পাণিপথের তৃতীয় যুদ্ধ
পেশোয়া প্রথম বাজীরাও এমন ভাবে তাঁর উচ্চাভিলাষের উপযুক্ত কর্মক্ষমতা অর্জন করেছিলেন যে আর কিছুদিন বেঁচে থাকলে তাঁর ‘হিন্দু-পাদ-পাদশাহী’ বা হিন্দু সাম্রাজ্য স্থাপনের স্বপ্ন হয়ত আদৌ দুরাশা বলে গণ্য হ’ত না। কিন্তু মাত্র বিয়াল্লিশ বৎসর বয়সেই যে তিনি মারা যাবেন তা কে ভেবেছিল? জীবনের মাঝামাঝি এসেই, যখন তাঁর প্রতিভাসূর্য সবে খ্যাতি ও প্রতিপত্তির মধ্যগগনে পৌঁচেছে—তাঁকে নিজের সকল কীর্তির ইতিহাসে পূর্ণচ্ছেদ টেনে দিয়ে চলে যেতে হ’ল; নইলে ইংরেজ হয়ত কোনওদিনই দিল্লীর তখ্তে বসতে পেত না।
এমন কি নাদির শাহের আগমনের সংবাদ পেয়ে বাজীরাও তার স্পর্ধাকেও চিরদিনের মতো চূর্ণ করার অভিপ্রায়ে নিজের সমস্ত শক্তিকে একত্রিত করতে চেয়েছিলেন, হয়ত তিনি বেঁচে থাকলে তা সম্ভবও হ’ত। ইতিপূর্বে তাঁর ‘হিন্দু-পাদ-পাদশাহী’র ধুয়ায় অনেক হিন্দু রাজা সর্বস্ব পণ করেছেন—এবারেও করতেন নিশ্চয়। তাছাড়া বহু মুসলমান প্রধানও তাঁর সঙ্গে সৌহার্দ্য-সূত্রে আবদ্ধ ছিলেন, কেউ কেউ ভয়েও সাহায্য করতে বাধ্য হতেন।
কিন্তু বাজীরাও যখন মারা গেলেন তখন তাঁর ছেলে বালাজী বাজীরাও মাত্র আঠারো বছরের বালক—কিছু বিলাসী ও আরামপ্রিয়। তবুও তিনি সেই ভোগসুখের মোহ বিসর্জন দিয়ে নিজেকে কঠিন ভাবে রাজকার্যে নিয়োজিত করলেন। তখনকার দিনে কর্তব্যের ডাকে সাড়া দেওয়াটা মারাঠাদের রক্তমাংসের সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছিল—কে জানে বালক আর কে জানে শিশু! তবে—বালাজী বাজীরাও পিতার মতো বুদ্ধিমান কূট রাজনীতিক ছিলেন না, পিতার মতো তাঁর দূরদৃষ্টিও ছিল না। তিনি দুটি বড় রকমের ভুল ক’রে ফেললেন, যার ফলে মারাঠা ক্ষমতা ভেতরে ভেতরে দুর্বল হয়ে পড়ল। প্রথম ভুল হ’ল নতুনকালের সমরকৌশলে মারাঠী সেনাদের শিক্ষিত করবার চেষ্টায় নানা জাতের এবং নানা দেশের ভাড়াটে যোদ্ধাকে এনে ঢোকালেন মারাঠা বাহিনীর মধ্যে—তার ফলে শিবাজীর সময় থেকে মারাঠা বাহিনীতে যে জাতীয়তা বোধ ছিল, তা নষ্ট হয়ে গেল। অখণ্ড একতা এবং একই ভাবের উদ্দীপনা আর রইল না। বরং বিভিন্ন শিক্ষাদীক্ষা ও প্রকৃতির মধ্যে শৃঙ্খলা ও নিয়মানুবর্তিতা রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়ল। আর একটি বড় রকমের ভুল হ’ল বাজীরাও-এর ‘হিন্দু-পাদ-পাদশাহী’র ধুয়া বিসর্জন দেওয়া। এই আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে না হোক্ অনুপ্রাণিত ক’রে বাজীরাও ভারতের অন্যান্য হিন্দু রাজাদের মারাঠা-পতাকাতলে সমবেত করতে পেরেছিলেন কিন্তু, বালাজীর নির্বুদ্ধিতায় মারাঠারা হিন্দু মুসলমান নির্বিশেষে সকলকেই শত্রু ক’রে তুলতে লাগল। তারা মুসলমান নবাবদের কাছ থেকেও যেমন চৌথ নেয়, হিন্দু রাজাদের কাছ থেকেও তেমনি। ফলে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের পুরোধারূপে গণ্য না ক’রে ভারতবাসীরা ওদের হিন্দু মুসলমান সকলকারই শত্রু বলে মনে করতে লাগল।
তবুও বালাজী কিছুদিন পর্যন্ত তাঁর সাম্রাজ্য চতুর্দিকে বিস্তৃত করতে পেরেছিলেন। ১৭৫৬ খ্রীষ্টাব্দে তিনি মল্লহর রাও হোলকার এবং ভ্রাতা রঘুনাথ রাওকে (বা রাঘবা) বিপুল একদল সৈন্য দিয়ে পাঠালেন উত্তরের দিকে। মারাঠারা সুকৌশলে ভরতপুরের জাঠদের সঙ্গে বন্ধুত্ব স্থাপন ক'রে আবার উত্তরাংশে নিজেদের শক্তিকে সুপ্রতিষ্ঠিত ক'রে তুললে। এর কিছুদিন আগেই উত্তর-পশ্চিম ভারত দুরানীদের আক্রমণে বিপর্যস্ত হয়েছে। যদিও তখন আহম্মদ শাহ আবদালী দিল্লী থেকে চলে গিয়েছেন, সেখানে বাদশার উপর বাদশাহী করার জন্য নাজিবউদ্দৌলাকে রেখে গিয়েছেন—আর পাঞ্জাবে রেখে গিয়েছেন নিজের ছেলে তিমুর শাকে। মারাঠারা ১৭৫৬-তে দিল্লী আক্রমণ ক’রে নাজিবউদ্দৌলাকে পরাস্ত করল। তিনি সন্ধিভিক্ষা করতে বাধ্য হলেন। এর পর রঘুনাথ রাও পাঞ্জাবের দিকে মন দিলেন। পরের বছরে গোড়ার দিকেই ওঁরা পাঞ্জাব দখল করে সেখানে ওঁদের আশ্রিত আদিনা বেগ খাঁকে রাজপ্রতিনিধি নিযুক্ত ক'রে দীর্ঘকাল পরে দেশে ফিরে এলেন।
আপাতদৃষ্টিতে এ জয় বড় কম নয়। কারণ মারাঠা শক্তি ভারত আফগান সীমান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে পড়ল। কিন্তু আসল লাভ বিশেষ কিছু হ’ল না। নগদ টাকা কিছু হাতে তো এলই না—বরং বিপুল ঋণের বোঝা ঘাড়ে চাপল। কারণ বারবার দস্যুর আক্রমণে দেশের ওসব অংশে
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments