পাঞ্জাবী গল্প
পাঞ্জাবী সাহিত্যের সূচনালগ্নেই পাঞ্জাবী গল্পের উদয় হয়েছে। পাঞ্জাবী সাহিত্যের স্বকীয় বৈশিষ্ট্য সত্ত্বেও, এই সাহিত্য-প্রবাহের গতি সমগ্র ভারতীয় সাহিত্য, বিশেষতঃ উত্তর ভারতের সাহিত্যেরই অনুরূপ। যে সময়ে হিন্দী ভাষায় রাসো সাহিত্য রচিত হচ্ছিল ও মারাঠি ভাষায় পওয়াড়ো সাহিত্য জন্ম নেয়-সেই যুগেই পাঞ্জাবী ভাষায় ‘ওয়ারোঁ’-র উদয়। ‘ওয়ারোঁ’গুলি পাঞ্জাবের বীরগাথা, কাব্যরূপে বর্ণিত। ‘ওয়ারোঁ-র নায়ক হতেন সাধারণতঃ জননেতা, এগুলি জনসাধারণের সমুখে গেয়ে শোনানো হত। পাঞ্জাবে পাঞ্জাবীর স্বাধিকার ছিল না। উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত থেকে আক্রমণকারীদের আনাগোনা থাকত অব্যাহত।
পাঞ্জাবের গ্রামগুলিকে নিজেদেরই আত্মরক্ষার ব্যবস্থা করতে হত। যখনই বিদেশী সেনা সদলবলে আক্রমণ চালাতো, লোকেদের লড়তে হয়েছে আপন ধনপ্রাণ ও সম্মান রক্ষার জন্য, আর আক্রমণ শিথিল হয়ে গেলে স্বীয় যোদ্ধা বীরদের ‘ওয়ারোঁ’ গাওয়া হত। এই ‘ওয়ারোঁ’গুলোই পাঞ্জাবী শৌর্যকে উত্তপ্ত ও উদ্যত করে রাখত—আসন্ন যে কোনো সংকটে তাদের তৈরী রেখে। এই যুদ্ধ কাহিনীগুলির নায়ক পাঞ্জাবের মাটিতেই জন্মেছে, বড় হয়েছে, সাধারণ মানুষের অতি চেনা, কাছের লোক। তাতে কাপুরুষতা ও অতিরঞ্জনের স্থান নেই। যেহেতু এই ‘ওয়ারোঁ’ জন-সাধারণের সমুখে গেয়ে শোনানো হত, তাই এতে মিথ্যে প্রশংসা করা যেতনা। কোনো যুদ্ধে পরাজিত নায়কের ‘ওয়ারোঁ’ রচনা করা সম্ভব ছিলনা। জন-নায়ক, জন-গায়ক, জন-শ্রোতা-পাঞ্জাবী কাহিনীর প্রারম্ভিক এই রূপই পাঞ্জাবী সাহিত্যের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য চিরতরে নির্ধারিত করে দিয়েছে।
এই ‘ওয়ারোঁ’ আজকাল আর পাওয়া যায় না। এদের নিশ্চিত সংকেত গুরুগ্রন্থে সংরক্ষিত। গুরুগ্রন্থ পাঞ্জাবী ভাষার সবচেয়ে প্রাচীন প্রামাণিক গ্রন্থ। এই গ্রন্থের একটি অক্ষরও বদলে দেবার অনুমতি কারো নেই। এইজন্যে এই গ্রন্থে সুরক্ষিত সংকেতগুলো আমাদের কাছে ঈশ্বরের বাণীর মতোই প্রিয়। মলিক মুরীদ, চন্দ্রহড়া সোহিয়া, রায় কমাল, টুণ্ডা অসরাজ, লল্লা বহলীম। জোধা ধারা পূরবাণী, রায় মহমা হসনী, মুসা ইত্যাদি অনেকগুলো নামের সঙ্গে জড়িত ‘ওয়ারোঁ’ বা বীরদের কাহিনীর সংকেত আমরা গুরুগ্রন্থে পাই।
কিন্তু এই গল্পগুলো ছন্দলয় মিলিয়ে পদ্যে লেখা হয়েছিল। গল্প সে যুগে ছিল কবিতার অঙ্গ; তার নিজস্ব কোনো রূপ ছিলনা। স্বতন্ত্র কথারূপের উদ্ভব গুরু নানকের কালে। গুরু নানক পাঞ্জাবের জলমাটির বিরাট পুরুষ, তার বহুমুখী প্রতিভা পাঞ্জাবী জীবনের অজস্র দিককে প্রভাবিত করেছে। পাঞ্জাবকে পঞ্চনদীর দেশ বলা হয়। গুরু নানককে যদি পাঞ্জাবের ষষ্ট নদ রূপে গ্রহণ করা যায়, তাহলে তা খুবই সমীচীন হবে; যেভাবে পাঞ্জাবের পাঁচটি নদী পাঞ্জাবের মাটিকে সিঞ্চিত করে রেখেছে তেমনি গুরু নানক পাঞ্জাবের জন-মানসকে সিঞ্চিত করেছেন। “পঞ্জাব ন হিন্দু ন মুসলমান, পঞ্জাব জিন্দা গুরু দে নাম তে” (পাঞ্জাব না হিন্দু না মুসলমান, পাঞ্জাব গুরুর নামেই বেঁচে আছে)। পাঞ্জাবী সাহিত্যের উদয় গুরু নানকের সঙ্গে সম্পর্কিত, আবার তাঁর নামকে ঘিরেই পাঞ্জাবী গদ্য-গল্পও বিকশিত হয়েছে। এই গল্পকে বলা হয় সাখী। এই সাখীগুলির নায়ক পাঞ্জাবের জন নায়ক গুরু নানক। যদিও এই সাখীগুলিকে আজ আমরা ধর্মীয় কাহিনী বলতে পারি কিন্তু এতে আধুনিক গদ্য গল্পের বীজ নিহিত। গুরু নানকের ধর্ম-ভাবধারা সাম্প্রদায়িকতা থেকে মুক্ত। সাখী রচয়িতাদের ধর্ম-ভাবধারাও সাম্প্রদায়িকতা রহিত। গুরু নানক ভারতের চারিটি দিকেই ভ্রমণ করেছিলেন, ভারতের বাইরের দেশগুলিতেও। ঐ সাখীগুলো নানা ধরণের জীবজন্তু, দেশ-অঞ্চল নানা ঋতু ও মানুষ সম্পর্কিত। এতে রাজা ও তাদের মোসাহেব আছে, গরীব ছুতোরও; ধর্ম-কর্মে লিপ্ত সুকী এবং সন্ত-ফকির যেমন আছেন, তেমনি রয়েছে সব রকমের ধর্মভাব থেকে অসম্পৃক্ত খুনে, চোর, ঠগী, রাহাজানিতে দক্ষ ও রাক্ষসেরাও। গুরু নানকের সঙ্গে জড়িত হওয়া সত্ত্বেও প্রত্যেকটি গল্প জীবনের সঙ্গে প্রত্যক্ষ পরিচয় ঘটায় এবং জীবনের কোনো না কোনো মৌলিক ডাইমেনশনের উপর আলোকপাত করে। এতে আছে বহুমুখীবৈচিত্র ও গভীরতা। শৈলীর দিক থেকে দেখতে গেলে এই সাখীগুলি আজকের লঘু কাহিনীর খুবই কাছাকাছি। সবচেয়ে চিত্তাকর্ষক তথ্য হল, সাখী সাহিত্য গল্পকে নিছক উপদেশমূলক কথা-বৃত্তি থেকে
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments