আগন্তুক
লোকটা অদ্ভুত। ছাই রঙা ফেল্ট টুপিটার তলায় তার দ্বিধায় ভরা হাসিটা আমায় খানিকটা বিভ্রান্ত ক’রে দিয়েছিলো, কেননা হঠাৎ আমার কেমন একটা অদ্ভুত ধারণা হ’লো যে আমি তাকে অস্বস্তিতে ফেলছি। সে অনেকক্ষণ চুপ ক’রে রইলো। আমি তার মধ্যে একটা অলুক্ষুনে কিছু খুঁজে পাচ্ছিলাম।
হঠাৎ প্রায় ক্ষমা চাওয়ার ভঙ্গিতে সে ব’লে উঠলো, ‘তুমি কি মিস্ গ্ল্যাডিসের ছেলে?’ দাঁতের মাজন আর মদের একটা মৃদু গন্ধ। আমি মাথা নেড়ে সায় দিলাম। সে অনেকক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে রইলো, মুখটা আধখোলা। চোখদুটো কেমন জলে ভরা, কৌতূহলী আর খানিকটা ব্যথাতুর।
আমি জিগেস করলাম, ‘আমি কি ওঁকে আপনার কাছে ডেকে আনবো?’
‘অ্যাঁ?’ আমি যে কোনো প্রশ্ন করতে পারি, তাতে সে যেন কেমন চমকে উঠলো; কিংবা হয়তো এতেই যে আমি তাকে কিছু জিগেস ক’রে ফেলেছি। ঢোঁক গিলে, আরো বেশি কৌতূহলের সঙ্গে সে আমার দিকে তাকিয়ে রইলো, তারপর ফিশফিশ ক’রে বললো, ‘ওঃ, ওঁকে ডেকে দেবে? হ্যাঁ, হ্যাঁ, তাই করো।’
দরজার দিকে যেতে-যেতে আমার মনে হ’লো লোকটা কী মজার।
‘মা।’
‘কী?’
‘এক ভদ্রলোক এসেছেন তোমার সঙ্গে দেখা করতে।’
‘এক ভদ্রলোক? কে?’
‘চিনি না। আগে কখনও দেখিনি।’
মা উঠে গিয়ে জানলা দিয়ে উঁকি মেরে দেখলো। এতক্ষণে আগন্তুকটির পরিচয় জানার জন্যে আমিও উদ্গ্রীব, তাই মা যখন জানলা দিয়ে উঁকি মারছে আমি মার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলাম। মা তাকিয়েই রইলো। একটুও নড়লো না, জানলার পাশে মাকে কেমন পাথরের মতো দেখাচ্ছিলো। আমি ভেতরে ঢুকে মায়ের মুখের ভাব দেখে ধাক্কা খেলাম।
‘কী হয়েছে, মা?’
মা কোনো উত্তর দিলো না। আমি বুঝতে পারলাম ভয়ানক কিছু একটা ঘটেছে। এর আগে কখনও আমি মাকে এমন কোনো অবস্থায় পড়তে দেখিনি, য। তার আয়ত্তের বাইরে। অন্তত তখন পর্যন্ত নয়।
‘মা...?’
‘ওঁকে গিয়ে বল্ যে আমি এখানে নেই…ওঁকে গিয়ে বল্ না…দাঁড়া, ওঁকে গিয়ে বল্ বল্ যে আমি আসছি।’
আমি বুঝতে পারলাম যে আগন্তুকটি যেই হোক সে কোনো-না-কোনোভাবে আমাদের… আর তক্ষুনি আমি তাকে ভয় পেতে শুরু করলাম। অথচ, যখন আমি তার কাছে ফিরে গেলাম তার চেহারা আমার মধ্যে কোনোরকম শঙ্কা জাগালো না। ওর মুখের ভাব দ্বিধাতুর, অস্পষ্ট আর সুদূর। আমার যাবতীয় ধারণার সে ঠিক উল্টো। এক মুহূর্তের জন্য আমি এই ভেবে ফেলেছিলাম যে সে আমায় ভয় পাচ্ছে। এই ভাবনা আমার ছেলেমানুষি দম্ভকে যথারীতি উসকে দিলে।
আমি তাকে বললাম, ‘মা বললেন, আসছেন।’ মৃদুস্বরে সে আমায় ধন্যবাদ জানালো। মা দরজা দিয়ে বেরিয়ে, থেমে তার দিকে তাকিয়ে রইলো। মার দিকে এগিয়ে গেলো সে আর কয়েক গজ দূরে দাঁড়িয়ে পড়লো যেন স্তব্ধতার কোনো চক্রান্ত শাসন করছে তাদের, কিংবা বলা উচিত আমাদের মধ্যে, কারণ এতক্ষণে আমিও এক হতবাক্ দ্রষ্টা, পুরো ব্যাপারটা বুঝে দেখার চেষ্টা করছি। শেষ অব্দি আগন্তুকটিই স্তব্ধতাটা ভেঙে দিলে।
‘এই যে, গ্ল্যাডিস্! আশা করি তোমায় খুব বেশি তাক লাগিয়ে দিইনি?’
‘কী ক’রে খুঁজে বার করলে আমার ঠিকানা তুমি?’ মার গলার স্বর অস্বাভাবিক সংযত, যদিও তার মধ্যে একটা মৃদু ভয় দেখাবার রেশও ছিলো।
‘ওঃ, আমি এই শহর দিয়েই যাচ্ছিলাম। ওই চীনে লোকটার দোকানে তোমায় চেনে কিনা জিগেস করায় ওরা দেখিয়ে দিলো…’
আর এক দফা দীর্ঘ নিঃস্তব্ধতার পর মা তাকে ভেতরে ডাকলো। দরজাটা আধ-খোলা প’ড়ে রইলো আর পরের পনেরো মিনিট আমি সেই দরজার দিকে চুপচাপ তাকিয়ে রইলাম। শুনতে পেলাম মা আমায় ডাকছে। শেষ অব্দি সেই আগন্তুকের রহস্য সমাধানের আশায় আমিও লাফিয়ে উঠলাম। শার্টটা ভদ্রভাবে প্যান্টের মধ্যে গুঁজে নিলাম। মা ফের আমায় ডাকলো, কেমন যেন অধীর। আমি ছুটে ভেতরে
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
৳৯৯
এক মাস
৳৩০
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments