সে কাল আর এ কাল
আমাদিগের সমাজ এখনও প্রকৃতরূপে সংগঠিত হয় নাই। তাহার একটি সামান্য প্রমাণ দিতেছি। প্রত্যেক জাতিরই একটি নির্দিষ্ট পরিচ্ছদ আছে; সেইরূপ পরিচ্ছদ সেই জাতীয় সকল ব্যক্তিই পরিধান করিয়া থাকেন, কিন্তু আমাদিগের বাঙ্গালি জাতির একটি নির্দিষ্ট পরিচ্ছদ নাই। কোনো মজলিসে যাউন, একশত প্রকার পরিচ্ছদ দেখিবেন; পরিচ্ছদের কিছুমাত্র সমানতা নাই। ইহাতে এক এক বার বোধ হয়, আমাদিগের কিছুমাত্র জাতিত্ব নাই। বস্তুত ঐক্য না থাকিলে প্রকৃত জাতিত্ব কীরূপে সংগঠিত হইবে? আমাদিগের কোনো বিষয়ে ঐক্য নাই। ইহার উপর আমরা আবার অনুকরণ-প্রিয়। বাঙ্গালি জাতি অত্যন্ত অনুকরণ-প্রিয়; আমরা সকল বিষয়েই সাহেবদের অনুকরণ করিতে ভালোবাসি। কিন্তু বিবেচনা করি না যে, সে অনুকরণ আমাদের দেশের উপযোগী কি না, আর তদ্দ্বারা আমাদিগের দেশের প্রকৃত উপকার সাধিত হইবে কি না? সাহেবেরা পর্যন্ত যে সাহেবি প্রথা এ দেশের উপযোগী নহে মনে করেন, তাহাও আমরা অবলম্বন করিতে সংকুচিত হই না। সাহেবেরা নিজে বলিয়া থাকেন, সাহেবি পোশাগ এ দেশের কোনো মতে উপযুক্ত নয়, কিন্তু আমাদিগের দেশের কোনো কোনো ব্যক্তি ঐ পোশাগ ব্যবহার করিতে সঙ্কুচিত হয়েন না। আমাদিগের দেশের কোনো বিখ্যাত ব্যক্তি ভূতপূর্ব লেপ্টেনেন্ট গবর্নর বিডন সাহেবের সহিত ধুতি চাদর পরিয়া দেখা করিতে যাইতেন, তাহাতে গবর্ণর সাহেব বিরক্তি প্রকাশ করিতেন। একবার গ্রীষ্মের সময় দেখা করিতে গিয়াছেন, গিয়া দেখেন যে, গবর্ণর সাহেব ঢিলে পাজামা ও পাতলা কামিজ পরিয়া বসিয়া আছেন। আমাদিগের বন্ধুকে দেখিবামাত্র তিনি বলিলেন,—“তোমাকে দেখিয়া আমার হিংসা হচ্ছে, ইচ্ছা করে তোমাদিগের ন্যায় পরিচ্ছদ পরিয়া থাকি।” আমাদিগের বন্ধু উত্তর করিলেন,—“তাই কেন করুন না?” বিডন সাহেব বলিলেন,—“ওরূপ পরিচ্ছদ পরিধান করা আমাদিগের দেশাচার-বিরুদ্ধ, সুতরাং কেমন করে করি?” আমাদিগের বন্ধু উত্তর করিলেন,—“আপনাদিগের বেলা দেশাচার বলবৎ, আর আমাদিগের বেলা তাহা কিছুই নহে, আপনারা এরূপ বিবেচনা করেন কেন?” চতুর্দিকে হীন অনুকরণের প্রবলতা দৃষ্ট হইতেছে। প্রতি পদেই অনুকরণ, ইহাতে আন্তরিক সারবত্তার হানি হইতেছে, বীর্যের হানি হইতেছে, আমরা অন্য সমাজীয়দের ক্রীতদাস হইয়া পড়িতেছি। কী আশ্চর্য! সাহেবেরা যাহা করিবেন, তাহাই ভালো, আর সব মন্দ। এ উপলক্ষে একটা গল্প মনে পড়িল। কতকগুলি লোক এক বাসায় থাকিত। তাহারা এক দিন একটা কাঁঠাল ক্রয় করিল। তাহাদের মধ্যে একজন বড়ো ইংরাজভক্ত এবং কাঁঠালভক্তও ছিলেন; আর আর সঙ্গীদিগের ইচ্ছা হইল যে, তাঁহাকে কাঁঠালের ভাগ ফাঁকি দেয়। একজন উহার মধ্যে বলিয়া উঠিল, “ইংরাজেরা কাঁঠাল খায় না।” তিনি অমনি কাঁঠাল ভক্ষণে বিরত হইলেন, আর আর বন্ধুরা সমুদয় কাঁঠাল খাইয়া ফেলিল। ইংরাজেরা না থাকিলে কোনো সভা জাঁকে না। ইংরাজেরা ভালো না বলিলে কোনো কার্যের মূল্য হয় না। সকল কাজেই রাঙ্গামুখের বার্নিশ চাই। এ বিষয়ে আর একটা গল্প মনে হইল। এক বার এক ব্যক্তি আর একজনকে বলিতেছিল, “ওদের বাটীতে পূজার বড়ো ধুম, গোরায় লুচি ভাজছে।” যে কার্য গোরায় করে, তাহার ভারি মূল্য। এখন আমাদের সকল কার্যেই গোরার দ্বারা লুচি ভাজান চাই! সামাজিক বিষয়েতেও সাহেবদিগের সাহায্য চাই। সাহেবরা হিন্দুসমাজ সম্বন্ধীয় বিষয়ে যেরূপ বিজ্ঞতা ফলান, তাহা দেখিলে আমার হাসি উপস্থিত হয়। কয়েক বৎসর পূর্বেবঙ্গদূতনামক একখানি সংবাদ পত্র ছিল।[১]তাহার সহিতসংবাদ প্রভাকরের ঝগড়া হইয়াছিল। আপনারা জানেন, সংবাদপত্র-সম্পাদকেরা কিরূপ বিবাদপ্রিয়। তাঁহাদের ঝগড়া দেখিয়াফ্রেন্ড অব্ ইন্ডিয়াসম্পাদক তাহার মধ্যস্থতা করিতে গেলেন। বঙ্গদূত বলিল, “হচ্ছিল ভোলা ময়রা ও নীলু রামপ্রসাদে, এ আবার আন্টুনি ফিরিঙ্গি কোথা থেকে এল?” সেই অবধি দুর্ধর্ষ ফ্রেন্ড একেবারে চুপ। এইরূপ অনেক সময় হিন্দুসমাজের আন্দোলনে সাহেবদিগের বিজ্ঞতা ফলান দেখিয়া আমরাও বলিতে বাধ্য হই যে, “হচ্ছিল ভোলা ময়রা ও নীলু রামপ্রসাদে, আবার আন্টুনি ফিরিঙ্গি কোথা হতে এলো?” আমাদের অর্থ সম্বন্ধীয় মোকদ্দমায় বিলাতে
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments