শহর এবং শব্দ এবং সুবিমল

সুবিমল আজকাল, মানে বেশ কয়েকটা মাস, বাড়ি ফিরতে ভয় পায়। বাড়ি ফেরাটাই তার কাছে সবচেয়ে বিপজ্জনক। তার অন্য বন্ধুরা যখন শেষ টান দিয়ে হাতের সিগারেটটাকে আঙুলের টোকায় জ্বলন্ত হাউয়ের মতো ছড়ে দেয় কলকাতার হাড়-পাঁজরের ভিতরের কোনোখানে, আর তারপরই পতাকার মতো হাত-নাড়ায় বন্ধু দের গুডনাইট জানিয়ে ট্রাম বা বাসের স্টপেজে নাচের ভঙ্গীতে শরীরে অদ্ভুত একটা একানো মোচড় দিয়ে দাঁড়ায়, সংবিমল ঈষায় জ্বলে। বাড়ি ফেরার মহূর্তে কী অসম্ভব স্বাভাবিক হয়ে যেতে পারে তারা। যেন জীবনে কোথাও কোনো টেনশন নেই । নেই এমন প্রশ্ন যা ঘরে ফেরার সময়ও থ্যাঁতলানো মাটির মতো বাঁকিয়ে দিতে পারে তাদের মুখরেখা। কী বিস্ময়কর রকমের হালকা হয়ে যেতে পারে ওরা মাত্র তিন মিনিট আগে নিজেদের ঘাড়ে চাপানো পাহাড়-প্রমাণ সমস্যা- সংকটের ভিতরে ছটফটিয়েও। তিন মিনিট আগেও কত চোঁচির হিসেব- নিকেশ, যা কখনো রাজনীতির, কখনো সাহিত্যের বা সংস্কৃতির কখনো বা সময়ের সাত-সতেরো আধি-ব্যাধির। তিন মিনিট আগেও চায়ের টেবিলে এমন শব্দময় চিৎকার, যুক্তিযুদ্ধ, যেন সভ্যতার যাবতীয় সংকটের চূড়ান্ত হেস্তনেস্ত না হওয়া পর্যন্ত থামবে না কেউ। চায়ের টেবিলের সেই শব্দচুল্লী থেকে বেরিয়ে কেউ কেউ হাতের ছড়ানো মুঠোয় মাথার চুল- গুলোকে গোছা করে টেনে ক্রমশ উপরে তুলতে তুলতে অসম্ভব ক্লান্ত ভঙ্গীতে বলে, এ্যাই, আমি কাটছি, বাড়িতে গিয়েই চার মগ জল মাথায় না ঢাললে মরে যাবো। বিমল মনে মনে মুষড়ে পড়ে সে-রকম দৃশ্যে। তার বাড়িতেও রয়েছে চৌবাচ্চা, বাথর, ম, জল এবং ক্রমাগত আয়রন ছোপে লালচে হয়ে যাওয়া নীল মগ। কিন্তু সে কী পারবে মাথায় চার কিংবা ছয় দশ মগ জল ঢেলে সারাদিন ধরে মগজের স্তরে স্তরে জমে ওঠা শব্দ, শব্দ, যা আসলে প্রশ্ন, শব্দ, যা আসলে তার এবং তার নিজস্ব পরিমণ্ডলের অস্তিত্বের আভ্যন্তরীণ অগ্ন্যৎপাত, শব্দ, যা আসলে জড়ো হয় তার জীবন-পরিধির সমস্ত খানা-খন্দ, নদী-নালা, গ,হা-গহ্বর থেকেই অবিরত, সেসব শব্দকে ধুয়ে-মুছে দিতে? ধুয়ে-মুছে দিতে চাইলেই কি তার মগজটা হয়ে যাবে শব্দের সংঘাতহীন এক ফরফরে গন্ধের বেল কিংবা যাইয়ের বাগান? হবে না। হয় না। বিমল জানে হবার নয় ৷

পরশ, কফি-হাউসে অমরদা লিবিয়া ঘটনাটা নিয়ে এমনভাবে ফেটে পড়লেন, যেন সেটা তাঁর ব্যক্তিগত জীবন-মরণেরও সমস্যা অথচ কফি হাউস-এর আলো নিভে যাওয়ার মহতেই দোতলার সিড়ি ভেঙে একতলায় নামতে নামতে অন্য মানুষ। যেন পার্ট বলা শেষ। আর নাটকের চরিত্র নন তিনি, নিজের চরিত্র। এখন চলেছেন নিজের বাড়ি, মুখ থেকে অন্য চরিত্রের মেক-আপ তুলতে । অমরদা যেখানে থামেন, সাবিমলের ভাবনার সেইখান থেকে শুরু । অমরদার উত্তেজনার প্রত্যেকটি শব্দ বিমলের মগজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। সে বাড়ি ফিরলেও, এই সব শব্দের ঘাত-প্রতিঘাত থেকে নিস্তার নেই তার ৷

সবীর, তার আপিসের কোলিগ, মাত্র কদিন আগে প্রথম হাবিব তান- বিরের নাটক দেখে উন্মাদ ' আর তার পরমুহূর্ত থেকেই সে কলকাতার নব-নাট্য আন্দোলনের মুগ্ধ দর্শক থেকে ক্ষুব্ধ সমালোচক। তার বিরক্তি-বিদ্রূপ এমনই ঝাঁঝালো যে, কলকাতার হালফিল নাট্য আন্দোলনের ধরন- ধারন সম্পর্কে ততখানি সহানুভূতিশীল না-হওয়া সত্ত্বেও বিমল বীরের বাড়াবাড়ি রকমের একপেশে মন্তব্যগুলোকে ঘা-মারার জন্যেই রুখে দাঁড়ায় প্রতিপক্ষ হিসাবে। তর্ক গড়ায় ৷ কিন্তু সেই সংবীর অমন তুলকালাম তর্কে'র মাঝখানে হঠাৎ বান্ধবীর টেলিফোনের ডাকে সাড়া দিতে ছ,টে যায় যখন, যখন গলা নামিয়ে আর গলায় সর এনে কথা বলে ঠোঁটের কোণে হাসির টানি বাদ, জালিয়ে, শিল্প বনাম বাস্তবতার সমস্যা থেকে তখন সে হাজার মাইল দূরে। সেটাই স্বাভাবিক। কোনো কোনো প্রহরে সাংস্কৃতিক সংকট যতোখানি বড়ো, কোনো কোনো প্রহরে টেলিফোনে বারবার অভিমান-অভিযোগ ঠিক ততোখানিই ৷ এ রকমই তো হওয়া উচিত। কিন্তু সংবিমলের বেলায় তেমন

লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন

আকর্ষণীয় মূল্য

এক বছর

৪৯৯

এক মাস

৯৯
মেয়াদ শেষে নতুন দামে নতুন করে গ্রাহক হতে হবে

যোগাযোগ করতে

+৮৮ ০৯৬০৬০৩৩৩৯৩
রবিবার–বৃহস্পতি: সকাল ১০টা–সন্ধ্যা ৬টা (সরকারি ছুটিরদিন ব্যতীত) অথবা ভিজিট করুন FAQ

You Might Also Like

Comments

Leave A Comment

Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Get Newsletter

Featured News

Advertisement

Voting Poll (Checkbox)

Voting Poll (Radio)

Readers Opinion

Editors Choice