বাংলাদেশ ও বাঙালি সংস্কৃতি
এক
প্রায় হাজার বছর আগে ভারতবর্ষের পূর্বাঞ্চলে এক বিস্তৃত ভূখণ্ডে বাংলা ভাষা ও বাঙালি জাতিসত্ত্বার (Nationality) উদ্ভব ঘটেছিল। ড. দীনেশচন্দ্র সেনের মতে, প্রাচীন ও মধ্যযুগের বাংলা ছিল উত্তরে হিমালয়, দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর, পশ্চিমে ছোটনাগপুর ও পূর্বে লুসাই পাহাড় পর্যন্ত বিস্তৃত। সেই সময়ও বাংলা লিপিতে কয়েকটি ভাষা পাওয়া যায়। যথা- বাংলা, অসমিয়া, মনিপুরী এবং অতীতের মৈথালী ভাষা। বাংলা ভাষা এসেছে প্রাকৃত ভাষা থেকে যা সংস্কৃত সাহিত্যে (যথা কালিদাসের নাটকে) শ্রমজীবী ও সাধারণ মানুষের কথ্য ভাষারূপে দেখতে পাওয়া যায়।
ইতিহাসে বাঙালি অধ্যুষিত এই ভূখণ্ডের রাজনৈতিক মানচিত্র অনেকবার পরিবর্তিত হয়েছে। ব্রিটিশ যুগে বেঙ্গল নামে যে প্রদেশটি ছিল ১৯৪৭ সালে সেই প্রদেশটিকে দ্বিখণ্ডিত করা হয় মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ্র দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে। কীভাবে বাঙালির সংস্কৃতিকে অস্বীকার করে সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে এই বাংলাকে দ্বিখণ্ডিত করা হলো তার বিবরণ পাওয়া যায় ইতিহাসবিদ জয়া চ্যাটার্জির লেখা ‘বাংলা ভাগ হলো’ গ্রন্থে। ১৯৪৭ সালে বাংলা ভাগ হলো এবং পূর্ব বাংলা পাকিস্তানের ও পশ্চিমবঙ্গ ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়। এই পূর্ব বাংলার জনগণ প্রথম থেকেই পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর দ্বারা জাতিগত নিপীড়নের শিকার হয়েছিল এবং ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বর্বর শাসকদের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধ করে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করে। এসব ইতিহাস পাঠকদের জানা আছে, তাই বিস্তারিত বিবরণে যাওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। আমি শুধু এটুকু বলতে চাই যে, রাজনৈতিকভাবে বাংলা ভাষাভাষী মানুষ আজ বিভক্ত হলেও বাঙালির সংস্কৃতি এক ও অবিভাজ্য রয়ে গেছে। দুই বাংলার মানুষের সকলেরই আছে এক অতীত ইতিহাস, এক ঐহিত্য ও সংস্কৃতি।
দুই
বাঙালির সংস্কৃতির উৎস সন্ধান এবং আজকের বাংলাদেশে বাঙালির সংস্কৃতির স্বরূপ নির্ণয় করা এই নিবন্ধের আলোচ্য বিষয়। তার আগে সংস্কৃতি সম্পর্কে কিছু সাধারণ ধারণা তুলে ধরতে চাই। ‘সাহিত্য’ শীর্ষক এক প্রবন্ধে বাংলাদেশের অন্যতম বাম ধারার লেখক রণেশ দাসগুপ্ত বলেছেন, ‘দু হাজার বছর আগেকার রোমান কবি দার্শনিক লুক্রেটিয়াস তার কাব্যগ্রন্থে দেখিয়ে যান প্রকৃতির সান্নিধ্যে মানুষের প্রত্যক্ষ যোগাযোগে শিল্পকলার জন্ম। বাঁশি ও নাচ থেকে শুরু করে কৌতুক ও কাহিনী সবই প্রকৃতির নানান শব্দ ও ছন্দ থেকে শেখা। কিন্তু লুক্রেটিয়াসের মতে শিল্পকলার জন্ম প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতায়, সার্থকতা আনন্দে।’
তিনি আরও বলেন, ‘সভ্যতার সমগ্র ইতিহাসব্যাপী সংস্কৃতি তথা শিল্পকলা ও সাহিত্যের উপকরণ সঞ্চিত হয়ে এসেছে। কিন্তু শ্রেণী সমাজ তাদের কদর করতে পারেনি। যেখানে যেখানে শ্রেণী সমাজ বিদ্যমান, সেখানে সাহিত্য আজও তার সমৃদ্ধি সত্ত্বেও শৃঙ্খলিত, বিকৃত, খণ্ডিত, নিপীড়িত।’
সংস্কৃতি কেবলমাত্র শিল্পকলা ও সাহিত্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, ব্যাপক অর্থে সামাজিক চিন্তা, পরিবার ও নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি, ধর্মীয় আচার ও সামাজিক সংস্কার- সবটাই একটি জাতির সংস্কৃতির অন্তর্ভুক্ত। মার্ক্স-এঙ্গেলস কর্তৃক নির্মিত ঐতিহাসিক বস্তুবাদ বলে যে, উৎপাদন ব্যবস্থা ও অর্থনীতি একটি সমাজের ভিত্তি এবং সংস্কৃতি, দর্শন ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা হলো উপরিকাঠামো। সমাজ পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এই সংস্কৃতিরও পরিবর্তন ঘটে। সংস্কৃতিরও একটা শ্রেণি চরিত্র আছে, যথা- সামন্ত সংস্কৃতি, বুর্জোয়া সংস্কৃতি ও প্রলেতারীয় সংস্কৃতি। শ্রেণি বিভক্ত সমাজে রাজনৈতিক ক্ষেত্রের পাশাপাশি সাহিত্য ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও শ্রেণি সংগ্রাম চলে।
সাধারণভাবে একটি সমাজে শাসক ও শোষক শ্রেণির চিন্তা ভাবনা ও সংস্কৃতিই সেই সমাজে প্রাধান্য বিস্তার করে থাকে। ‘জার্মান ইডিওলজি’ গ্রন্থে মার্ক্স-এঙ্গেলস লিখেছেন, ‘প্রতিটি ঐতিহাসিক যুগেই শাসক শ্রেণির আইডিয়াই হচ্ছে প্রাধান্য বিস্তারকারী আইডিয়া। ...যে শ্রেণির হাতে আছে বস্তুগত উৎপাদনের উপায়সমূহ, তারা মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক উৎপাদনের উপায়সমূহও নিয়ন্ত্রণ করে।’ অর্থাৎ সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও সাহিত্য ও শিল্পকলায় শাষক শ্রেণিরই আধিপত্য থাকে এবং সেই অঙ্গনেও শ্রেণি সংগ্রাম চলে। এভাবে সমাজ বিকশিত হয় এবং সেই সমাজের সংস্কৃতিও পরিবর্তিত ও বিকশিত হয়। আমরা বাঙালি জাতির অতীত থেকে বর্তমান পর্যন্ত
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments