ওদের স্বপ্নের জানালাগুলোও বন্ধ হয়ে যায়


একটি শিশুছেলে ও মেয়েসন্তানের প্রতিভা, স্বপ্ন, ইচ্ছা, কল্পনার মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকে না। কিন্তু পরে সমাজে চলতে গিয়ে একজন মেয়ে নিজেকে শুধু মেয়েমানুষ ভাবতে বাধ্য হয়, যা তার স্বপ্নগুলোকে বাধাগ্রস্ত করে। কর্মক্ষেত্রে তাকে শুনতে হয়—এটা মেয়েদের নয়, ছেলেদের কাজ। নারী তার জীবনকে একটি ক্ষুদ্র গণ্ডির মধ্যে সীমিত রাখতে বাধ্য হয়। তারই সমবয়সী পুরুষের স্বপ্নগুলো হয় বিশাল এবং এক বৃহৎ জগতে হয় তার বসবাস। সমাজের এ চিরাচরিত চিত্রের পরিবর্তন একান্তই কাম্য। সবার ক্ষেত্রেই সবচেয়ে বড় পরিচয় হওয়া উচিত যে—সে মানুষ।

নারী বলে জীবনের বহু ক্ষেত্রে অংশগ্রহণের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবে, চার দেয়ালের মধ্যেই নারীর জীবন আবদ্ধ থাকবে—তা কখনো হতে পারে না। একবিংশ শতকেও সমাজের এ রকম ধারণা একজন নারীর স্বপ্ন দেখার ইচ্ছাকেই ধ্বংস করে দেয়। বাবা-মায়ের প্রথম যমজ সন্তান নিলয় ও নিতু (ছদ্মনাম)। ছোটবেলা থেকে তাদের চেহারা, স্বভাব একরকম। একই সাথে তারা হামাগুড়ি দেওয়া ও হাঁটা শুরু করে। প্রথম কথা বলাও একই সাথে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিলয়ের জন্য ফুটবল, ত্রিকেট ব্যাটসহ নানা খেলনা কেনা হয় কিন্তু নিতুর জন্য হাঁড়ি-পাতিল। নিতু ফুটবল খেলতে চাইলে তাকে বলা হয় এগুলো মেয়েদের খেলা নয়। সে প্রথম উপলব্ধি করতে বাধ্য হয় সে নারী। তার জগৎ ঘরে এবং রান্না-বান্না সংসার করাই তার দায়িত্ব। কিন্তু কোনো খেলাই নারী বা পুরুষের নয়। বর্তমানে নারীরাও ফুটবল, ক্রিকেট, হকিসহ নানা ধরনের খেলা খেলে কিন্তু সংখ্যায় খুবই কম।

ছোটবেলায় মাঠে সব শিশুদের সঙ্গে কিছুদিন খেলার সুযোগ হলেও পঞ্চম শ্রেণিতে ওঠার পর মাঠে খেলাধুলাও বন্ধ করে দেওয়া হয়, কেননা সে মেয়ে। কিন্তু তার ভাইয়ের খেলাধুলা চলতে থাকে। শুধু খেলাধুলা নয়, পড়াশোনার ক্ষেত্রেও নিতুকে শিকার হতে হয় বৈষম্যের। নিলয়কে ভর্তি করা হয় শহরের সবচেয়ে ভালো স্কুলে। তার পড়াশোনা যেন ভালোভাবে হয় সেজন্য সব রকম ব্যবস্থা করা হয়। অন্যদিকে পাড়ার সবচেয়ে কাছের স্কুলে ভর্তি করানো হয় নিতুকে। নিতুর পড়াশোনাটা যেন একান্তই শৌখিন। ভালো ফল করে, উচ্চশিক্ষা অর্জনের মধ্য দিয়ে জীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সৌভাগ্য যেন শুধু নিলয়েরই। নিতুর ক্ষেত্রে ভালো বিয়ে এবং ঘর-সংসার পরিচালনার জন্য কিছু জ্ঞানই যেন যথেষ্ট। কিন্তু নিতুও দেশ-বিদেশে উচ্চশিক্ষা অর্জনের মধ্য দিয়ে নানা গবেষণামূলক কাজ করতে পারত। দেশের জন্য সুনাম বয়ে আনতে পারত।

মানুষ হিসেবে তাদের উভয়েরই প্রতিষ্ঠিত হওয়ার জন্য বহু পথ রয়েছে। কিন্তু নিতু নারী হওয়ায় সমাজব্যবস্থা নিতুর জন্য সব পথকেই করে দিয়েছে রুদ্ধ। আর শুধু এমন ধারণার জন্যই আমরা বহু নারী সাহিত্যিক, বিজ্ঞানী, শিল্পী, প্রশাসকদের হারাচ্ছি। কাজেই নারী-পুরুষ ভেদাভেদ ভুলে সবাইকে মানুষ মনে করতে হবে এবং জীবনের সব ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষকে সমান অধিকার দিতে হবে। বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার অর্ধেকই নারী। নারীদের প্রতিভা বিকাশের পূর্ণ সুযোগ প্রদানের মধ্য দিয়েই বাংলাদেশ এক উন্নত দেশে পরিণত হতে পারবে।

You Might Also Like

Comments

Leave A Comment

Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Get Newsletter

Featured News

Advertisement

Voting Poll (Checkbox)

Voting Poll (Radio)

Readers Opinion

Editors Choice