বাংলাদেশে সাম্রাজ্যবাদী তৎপরতা
রাধাকৃষ্ণ
প্রকৃতির সব অনু-পরমাণু থেকে, মাটি গাছপালা লতাপাতা, সব জীবজন্ত মানুষের ভেতরের আত্মা থেকে এই ক্রন্দন, এক তীব্র আবেগ, একটিই কামনা, একটাই বোধ পরমাত্মার জন্যে “প্রতি অঙ্গ কাঁদে মোর প্রতি অঙ্গ লাগি”।
রাধা যখন কৃষ্ণের উদ্দেশ্যে এ জাতীয় প্রেমবাণী উচ্চারণ করেন কিংবা তাঁদের ‘অবৈধ’ প্রেমলীলা যখন সামাজিক নিয়মকানুন, শৃঙ্খলাকে পদদলিত করতে উদ্যত হয় তখন সমাজের শৃঙ্খলা রক্ষাকারীরা বলেন, “রাধা হচ্ছে প্রকৃতির প্রতীক আর কৃষ্ণ হচ্ছে পরমাত্মা; কাজেই তাদের যে প্রেমলীলা অবৈধ মনে হচ্ছে তা আসলে পাথির্ব মানবিক কিছ নয়; অতিমানবিক। তাদের মিলন আসলে আত্মার সঙ্গে পরমাত্মার মিলন।” কাজেই তার অবৈধ হবার সুযোগ নেই।
পরমাত্মার ছোঁয়া পাবার জন্যে মানুষের, প্রকৃতির অনুপরমাণু, এরকম তীর আবেগে অস্থির হচ্ছে কিনা কিংবা যে প্রেমলীলাকে ঐশ্বরিক বলা হচ্ছে তা আদতে কী এই আলোচনা আমাদের বিষয়বস্তু নয়।
আমরা বর্তমানকালের খুবই পার্থিব, খুবই স্পষ্ট এক অবৈধ প্রেমলীলার কথা এখানে উল্লেখ করছি। যে প্রেমলীলাকে বৈধ অপার্থিব মহাশক্তিধর অবিনশ্বর অবিভাজ্য বলে প্রতিষ্ঠা করবার জন্য বিস্তর কাগজ খরচ হচ্ছে প্রতিদিন। আর এ কাজে সিআইএ’র নেটওয়ার্ক অক্লান্তভাবে সক্রিয়।
বেদ, মহাভারত, রামায়নের যুগের কিংবা মধ্যযুগের আরবের কোন কাহিনী এটা নয়, এটা হচ্ছে খুবই বর্তমানকালের।
এ প্রেমলীলায় কৃষ্ণের ভূমিকায় রয়েছে আমাদের রাষ্ট্র, সমাজ, অর্থনীতির প্রতিটি অনু-পরমাণুতে যার সাক্ষাৎ পাওয়া যায় সেই সাম্রাজ্যবাদী লগ্নী পুঁজি আর রাধার ভূমিকায় রয়েছে এদেশের সমাজ অর্থনীতি রাষ্ট্র এবং সে সুবাদে তার সঙ্গে সম্পর্কিত বুর্জোয়া আধা বুর্জোয়া শাসক শ্রেণী।
রাধা যেমন নিজের ঘর সংসার ছেড়ে কৃষ্ণের জন্য পাগল হয়েছিল, তার সব স্বপ্ন, আশা-আকাঙ্ক্ষা—তার শারীরিক মানসিক সমগ্র অস্তিত্ব কৃষ্ণের জন্য অসহনীয় আবেগে অস্থির থাকতো, রাধার অস্তিত্ব যেরকম সর্বতোভাবে কৃষ্ণের মুখাপেক্ষী হয়ে পড়েছিল; ঠিক সেরকম আমাদের শাসক শ্রেণীর সব আশা-আকাঙ্ক্ষা স্বপ্ন জীবন জীবিকা সুখ শান্তি সর্বোপরি সামগ্রিক অস্তিত্ব এখন সাম্রাজ্যবাদী পুঁজিবিহীন অচল অনড় ধংসপ্রাপ্ত হবার অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছে। ব্যাকুল আবেগে তাই রাধার মত অস্থির আমাদের দেশের কর্ণধাররা, সাম্রাজ্যবাদ তাদের কৃষ্ণ।
কার অর্থনীতি?
ঢাকায় বাংলাদেশের অর্থনীতির উপর এক আলোচনায় যোগ দিয়েছিলেন এক মার্কিন বিশেষজ্ঞ। তিনি তাঁর উপস্থিতি এবং বক্তব্য দ্বারা সকলকে কৃতার্থ করছিলেন। তিনি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে মার্কিনী অবদান তুলে ধরছিলেন খুবই নিপুণভাবে। বেরসিক একজন তরুণ হঠাৎই মন্তব্য করে উঠলেন, “আমাদের অর্থনীতির দশা এরকম হবার জন্য তোমরা অনেকাংশে দায়ী: সব ব্যাপারেই তোমরা এখানে হস্তক্ষেপ করো ইত্যাদি।” মার্কিনি বিশেষজ্ঞ এ কথায় বিন্দুমাত্র বিচলিত হননি, বিব্রত হননি। মুচকি হেসে বলেছিলেন, “কে বলেছে এটা তোমাদের অর্থনীতি, উন্নয়ন বাজেটের অধিকাংশ আমরা দেই, আমাদের দ্বারাই যে অর্থনীতি চালিত হয় তাতে আমরা হস্তক্ষেপ করি এ কথার তো কোন অর্থ নেই।”
যথার্থই বলেছিলেন মার্কিনী পন্ডিত। তার প্রশিকা (প্রশিক্ষণ শিক্ষা কাজ) যথার্থই সফল।
প্রবীণ বয়সে মাওসেতুং তরুণদের উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন, “এ পৃথিবী একই সঙ্গে তোমাদের এবং আমাদের কিন্তু সবশেষে তোমাদেরই।” বাংলাদেশের শাসক শ্রেণী সাম্রাজ্যবাদের উদ্দেশ্যে নিশ্চিন্তে বলতে পারেন, এবং নিশ্চয়ই বলেও থাকেন, “এ দেশ তোমাদের এবং আমাদের কিন্তু সবশেষে তোমাদেরই।”
বর্তমানের ঐতিহাসিক প্রেক্ষিত
অষ্টাদশ শতকে বাংলাদেশ যখন ব্রিটিশ কোম্পানীর পদানত হয় তখন ইউরোপে পুঁজিবাদের বিপুল যাত্রা শুরু হয়েছে। মার্কসের দৃষ্টিতে এ ছিল এক বৈপ্লবিক ঘটনা। পূর্বতন সকল সমাজ ব্যবস্থার তুলনায় সবচাইতে গতিশীল এবং শক্তিশালী বলেই এর আওতা খুব দ্রুত বৃদ্ধি লাভ করে; স্থবিরতা পশ্চাৎপদতা কাটানোর জন্য পুঁজিবাদ সবচাইতে কার্যকর ভূমিকা পালন করে।
ইতিহাস পর্যালোচনা করলে আমরা দেখি, সেই দেশে তখনই পুঁজিবাদ যথাযথভাবে বিকশিত হয়েছে যখন তা আরও অন্যান্য শর্তে'র সঙ্গে নিম্নোক্ত দুটি শর্তও পূরণ করেছে: এ দেশ কারও উপনিবেশ নয় ২০
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments