অন্তরীক্ষ
আমার অল্পবয়সী বন্ধু অনিমেষ বললে, ধূসর রঙের সকাল ছিল... ধূসর বলছ? তো, ধূসর কিন্তু, তোমাকে বলব কি, গেরায়া, হলুদ, এসব জাতের নয়। জানো তো, বরং তা কালোর দিকে...
তাই তো বলছি। আটাত্তর ভাগ কোবাল্ট নীলে বাইশ ভাগ কালো দিয়ে, তারপরে প্রয়োজন মতো, যেখানে যে রকম দরকার ফ্লেক সাদা দিচ্ছে বলো, বলো, বললুম। ভালো লাগল একজন রং চিনছে, পৃথিবীটা ওর চোখে একরঙা চীনা কালিতে আঁকা নয়।
তো, সেই ধূসর রঙের বাঁধনি শাড়ী যেন, সিল্কের, ফলে স্বচ্ছ আর ঝলমলে; ধূসরের উপরে হলুদ চুবিয়েছে নিচের পাড়ের দিকটা।
হলদেটা সবুজে ভাব নেবে না?
তাই। তখন সকাল সাড়ে সাত হয়, ওদিকে মার্চ শেষ হয়ে এপ্রিলে পা পড়েছে; হঠাৎ সেই স্মগ, আমার আবার ধোঁয়াশা শব্দটা ভাল লাগে না, ম-টাকে চন্দ্রবিন্দু না করে বাঁচিয়ে রাখা যায় না? সেই স্মগ্ যেন শাদাটে আকাশের গায়ে মেঘ যা এক নীল নীল লেগুনসমেত দৃশ্য যা দেখে যাও বলে কাউকে ডেকে এনে দেখাতে গেলে সে এর থেকে বেরিয়ে আসতে আসতে চেহারা বদলায়, নয় তো মিলিয়ে যায়। সেই স্মগ্ যখন সিল্কের বাঁধনি শাড়ীর রং শুকোতে নরম রোদে টেনে দেয়ার মত ব্যাপার, মনে রাখবেন স্বচ্ছ আর ঝলমলে, তার ওপারে বাড়িটাকে দেখা গেল, দরজা হাট খোলা। দরজা বলে দরজা, যেন থিয়েটারের স্টেজ-ফ্রন্ট, যা দিয়ে পর পর সাজানো উইংস্ আর স্কাইএর মতো পর পর রাখা থামের আভাস আর খিলানের ঢেউ চোখে পড়ে। শ্বেতপাথর নয়, বরং যেন গ্রানাইট, অথচ প্রচুর এক নম্বর সিমেন্টের কল সেই বাড়িটা।
অনিমেষ ব্যস্ত লোক, তার উপরে সেই সকালে সাহিত্য সংসদের সভায় চলেছিল। রাতে এক পশলা জোর বৃষ্টি হওয়াতে ওর গন্তব্যের দিকে সোজা পথগুলোতে তখনও ময়লা স্থির জল অনেক জায়গাতে। বাসট্রামের গোলমাল, ট্যাক্সির বিভ্রাট, ওদিকে কোঁচানো কোঁচা আর নতুন কোল্হাপুরী বাঁচাতে হয়; ফলে এ-পথ সে-পথ কেটে জুড়ে অবশেষে এই পথটাতে এসে পড়েছিল যা শুকনো, অথচ তখনও জলের ভিজে ভাব; ঠং ঠং বাজিয়ে একটা দুটো রিকসা, মিনিট তিনচারে একটা কার কিম্বা ট্যাক্সি, যেন তখনও পাড়াটার ঘুম ভাঙেনি, যদি পিঠে-ব্যাগ স্কুল ইউনিফর্ম পরা দুচারজন সদ্য মুখ ধোয়া সাত আট বছরেরগুলোকে না ধরো। কতকটা যেন অচেনা একটা স্কোয়ার, খানিকটা পুরনো, নিঝুম বলে অবাক করা।
আর সেই স্কোয়ারে বাড়িটা। তিন কাঠার উপরে বারোতলা। ওই ঢাকায় অনায়াসে, এমন কি সল্টসীতে, বাগানে ঘেরা চারটে বাড়ি হতে পারতো, গ্যারাজ সমেত। জোর বাতাস হলে উপরের দুতিনটে তলা নাকি কাঁপে। যেন লম্বাটে পিরামিড, যেন মনুমেন্ট যার মাথায় ঘড়ি মতো চেহারার গোল চোখে, যেন, চারপাশের লিমোজিন ভাসা স্রোতে লাইট হাউস। অবশ্যই চারপাশের বাড়িগুলো বাড়িটার' তিনপাশের গলি দুটো এবং একটা বড় রাস্তার ওপারে যতদূর সম্ভব চেপে এসেছে। সংকীর্ণ, বিপজ্জনক; উলঙ্গ অশ্লীলতার কথাও মনে হতে পারে মাঝরাতের হাল্কা অন্ধকারে।
সংকীর্ণ তো বটেই। মাঝখানে চৌকোণ বাগানের জায়গা ছেড়ে চারি-দিকে ঘিরে জল, ঘর, হল এমন কায়দায় উঠেছে। ফলে যদি নিচতলার সেই সিমেন্ট বাঁধানো বাগান যাতে নানা আকারের, ছ ইঞ্চি থেকে তিন ফুটের ব্যাস তাদের, টব, কৃত্রিম পাহাড়, ক্যাকটাসের জন্য বালিয়াড়ি ইত্যাদি, যেখানে দাঁড়িয়ে উপর দিকে চাইলে ফাইবার গ্লাসের ডোম যা দিয়ে রাতের আলো দিনের আলো বাগানে পড়ে। ফলে নিচের চারতলা পর্যন্ত কয়েকটা করে কম্প্যাক্ট ফ্ল্যাটের কথা ভাবা যায় মাঝখানের সেই শ্যাফটকে ঘিরে, কিন্তু শেষ কয়েক তলায় সিড়ির আর লিফটের হ্যাচ ছেড়ে দিলে দু-একটা করে কেবিন কুটুরি ছাড়া আর কারই বা জায়গা হয়।
সংকীর্ণ তো বটেই। এতটুকু মনে ছিল ছেলেমেয়েদের কথা? চারটি ছেলেমেয়ে-যারা পুত্রপৌত্রাদি ক্রমে বেড়েছে, বাড়ছে। নিজের,
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments