গায়ে হলুদ
শ্রাবণ মাসের দিন। বর্ষার বিরাম নেই, এই বৃষ্টি আসচে, এই আকাশ পরিষ্কার হয়ে যাচ্চে। ক্ষেতে আউশ ধানের গোছা কালো হয়ে উঠেচে, ধানের শিষ দেখা দিয়েচে অধিকাংশ ক্ষেতে।
পুঁটি সকালে উঠে একবার চারিদিকে চেয়ে দেখলে—চারিদিক মেঘে মেঘাচ্ছন্ন। হয়তো বা একটু পরে টিপটিপ বিষ্টি পড়তে শুরু করে দেবে। আজ তার মনে একটা অদ্ভুত ধরনের অনুভূতি, সেটাকে আনন্দও বলা যেতে পারে, ছদ্মবেশী বিষাদও বলা যায়। কি যে সেটা ঠিক করে না যায় বোঝা, না যায় বোঝানো। আজ তার বিয়ের গায়ে-হলুদের দিন। এমন একটা দিন তার বার বৎসরের ক্ষুদ্র জীবনে এইবার এই প্রথম এল। সকালে উঠতেই জেঠিমা বলেচে—ও পুঁটি, জলে ভিজে ভিজে কোথাও যেন যাস্ নি; আর তিনটে দিন কোনও রকমে ভালোয় ভালোয় কেটে গেলে যে বাঁচি।
আজ কি বার, মঙ্গলবার। শনিবার বুঝি বিয়ের দিন। পুঁটির মনে সত্যিই কেমন হয়, আনন্দের একটা ঢেউ যেন গলা পর্যন্ত উঠে আটকে গেল। বিয়ে বেশি দূরে কোথাও নয়, এই গ্রামেই, এমন কি এই পাড়াতেই। এক ঘর ব্রাহ্মণ আজ বছরখানেক হল অন্য জায়গা থেকে উঠে এসেচেন এখানে, দুখানা বড় বড় মেটে ঘর বেঁধেচেন—একখানা রান্নাঘর। এতদিন ধরে সে সঙ্গিনীদের সঙ্গে সেই বাড়িতে কুল পাড়তে গিয়েচে, সত্যনারানের সিন্নি আনতে গিয়েচে, যখন পাড়ার প্রান্তের ঘন জঙ্গল কেটে সে ভদ্রলোক বাড়ি তৈরি করেন ঘাটে যাবার পথের একেবারে ডান ধারে, তখন সে কতবার ভেবেচে এই ঘন বনের মধ্যে বাড়ি করে বাস করবার কার না জানি মাথাব্যথা পড়ল।
কে জানত, সেই বাড়িটাই—আজ এক বছর এখনও পোরেনি—তার শ্বশুরবাড়ি হবে!
কতদূর আশ্চর্যের কথা, কতদূর বিস্ময়ের কথা, ভাবলে অবাক হয়ে যেতে হয়! অথচ তারই ক্ষুদ্র জীবনে এমন একটা মহাশ্চর্য ব্যাপার সম্ভব হল! যখনই সে এ কথাটা ভাবে, তখনই সে সুদ্ধু তার মন সুদ্ধু যেন কতদূরে কোথায় চলে যায়।
ঐ ভদ্রলোকের একটি মাত্র ছেলে, নাম সুবোধ, তারই সঙ্গে তার বিয়ের সম্বন্ধ হয়েচে। সুবোধকে এই সম্বন্ধর আগে তাদের বাড়িতে কয়েকবার যাতায়াত করতে দেখেচে—বেশ ফর্সা, লম্বামত মুখ, এবার ম্যাট্রিক দিয়েচে, এখনও পরীক্ষার ফল বার হয়নি। আগে আগে, সত্যি কথা বলতে গেলে সুবোধের মুখ পুঁটি তত পছন্দ করত না। তার দাদার সঙ্গে যতবার এসেচে তাদের বাড়িতে—পুঁটি ভাবত—দেখো না, ঘোড়ার মত মুখখানা। কিন্তু আজকাল আর সুবোধের মুখ ঘোড়ার মত ত মনে হয়ই না, মনে হয় বেশ চমৎকার মুখ। গ্রামের ছেলেদের মধ্যে অমন চোখ, অমন রং, অমন মুখের গড়ন কার আছে?
রায়েদের পাঁচি সেদিন বলেছিল তাকে—হ্যাঁরে, তুই যে বড় ঘোড়ামুখো বলতিস্, তোর অদেষ্টে শেষকালে কিনা সেই ঘোড়ামুখোই জুটল!
পুঁটি মারতে ছুটে গিয়েছিল তার পিছু পিছু।
পুঁটির বাবা গোলার দোরে দাঁড়িয়ে ধান পাড়বার ব্যবস্থা করচে। তার বাবা বেশ চাষীবাসী গেরস্ত। পুঁটিদের বাড়িতে চারটা বড় বড় ধানের আউড়ি আছে, গোলা আছে একটা। আউড়ি জিনিসটা গোলার চেয়ে অনেক ছোট, তিন-চার বিশ ধান ধরে—আর একটা গোলায় ধরে এক পৌটি অর্থাৎ ষোল বিশ ধান।
তাদেরও ধান আছে গোলাভর্তি, সব ক’টা আউড়ি ভর্তি। কলকাতায় চাকুরি করেন এ পাড়ার হরিকাকা, তিনি মাঝে মাঝে গাঁয়ে এসে পুঁটির বাবাকে বলেন—আর কি রায়মশায়, এ বাজারে ত আপনিই রাজা। গোলাভর্তি ধান রেখেচেন ঘরে, আপনার মহড়া নেয় কে? কলকাতায় কিউতে দাঁড়িয়ে এক সের চাল নিতে হচ্চে—আর আপনি—।
পুঁটি জিগ্যেস করেছিল—কিসে দাঁড়িয়ে চাল নিতে হয় বাবা, বলছিল হরিকাকা?
—কে জানে কিসে দাঁড়িয়ে, তুই নিজের কাজ কর, আমি নিজের করি—মিটে গেল।
—তুমি জান না বুঝি ও কথাটার মানে? না বাবা?
—না জেনেও ত পায়ের ওপর পা দিয়ে এ
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments