্ঠতর চিন্তাশীলের জন্ম একালের ভারতবর্ষে হয়েছে, কিন্তু চিন্তা-নায়ক হিসাবে এঁদের মতো জনপ্রিয়তা অর্জন করতে আর কেউ পারেননি। এঁরা দুজনেই চেয়েছেন প্রাচীন ধর্মের নতুন ব্যাখ্যা দিতে, সঙ্গে সঙ্গে শক্তিশালী রাষ্ট্রজীবন গঠন বলতে যা বোঝায় তারও স্পষ্ট ইঙ্গিত এঁদের বাণীতে রয়েছে। মানুষ একই সঙ্গে স্থিতিশীল ও গতিশীল, আমাদের দেশের লোক স্থিতিশীল কিছু বেশি—জীবনে নতুন নতুন পরীক্ষা করবার সুযোগ তাদের জন্য সংকীর্ণ বোধ হয় মুখ্যত এই কারণে। বঙ্কিমচন্দ্র ও ইকবালের চিন্তায় সনাতন স্থিতিশীলতার সঙ্গে কিছু গতিশীলতা যে মিশেছে, এরই মধ্যে নিহিত রয়েছে তাঁদের জনপ্রিয়তার রহস্য। স্থিতিশীলতার আর গতিশীলতার এই যে অদ্ভুত মিশ্রণ আমাদের দেশের চিন্তায় ঘটেছে আমাদের একালের সংস্কৃতিগত চিন্তায় এই একটি গোড়ার কথা। কিন্তু সুচিন্তার কাজ হচ্ছে চিন্তার গ্রন্থির জটিলতা ঘুচিয়ে তাকে ঋজু করা—জীবনে কার্যকরী করা।

আমাদের জীবনে নতুন নতুন পরীক্ষার সুযোগ সংকীর্ণ—বিচিত্র ও দূরপ্রসারী এই ব্যাপারটির প্রভাব। এর ফলে যেমন কঠিন আমাদের পক্ষে মাত্রাজ্ঞান-সম্পন্ন হওয়া তেমনি দুর্নিবার আমাদের জন্য চরমপন্থিত্বের আকর্ষণ; যে-চিন্তার লক্ষ্য দীর্ঘাভিসারী কর্মপন্থা আমাদের কৌতূহল সহজেই তা থেকে হয় প্রতিনিবৃত্ত, আর যে চিন্তা আমাদের জন্য এনে দেয় ভাবোন্মত্ততা সহজেই আমাদের মন হয় তার দ্বারা বন্দী। এই প্রতিকূল পরিবেশ আর অব্যবস্থিত চিত্ত—বেশ বড়ো রকমের দুর্ঘটনা এসব আমাদের জীবনে।

সংস্কৃতির ক্ষেত্রে ব্যক্তিতান্ত্রিকতা যে দুর্বল চিন্তা তা বোঝা কঠিন নয়। মানুষ বিশেষভাবে সামাজিক জীব। কাজেই যে ব্যক্তিগত বা পারিবারিক উৎকর্ষের সামাজিক মূল্য কম তা যত সুদর্শনই হোক শেষ পর্যন্ত অদ্ভুত ভিন্ন আর কিছু নয়। অবশ্য একথা সত্য যে এক যুগে যার সামাজিক মূল্য কম অন্য যুগে তার সামাজিক মূল্য বেশি হতে পারে। কিন্তু এমন কতকগুলো ব্যাপার আছে স্বভাবতই যার সামাজিক মূল্য কম। মানুষের ইতিহাস বিচিত্র—বিচিত্র ভাবের মধ্য দিয়ে তার অভিব্যক্তি হয়েছে ও হচ্ছে। তাই যে-সব চিন্তা প্রকৃতপক্ষে জনহিতকর নয়, বিশেষ বিশেষ গোষ্ঠীর বা দলের চেতন বা অবচেতন স্বার্থবোধের অনুকূল মাত্র, অথবা ক্ষণিক খেয়াল, সে-সবের দিকেও মাঝে মাঝে নেতৃস্থানীয়দের প্রবণতা জন্মেছে।

সেকালের ধর্মের মতো একালের সংস্কৃতিরও মূল কথা হওয়া

লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন

আকর্ষণীয় মূল্য

এক বছর

৪৯৯

এক মাস

৯৯
মেয়াদ শেষে নতুন দামে নতুন করে গ্রাহক হতে হবে

যোগাযোগ করতে

+৮৮ ০৯৬০৬০৩৩৩৯৩
রবিবার–বৃহস্পতি: সকাল ১০টা–সন্ধ্যা ৬টা (সরকারি ছুটিরদিন ব্যতীত) অথবা ভিজিট করুন FAQ

You Might Also Like

Comments

Leave A Comment

Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Get Newsletter

Featured News

Advertisement

Voting Poll (Checkbox)

Voting Poll (Radio)

Readers Opinion

Editors Choice