ভৌতিক পালঙ্ক
অনেকদিন পর সতীশের সঙ্গে দেখা। বেচারা হন্তদন্ত হয়ে ভিড় ঠেলে বিকাল বেলা বেন্টিঙ্ক স্ট্রিটের বাঁ-দিকের ফুটপাথ দিয়ে উত্তর মুখে চলেছিল। সমস্ত আপিসের সবেমাত্র ছুটি হয়েছে। শীতকাল। আধো-অন্ধকার আধো-আলোয় পথ ছেয়ে ছিল। ক্লান্ত দেহে ছ্যাকরা গাড়ির মতো ধীরে ধীরে পথ ভেদ করে চলেছিলাম। সহসা সতীশকে দেখে ওর জামাটা চেপে ধরে চিৎকার করে উঠলাম— আরে সতীশ যে!
সতীশ সবিস্ময়ে আমার পানে চেয়ে বলে উঠল— খগেন! মাই গড! আমি তোমাকেই খুঁজছিলাম!
বললাম— তার প্রমাণ আমাকে ধাক্কা দিয়েই তুমি চলে গেছিলে আর একটু হলে! ভাগ্যিস ডাকলাম!
—সরি! আমি একটু বিশেষ ব্যস্ত।
—তা সে বুঝতেই পারছি। তা, কোথায় চলেছ শুনি?
—তোমাকেও আমার সঙ্গে যেতে হবে। বেশিদূর নয়। যাবার পথে সব বলব।
—আশ্চর্য!
—’না’ বললে শুনব না। জোর করে নিয়ে যাবো।
ছেলেবেলা থেকেই সতীশকে চিনি। কথা অনুযায়ী সে কাজ করে। আর শরীরে কিছু বল থাকায় প্রায় ক্ষেত্রে সে বলপ্রয়োগ করে স্বার্থসিদ্ধি করতে ভোলে না। অগত্যা তার সঙ্গে যেতে হল।
তার গন্তব্য স্থান খুব নিকটেই ছিল এবং সে তার উদ্দেশ্য খুব সংক্ষেপেই ব্যক্ত করল। সেদিন সকালে খবরের কাগজে বেচা-কেনার কলমে একটি বিজ্ঞাপন ছিল
একটি অতি আধুনিক এবং রহস্যজনক চীনদেশীয় খাট অধিক মূল্যদাতাকে বিক্রয় করা হইবে। জগতে ইহা অদ্বিতীয়। সুযোগ হারাইলে অনুশোচনা করিতে হইবে।
২/৩… স্ট্রিট।
সতীশ তার পকেট থেকে বিজ্ঞাপনটি বার করে বলল— পড়ো।
—বুঝলাম। তা ‘রহস্যজনক’ শব্দটার মানে কী?
—ওইটেই তো আমায় ভাবিয়ে তুলেছে। কোনো হদিশ করে উঠতে পারছি না।
সতীশ চলছিল রাস্তার নাম দেখতে দেখতে। হঠাৎ সে লাফিয়ে উঠল— পেয়েছি! এই গলি!
সন্ধ্যার স্তিমিত আলোকে সেই গলির পানে তাকিয়ে আমার সারাশরীরে কেন জানি না একপ্রকার শিহরণ জাগল। চীনাপল্লির চীনা আবহাওয়ায় রহস্যজনক খাট! সতীশের হাতটা ধরে বললাম— খাটে কাজ নেই সতীশ, চলো ফিরে যাই। আমার বাঙালি-খাট বেঁচে থাকুক।
সতীশ প্রবল বেগে এক ঝাঁকানি দিয়ে উঠল— ভীতু কোথাকার! এতটা এগিয়ে এসে কখনো ফেরা যাবে না!
গলির মোড়ের ডানপাশে একটা নিমগাছ ভূতের মতো মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে ছিল। ওদিকের ডাস্টবিনের মধ্যে থেকে যতসব অখাদ্য-কুখাদ্যের উৎকট গন্ধ ভেসে আসছিল। অন্নপ্রাশনের ভাত যেন ঠিকরে বার হয়ে আসতে চাইল অসহ্য যন্ত্রণায়। নাকে রুমাল চাপা দিয়ে কোনোগতিকে পথ চলতে লাগলাম।
একটা দমকা বাতাস বিভ্রান্ত হয়ে আচমকা দক্ষিণ দিক থেকে ভেসে এসে আমাদের শরীরে যেন আছাড় খেয়ে পড়ল। মাথার ওপর দিকে কয়েকটা বাদুড় ডানার শব্দ করতে করতে উড়ে গেল। দুটো অভিভাবকহীন কুকুর এই অনধিকার প্রবেশকারীদের পানে চেয়ে বিশ্রী সুরে অভিযোগ করতে লাগল।
পথে আর জন-মানবের চিহ্ন পর্যন্ত রইল না। পাশে একটি চীনা ডাক্তারের বহু পুরাতন সাইনবোর্ড। তার উপরকার নর-কঙ্কালের ছবিটি জীর্ণপ্রায়। কোথা থেকে একটি পিয়ানোর অস্পষ্ট সুর ভেসে আসছিল।
শীঘ্রই আমরা আমাদের নির্দিষ্ট গৃহে এসে পৌঁছলাম। অমন বাড়ি আমি আর জীবনে দেখিনি। ইট বার করা, পঙ্গুপ্রায়; বহু প্রাচীনকালের সাক্ষ্য নিয়ে দাঁত বার করে দাঁড়িয়ে ছিল। হয়তো নবাব আলিবর্দি খাঁর আমলে এই বাড়ির ভিত্তিস্থাপন হয়েছিল।
ভাঙা ফটক দিয়ে অতি সন্তর্পণে ভেতরে প্রবেশ করলাম। বাড়ির ভেতরে গিয়ে আমি অবাক হয়ে গেলাম। এত লোক এখানে কোথা থেকে এল? যে-নির্জন নিস্তব্ধ গলি আমরা পিছু ফেলে আসলাম, সেখানে তো কারুর ছায়া পর্যন্ত খুঁজে পাইনি। ভৌতিক কাণ্ড নাকি? সকলের মুখে কৌতূহলের ছাপ বর্তমান ছিল। নানা জাতীয় লোক সেখানে সমবেত হয়েছিল। এতগুলি লোক, কিন্তু কারুর মুখে একটি কথা নেই। সুচ পড়লে পর্যন্ত তার শব্দ শোনা যায়।
ঘণ্টা খানেক পর একটি বৃদ্ধ মোটা চীনা আমাদের পথ প্রদর্শন করে নিয়ে গেল। তার
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments