বুধীর বাড়ি ফেরা
ঘোর দুঃস্বপ্ন হইতে বুধী জাগিয়া উঠিল।
সে একটু ঘুমাইয়াছিল কি? হয়তো তার খেয়াল নাই।
এ কোন ভীষণ জায়গায় তাহাকে আনিয়া ফেলা হইয়াছে? চারিদিকে বিশ্রী ইটের দেয়াল ও ময়লা…ময়লা অপরিষ্কার মেঝে। একটু আলো বা হাওয়া আসিবার উপায় নাই। আর কি ভিড়! এত ভিড়, এত ঠাসাঠাসি বুধী জীবনে কখনো দেখে নাই—এত ভিড়ে আর এই গুমট গরমে প্রাণ যে তার বাহির হইয়া গেল! এত ভিড়ে, এই ঠাসাঠাসির মধ্যে কি ঘুম হয়?
নতুন নতুন অপরিচিত মুখ। কাহাকেও সে দেখে নাই…নিষ্ঠুর, লোভাত মুখ, বুধী দেখিলেই বুঝিতে পারে…বুঝিতে পারিয়া বুধীর গা শিহরিয়া উঠে…মনে যে কি দুঃখ আর অস্বস্তিবোধ হয়!
সে বেশ বোঝে এখানে কেহ তাহাকে ভালোবাসে না, যেমন সেই ছোটো খুকি তাহাকে ভালোবাসিত, যত্ন করিয়া খাওয়াইত, গলা ধরিয়া কত আদরের কথা বলিত।…কোথায় গেল ছোটো খুকিটা? কেন তাহাকে এখানে আনা হইয়াছে? কেন আনা হইয়াছে তাহা সে বুঝিতেই পারে না। কেবল সে এইটুকু জানে, কত দিন ধরিয়া দীর্ঘ কঠিন পথ বাহিয়া তাহাকে এখানে আসিতে হইয়াছে—সঙ্গে বহু সঙ্গী ছিল, কিন্তু অপরিচিত, কারো সঙ্গে বুধীর আলাপ হয় নাই তেমন, আলাপ করিবার মতো মনের অবস্থাও তাহার ছিল না।
কেহ যত্ন করিয়া তাহাকে খাওয়ায় নাই। এখানকার খাবার মুখে দিবার উপায় নাই। কেমন যেন ভ্যাপসা গন্ধ, ভালো আস্বাদ তো নাই-ই ভালো গন্ধ পর্যন্ত নাই খাবারের। বুড়ি তাহাকে যত্ন করিয়া খাওয়াইত, এ কথা অস্বীকার করিতে পারিবে না। হয়তো সে ছোটো খুকির মতো ভালোবাসিত না অতটা—কিন্তু সন্ধ্যার সময় পেটপুরিয়া খাইবার ব্যবস্থা করিতে কখনো ত্রুটি করে নাই।
সত্যি, এ যে কোন জায়গায় আসিয়াছে, তাহার আদৌ কোনো ধারণাই নাই। এমন অদ্ভুত ও ভয়ংকর জায়গা তার অভিজ্ঞতার বাহিরে ছিল এত দিন। কী হট্টগোল, নানারকম নতুন নতুন বিকট বিকট শব্দ জায়গাটাতে! তাহার মন আরও পাগল হইয়া উঠিল এ শব্দে ও আওয়াজে। জীবনে কখনো এত অদ্ভুত ধরনের সব আওয়াজ সে শুনে নাই। অথচ তাহার বয়স কম হয় নাই। বুধীর জীবন কাটিয়াছে এই বিশ্রী জায়গা হইতে বহু দূরে। কত দূর তাহার ঠিক ধারণা নাই, কিন্তু মোটের ওপর বহু বহু দূরে অন্য এক স্থানে, যেখানে অবারিত সবুজ মাঠ আছে, অপূর্ব সুঘ্রাণে ভরা কোমল সরস ঘাসে ঢাকা। কী সুন্দর স্বাদ সে ঘাসের! মাঠের ধারে কলস্বনা নদী, নদীর কিনারায় জলের ধার পর্যন্ত নানাজাতীয় ঘাসের ও জলজ শাকের বন—ঠান্ডা, নরম, তাজা—কী অপূর্ব তাদের সুগন্ধ! স্বাদ তো আছেই ভালো কিন্তু সেই নতুন-ওঠা বর্ষা-সতেজ কচি ঘাস ও কলমিলতার তাজা গন্ধের কথা যখনই মনে হয় তখন মনে পড়ে, একহাঁটু দীর্ঘ, ঘনশ্যাম তৃণরাজির মধ্যে মুখ ডুবাইয়া পেট ভরিয়া সে তৃপ্তির ভোজ—হু হু উন্মুক্ত বাতাস ও দূরপ্রসারী প্রান্তরের মধ্যে সে মুক্তির আনন্দ—তখন বুধী সত্যই ক্ষেপিয়া যায়—তাহার জ্ঞান থাকে না। মুক্তির জন্য সে উন্মাদ হইয়া উঠে। জীবনের বহুদিন সেখানে সে কাটাইয়াছে। বহুদিন। কত দিন তাহা সে জানে না, বয়স তো তার কম হয় নাই…প্রথম জীবনের কথা প্রায় কিছুই তাহার মনে নাই—যা একটু-আধটু মনে পড়ে—সব আবছায়া ধোঁয়া—কেবল খুব বড়ো বড়ো সবুজ মাঠ, তলায় ফল বিছিয়ে-থাকা বড়ো বড়ো গাছ, সুপেয় শীতল স্রোতের জল, সাঁজালের ধোঁয়ার মৃদু গন্ধভরা আবাসস্থান, এইসব মনে পড়ে।
আজকাল কিন্তু বেশি করিয়া মনে পড়ে ছোটো খুকির কথা—খুকি তাহাকে সত্যই ভালোবাসিত।
এটা কোন জায়গা? এক-একবার বুধীর মনে হয়, হয়তো-বা এটা পাউন্ডঘর। কিন্তু বুধী জীবনে তো কতবার পাউন্ড ঘরে কত বিনিদ্র রজনী যাপন করিয়াছে— এ ধরনের পাউন্ড ঘর তো দেখে নাই! সেখানে তো বাঁশের বেড়া ঘেরা খোলা জায়গায় তাহাকে থাকিতে হইয়াছে, মাথার
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments