অশরীরী
আর সকলের বিবৃতি শেষ হইলে শৈলেনের উপর তাগাদা হইল, 'এবার এ-বিষয়ে তোমার কি অভিজ্ঞতা আছে বল।'
শৈলেন বলিল, 'আমায় বরং ছেড়ে দাও।'
সুধেন প্রশ্ন করিল, 'তার কারণ?'
শৈলেন বলিল, 'আমি যদি কিছু বলতে যাই, তোমরা তার মধ্যে নিশ্চয় কোন গল্পের প্লট আছে মনে করে বসো। ফলে এমন সন্দেহের সঙ্গে প্রত্যেক কথাটি শোন তোমরা যে, আমি বলে কোনও আরামই পাই না। কোথায় ভরা বিশ্বাসে মন দিয়ে শুনবে, না কেবলই আমার প্লটের ফাঁকি ধরে ফেলবার চেষ্টা! যখন সত্যিই কোনও গল্প হাঁকড়াই, তখন এটা সহ্য করা যায়, কিন্তু যখন নিজের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার বর্ণনা করছি, তখনও যদি--'
তারাপদ বলিল, 'এতে অভিমানের কিছু নেই, এ তোমাদের প্রায়শ্চিত্ত। তোমরা লেখকেরা সামান্য অভিজ্ঞতাকেও ঘুরিয়ে ফিরিয়ে সচেতন, অচেতন, অবচেতন নানা রকম জিনিসের দোহাই দিয়ে এমন একটা জিনিসে দাঁড় করাও যে, তোমরা যে কখনও সত্যের যথাযথ রূপ বজায় রাখবে, এটা বিশ্বাস করা কঠিন হয়ে পড়ে।'
সুধেন বলিল, 'ও বেচারাদের মুশকিল আছে, সত্যের যথাযথ রূপ বজায় রাখলে ওদের পেট চলে না। তোমরা চাও রস, সত্য কথায় তা মোটেই নেই।
যুধিষ্টিরের সমস্ত জীবন আগাগোড়া দেখে গেলে মাত্র একটিবার রস বা রসিকতার সন্ধান মিলবে-যখন তিনি 'ইতি গজ' বলেছিলেন। অবশ্য কখনও রসের অপব্যয় করেননি বলে রসিকতাটা একটু মারাত্মক রকম হয়ে জমে উঠেছিল-নাও শৈলেন, এই চমৎকার রাত্রের উপযোগী একটা গল্প ফাঁদ-ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা হয় ভালই, গাল-গল্প হয় আরও ভাল, এই ভুতুড়ে রাত্রির রুদ্ররসে আমরা একটু ডুবে থাকতে চাই।'
সুধেন র্যাপারটা ভাল করিয়া গায়ে জড়াইয়া গুটাইয়া সুটাইয়া বসিল।
শৈলেন বলিল, 'নাঃ, মিথ্যেবাদী বলে ক্রমেই যেরকম বদনাম হয়ে যাচ্ছে, সত্যিকার অভিজ্ঞতাই একটা বলি।'
সুধেন বলিল, 'আমার গা শিউরনো চাই কিন্তু। সেইজন্যে আমি গা আর মন দুটোকেই মুড়ি দিয়ে তোয়ের হয়ে বসেছি।'
শৈলেন বলিল, 'যাতে আমার সমস্ত শরীর অসাড় করে সংজ্ঞালোপ করে দিয়েছিল, তাতে তোমার গায়ে একটু কাঁটাও জাগাতে পারবে না, এত বড় বীর তোমায় আমি মনে করি না।'
একটু চুপচাপ গেল; অলৌকিক গল্পের উপক্রমণিকা হইতেছে মৌনতা। গল্প বলিবার বা শুনিবার আগে লোকে যেন অনুভব করে, সে একটা নিষিদ্ধ জগতে প্রবেশ করিতেছে, চকিত হইয়া একটু থমকাইয়া দাঁড়ায়।
শৈলেন দূর ভবিষ্যতে কোথায় যেন একটু চাহিয়া রহিল, তাহার পর ধীরে ধীরে আরম্ভ করিল--
ব্যাপারটা ঘটে ছোটনাগপুর সাইডে একটা জায়গায়-একটা ডাকবাংলোয়। জায়গাটার নাম আর খুলে বললাম না। রাঁচী থেকে বেরিয়ে অনেকগুলো রাস্তা অনেক দিকে চলে গেছে, তারই একটার একটা ডাকবাংলোর কথা বলছি। আমার তখন তিন বছরের জন্যে বনবাস, ফরেস্ট রেঞ্জার্সের চাকরি নিয়েছি, একটা জঙ্গলের চার্জ নিতে হবে।
মোটরবাসে চলেছি। শীতের সময়, বেলা প্রায় চারটের সময়ই দিন মলিন হয়ে এল। দূরে আকাশের কোলে এমুড়ো-ওমুড়ো একটা লম্বা পাহাড়ের রেখা আমাদের মোটর এগুবার সঙ্গে সঙ্গে স্পষ্ট হয়ে উঠতে লাগল; যেন বিরাটকায় কি-একটা এতক্ষণ শুয়ে ছিল, আমাদের এগুতে দেখে গা-ঝাড়া দিয়ে দাঁড়িয়ে উঠেছে। ঐ পাহাড়টা ডিঙিয়ে যেতে হবে আমাদের। ভয়, আগ্রহ, বিস্ময়ের সঙ্গে সঙ্গে বেশ একটা কৌতুক বোধ করছিলাম। প্রায় ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই আমরা পাহাড়ের নিচে পৌঁছে আঁকাবাঁকা পথ বেয়ে উঠতে আরম্ভ করলাম।
যখন প্রায় শিখরদেশে পৌঁছেছি, মোটর গেল বিগড়ে। সারাতে দেরি হবে, রাত্রি হয়ে যাবে। সান্ধ্য পাহাড়ের শোভা দেখবার জন্যে আমি মোটর থেকে নেমে খানিকটা তফাতে একটা পাথরের চাঁইয়ের ওপর গিয়ে দাঁড়ালাম। পেছনে রয়েছে একটা খাড়া শিখর, সামনে গভীর খাত, খুব গাঢ় হয়ে আসতে লাগল, একটা অস্বস্তিকর অনুভূতি মনটার ওপর জেঁকে বসতে লাগল। চারিদিকে পাহাড়ের ঢেউ, নিস্পন্দ, নিস্তব্ধ, রহস্যময়। অত বড় একটা বিরাট ব্যাপারের মধ্যে
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments