ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে : বন্দীশালার ভিতর থেকে
ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে : বন্দীশালার ভিতর থেকে
নলিনী দাস
১৯৩০-১৯৩১ সালে ধরা পড়ে আমরা বিপ্লববাদীরা যখন জেলে গেলাম—তখন ফ্যাসিবাদ কেন, সাম্রাজ্যবাদ কথাটারও সঠিক মানে বুঝতাম না। আমরা বুঝতাম আমাদের শত্রু বিদেশী ইংরেজ রাজত্ব; তারা শোষক ও লুণ্ঠনকারী। তাদের তাড়াতে হবে, পরাধীনতার শৃঙ্খল চূর্ণ করতে হবে। আন্দামানে দ্বীপান্তরে যখন গেলাম, তখনও এই রকমই মনোভাব।
আন্দামানেই প্রথম শুরু হল সবকিছু তলিয়ে বুঝবার চেষ্টা। পৃথিবীর নতুন নতুন ঘটনাবলী, নিজেদের তিক্ত অভিজ্ঞতা এবং দেশকে স্বাধীন করবার উদগ্র বাসনা—সবকিছু মিলিয়ে আমরা অসীম আগ্রহ নিয়ে জানতে চাইলাম, বুঝতে চাইলাম—সাম্রাজ্যবাদ কি, সমাজতন্ত্রই বা কি, মুক্তির পথই বা কি রকম?
আন্দামানে প্রথম দিকে ওরা আমাদের কাছে খবরের কাগজ, পত্রিকা, বই, কিছুই আসতে দিত না। পরে অনশন ধর্মঘটে আমাদের তিন জন বন্ধু প্রাণ দেবার পর, জেল কর্তৃপক্ষ আমাদের কাছে দেশী ও বিদেশী খবরের কাগজ, পত্রিকা ও বই আনতে দিল। ফলে পৃথিবীর ঘটনাপ্রবাহ আমরা টাটকা জানতে পারতাম।
তাই যখন পড়লাম যে ফ্যাসিস্ট মুসোলিনী ইতালীয় ফৌজ, কামান, বিমান নিয়ে আফ্রিকার গরীব অনুন্নত দেশ আবিসিনীয়ার উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে—তখন আমরা আবিসিনীয়ার পক্ষে, মুসোলিনীর বিরুদ্ধে মত জানালাম। জার্মানিতে হিটলারের তাণ্ডব, অস্ট্রিয়া জবরদখল ও চেকোস্লোভাকিয়া গ্রাসের তোড়জোড় এসবও আমাদের মনে গভীর ছাপ রেখে গেল।
তবে তিরিশের দশকের যে ঘটনা আমাদের মনকে সবচেয়ে বেশি করে সাড়া দিয়েছিল—তা হল ফ্যাসিস্ট ফ্রাঙ্কো ও তার সমর্থক ফ্যাসিস্ট জার্মানি ও ইতালির বিরুদ্ধে স্পেনের জনগণ, তাদের পপুলার ফ্রন্ট সরকার ও আন্তর্জাতিক ব্রিগেডের বীরত্বপূর্ণ লড়াই।
প্রতিদিন সন্ধ্যায় আমরা জেলে একটি ছোট প্রাচীরপত্র বের করতাম। নাম ছিল ‘আন্দামান বুলেটিন’। তাতে আমরা নিয়মিত স্পেনের খবর দিতাম, মাদ্রিদ কী অপরিসীম বীরত্বের সঙ্গে আত্মরক্ষা করছে, সারা পৃথিবীর সেরা বিপ্লবীরা আন্তর্জাতিক ব্রিগেডের নামে এসে স্পেনের মাটিতে রক্ত ঢেলে দিচ্ছে—এইসব। কয়েকটি ঘটনা মনে পড়ছে। জওহরলাল নেহেরু বার্সিলোনাতে রণক্ষেত্রে গিয়ে স্পেনের মুক্তিযোদ্ধাদের সৌহার্দ্য জানিয়ে আসেন। আমরা তাতে খুব উল্লসিত বোধ করি। দু-চার টাকা করে যে যা পারি জমিয়ে শতাধিক টাকা পাঠিয়েছিলাম জওহরলাল নেহেরু পরিচালিত ‘স্পেন সাহায্য তহবিল’-এ। আবার যেদিন পাকাপাকিভাবে খবর এল যে ফ্যাসিস্ট দস্যুরা বার্সিলোনা শহর দখল করে নিয়েছে, সেদিন আমাদের সবার চোখেমুখে শোকের ছায়া। খেতে পারলাম না কেউ কিছুই। পুলিশের শত অত্যাচারেও যেসব বিপ্লবীদের মুখ দিয়ে একটি কথা বেরোয় নি, তাদেরও চোখে সেদিন জলের ধারা। বার্সিলোনার পতন যেন কারাগারের মধ্যে থেকে কোনও পরমাত্মীয়ের মৃত্যুসংবাদ শোনার মতো।
একটি ছেলের কথা বলি। নাম তার হিমাংশু ভট্টাচার্য, মৈমনসিংহের বিপ্লবী। আন্দামানে বন্দী। আমরা যখন অনেকেই কমিউনিস্ট মতবাদ গ্রহণ করছি, তখন হিমাংশু ক্ষেপে গেল। সে বলতে লাগল: কমিউনিস্ট মতবাদ ধ্বংস করবার ক্ষমতা দেখিয়েছে শুধু হিটলার। তাই আমি হিটলারেরই ভক্ত, কেননা এইসব কমিউনিস্টদের তবেই শায়েস্তা করতে পারব। আমরা হিমাংশুকে ঠাট্টা করে বলতাম ‘হিটু’ (হিটলারকে ছোট করে)। পরে আমাদের চেষ্টায় সেই ‘হিটু’ ফ্যাসিবাদবিরোধী হল, কমিউনিস্ট দলে নাম লেখালো। জেল থেকে বেরিয়ে সোজা চলে গেল মৈমনসিংহে, নেত্রকোনায় গারো-হাজং অঞ্চলে। সেখানে স্বীয় কর্মক্ষমতার জোরে সে হল স্থানীয় কৃষকদের অতিপ্রিয় সঙ্গী কমিউনিস্ট নেতা। নেতৃত্ব দিল হাজংদের প্রসিদ্ধ সশস্ত্র কৃষিবিপ্লবের জমানায়। আহত হল ‘হিটু’ পুলিশের গুলিতে। ফেরারী অবস্থায় আহত অসুস্থ ‘হিটু’ বরণ করল শহীদের মৃত্যু। স্পেনের আন্তর্জাতিক ব্রিগেডের গৌরবময় কাহিনীই তাকে শেষ পর্যন্ত টেনে এনেছিল আমাদের শিবিরে ফ্যাসিস্টবিরোধী করেছিল তাকে। আমৃত্যু একনিষ্ঠ রইল সে ঐ বিপ্লবী আদর্শের প্রতি।
ফিরে আসি আবার আন্দামান কথায়। বার্সিলোনার পতনের পর আমরা, কমিউনিস্ট কনসলিডেশনের সভ্য ও সমর্থকরা, চাঁদা তুলে কমরেড স্টালিনকে একটি তার পাঠাই: চষবধংব ওহঃবৎাবহব। জানি না জেল কর্তৃপক্ষ সে তার কমরেড স্টালিনকে
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments