বইমেলা
বইমেলা আমাদের দেশে একটা নতুন উৎসব। এই ধরনের উৎসব দেশে আগে ছিল না। আমাদের দেশে ধর্মীয় পালপার্বণ উপলক্ষ্যে মেলা হতো, স্মরণীয় লৌকিক ঘটনা উপলক্ষে মেলা হতো, মহাপুরুষের স্মৃতি পালনোদ্দেশ্যে মেলা হতো, আরও রকমারি কারণে মেলা হতো; কিন্তু বইয়ের মেলা আগে কখনো হয়নি। এ জিনিসের কোনো পূর্ব নজির দেখা যায় না।
হয়ত রেওয়াজটি গোড়ায় ছিল বিদেশী, বিদেশ থেকে আমরা এটা ধার করেছি। কিন্তু ধারের জিনিস হলেও তার ধার বা ভার কোনটাই কম নয়। ভাল বস্তু যে সূত্র থেকেই আহুত হোক না কেন তাকে স্বাগত জানাবার মতো খোলা মন (এবং প্রসারিত হাত) সর্বদাই আমাদের থাকা উচিত। অনুকরণ মহদুদ্দেশ্য প্রণোদিত তথা কল্যাণআশ্রিত হলে তার দোষ নষ্ট হয়ে যায়। হতে পারে বইমেলার ধারণটা পশ্চিম থেকে এদেশে আমদানি হয়েছে। কিন্তু জনসাধারণ তাকে এমন সাগ্রহে ও সোৎসাহে লুফে নিয়েছে যে, রেওয়াজটিকে এখন আর বিদেশাগত বলা চলবে না, তা ইতিমধ্যেই জাতীয় সংস্কৃতির অঙ্গীভূত হয়ে গেছে।
বইমেলা এখন শুধু ভারতের বড় বড় শহরেই অনুষ্ঠিত হচ্ছে না, জিলায় জিলায় এমনকি কখনও কখনও মহকুমা শহরেও হতে দেখা যাচ্ছে। গত এক দশক সময়ে ভিতর রাজধানী দিল্লী শহরে এবং কলকাতায় বেশ বড় রকমের কয়েকটি বইমেলা সংগঠিত হয়েছে। তার মধ্যে দু'একটি আন্তর্জাতিকমানের।
জার্মানীর ফ্রাঙ্কফুর্ট শহরে যে ধরনের বিশ্ব বইমেলা হয় তার ধাঁচে দিল্লিতেও বিশ্ব বইমেলায় অনুষ্ঠান হয়ে গেছে। কলকাতা শহরের আয়োজিত বইমেলাগুলোতে উত্তরোত্তর জনসমাগম বৃদ্ধি পাচ্ছে, বই কেনার আগ্রহও সমানুপাতে বর্ধমান।
পুস্তক প্রীতির একটা প্রধান নিদর্শন হলো পুস্তক-ক্রয়ের ইচ্ছা। এই মানদণ্ডে বিচার করে বলতেই হয় কলকাতার বাসিন্দাদের পুস্তকানুরাগ ক্রমাগত বেড়ে চলেছে। এটা খুব শুভ লক্ষণ সন্দেহ নেই। বইমেলায় ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা লক্ষ্য করে এ কথা বোধকরি এক প্রকার নিঃসংশয়েই বলা যায় যে, বইমেলা ইদানীং বঙ্গীয় সংস্কৃতির বিবিধ অত্যাবশ্যক উপচারের অন্যতম এক উপচার।
বইমেলাকে বাদ দিয়ে আজ আর বাংলা সংস্কৃতির পূর্ণতার কথা ভাবা যায় না। এই উৎসবটি কলকাতার নগর জীবনের একটি সাম্বৎসরিক অবশ্যকৃত্য হয়ে দাঁড়িয়েছে জনজীবনের উপর এমনি এর অবধারিত প্রভাব।
জনশিক্ষার বাহন
যে উৎসব বইকে কেন্দ্র করে পরিকল্পিত ও গঠিত, সে উৎসবের লক্ষ্য অতি পরিষ্কার। সমাজজীবনের স্তরে স্তরে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়াই সেই লক্ষ্যে। শিক্ষার ভিতর এখানে আনন্দও অন্তর্ভুক্ত। বইয়ের মাধ্যমে বিদ্যা অর্জন এবং বিনোদন, জ্ঞান এবং চিত্তস্ফূর্তি, এই দুইয়েরই ক্ষুধা এককালীন পরিতৃপ্ত। সেই জন্যই বইয়ের এতে আদর ও কদর। আর যে উৎসবের মূল কেন্দ্রবিন্দুই হলো বই, বই-ই যার শুধু মুখ্য নয়, একমাত্র উপজীব্য, সে উৎসবের আকর্ষণও একই কারণে স্বতঃসিদ্ধ বলা চলে। বইমেলা স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়, গ্রন্থাগার, গ্রন্থালয়, প্রকাশনালয়—এগুলির উপরে অতিরিক্ত একটি উপকরণ, যার উদ্দেশ্য সমাজমনে জ্ঞানের আলোর প্রসার এবং সেই সঙ্গে আনন্দও বিতরণ। সমাজে যত বেশী সংখ্যক বইয়ের প্রচার হবে তত বেশী অন্ধকার দূর হয়ে আলোর বিস্তার হবে, নিরানন্দ কেটে গিয়ে আনন্দের উদ্ভাস ঘটবে। এই নিরিখে বইমেলা জনশিক্ষার একটি প্রকৃষ্ট মাধ্যম রূপে গণ্য হওয়া উচিত। গ্রন্থাগারের চেয়েও এর প্রভাবের পরিমাণ ব্যাপক, কেননা গ্রন্থাগার বা লাইব্রেরি একটি বিশেষ স্থানে ও আয়তনে সীমিত, বই মেলায় সম্ভাবনা সেই তুলনায় অশেষ। তার প্রচার ও প্রসার লোক মুখে মুখে ও হাতেহাতে বহুগুণে বেশী সুনিশ্চিত।
অবশ্য বইমেলার সজ্জিত স্টলগুলির ব্যবস্থাপনার যারা কারক সেই পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সংস্থাগুলির ভূমিকা এ ক্ষেত্রে স্বভাবতঃই আলোচ্য। বইমেলার প্রদর্শিত বইসমূহের বিপণনে তাঁদের ব্যবসায়িক স্বার্থ থাকতে পারে কিন্তু খতিয়ে দেখলে ওই স্বার্থ ধর্তব্যের মধ্যে গণ্য হওয়া উচিত নয়। ধর্তব্য নয় এই কারণ যে, বিক্রিত বইয়ের প্রচারে ও সম্প্রসারের ফলে সমাজের যে বৃহত্তর মঙ্গল সাধিত হয় তা
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments