সুরসম্রাট রবি শঙ্কর ও জর্জ হ্যারিসন
লেখক: এনামুল হক
একটা সময় ছিল যখন কিংবদন্তির ব্যান্ড দল বিটলস-এর জনপ্রিয়তা পশ্চিমা দুনিয়ায় আকাশকে স্পর্শ করেছিল। সেটা ছিল ষাটের দশক। হিপ্পি আন্দোলনের জোয়ার বইছিল পশ্চিমে। সেই জোয়ারে মিশে গিয়ে তরুণ সমাজের এক বিরাট অংশ সমাজের প্রতিষ্ঠিত মূল্যবোধ, রাজনীতি, আদর্শ, দর্শন সবকিছুকেই অস্বীকার করে বসে। তারা তাদের পোশাকআশাক, চালচলন, জীবনযাপনের দ্বারা সমাজের প্রতি বিজাতীয় ঘৃণার প্রকাশ ঘটায়। তারা লম্বা চুল রাখতে থাকে, উদ্ভট ধরনের পোশাক পরে, মারিজুয়ানা, কোকেন প্রভৃতি ড্রাগে আসক্ত হয় এবং সেই সঙ্গে লিপ্ত হয় অবাধ যৌনাচারে। ব্যান্ড দল বিটলস যেন এদের দর্শনকে তুলে ধরার জন্য জন্ম নিয়েছিল। এই ব্যান্ড দল প্রতিষ্ঠাতাদের অন্যতম জর্জ হ্যারিসনের সঙ্গে ষাটের দশকের মাঝামাঝি পরিচয় হয়েছিল উপমহাদেশের সেতার সম্রাট রবি শঙ্করের। আশ্চর্যের ব্যাপার এই পরিচয়ের মধ্যে দিয়ে রবি শঙ্কর হিপ্পি আন্দোলনের এক প্রিয়ভাজন ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়েছিলেন। কিন্তু হিপ্পিদের জীবন প্রথম দিকে কৌতূহল সৃষ্টি করলেও শেষ পর্যন্ত তা আর ভাল লাগেনি রবি শঙ্করের। অচিরেই তিনি হিপ্পিদের মাদকাসক্তি, তাদের ব্যাভিচারী জীবনযাপন, তাদের কদর্য আচরণের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়েছিলেন।
জর্জ হ্যারিসনের সঙ্গে রবি শঙ্করের প্রথম পরিচয় ১৯৬৬ সালের জুন মাসের এক সন্ধ্যায়। স্থান লন্ডনের এক বন্ধুর বাড়ি। বিটলসের নামটা তিনি শুনেছিলেন। কিন্তু ওদের সম্পর্কে অত কিছু জানতেন না। শুধু জানতে যে, বিটলস অত্যন্ত জনপ্রিয় একটা ব্যান্ড দল। শুরু থেকেই জর্জের সঙ্গে কেমন এক আলাদা ধরনের সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল রবি শঙ্করের। বিটলসের অপর তিনজনের সঙ্গেও বিভিন্ন সময়ে তাঁর পরিচয় হয়েছে এবং এঁদের মধ্যে রিঙ্গো বরাবরই ছিলেন বিশেষ রকমের উষ্ণ ও বন্ধুসলভ। তবে ওদের কারো সঙ্গেই তার সেই আলাদা ধরনের সখ্য গড়ে ওঠেনি।
পরিচয়ের মুহূর্ত থেকেই জর্জের কাছ থেকে নানা প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছিলেন রবি শক্ষর। তা থেকে তাঁর ধারণা হয়েছিল যে, ভারতীয় সঙ্গীত ও ধর্মের ব্যাপারে যথাথই কৌতুহল আছে জর্জের। ব্যাহত জর্জ ছিলেন মিষ্টি স্বভাবের এক স্পষ্টবাদী তরুণ। রবি শঙ্কর তাঁকে বললেন, জর্জ সেতারে গান তুলেছেন বলে তিনি শুনেছেন। তবে তাঁর সেই গানটি 'নরওয়েজিয়ান উড' সত্যি শোনা হয়নি। জর্জ বেশ বিব্রত হলেন। শেষ পর্যন্ত ব্যাপারটা যা জানা গেল তা হচ্ছে, জর্জ লন্ডনে জনৈক ভরতীয়র কাছে বারকয়েক সিটিং দিয়ে সেতার কিভাবে ধরতে হয় এবং সেতার বাজানোর মৌলিক নিয়মকানুনগুলো শিখেছিলেন। তাঁর সেতার সম্পর্কে তালিম ঐ পর্যন্ত। জর্জের ‘নরওয়েজিয়ান উড’ গানটা নিয়ে বেশ হৈ চৈ পড়ে গিয়েছিল। রবি শঙ্কর শেষ পর্যন্ত যখন গানটা শুনলেন তার মনে হলো সেতারে এক বিচিত্র ধ্বনি সৃষ্টি রয়েছে। এই বিচিত্র ধ্বনির জন্যই সর্বত্র বিটলসের তরুণ ভক্ত সম্প্রদায় সেতার বাদ্যযন্ত্রটির প্রতি আকর্ষিত হয়ে পড়ে।
জর্জ এর পর রবি শঙ্করের কাছে সেতার শিখতে চাইলেন। রবি শঙ্কর জানালেন, সেতার বাজানোর ব্যাপারটা ভায়োলিন বা সেলোতে পাচাত্যের ক্লাসিক্যাল মিউজিক শেখার মতো। ব্যাপারটা এই নয় যে, বাদ্যযন্ত্র ধরার কায়দা এবং গুটিকয়েক স্ট্রোক ও কর্ড শিখে নিয়ে পরে নিজে নিজে চর্চা বা সাধনা করে উৎকর্ষ অর্জন করা যাবে—যেমনটা সচরাচর দেখা যায় গিটারে পাশ্চাত্যের পপসঙ্গীতের বেলায়। কথাটা রবি শঙ্কর জর্জকে অতি সুন্দরভাবে বুঝিয়ে বললেন, যাতে তিনি ভারতীয় উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের সিরিয়াস মেজাজটুকু হৃদয়াঙ্গম করতে পারেন।
রবি শঙ্কর বললেন, "বাদ্যযন্ত্রে ঝড় তুলে বা উঁচু লয়ের শব্দতরণ সৃষ্ট করে শ্রোতাদের ইন্দ্রিয়কে উত্তেজিত করে তোলার বাইরেও অনেক কিছু করার আছে। আমার লক্ষ্য সর্বদাই থেকেছে শ্রোতাদেরকে আমার সঙ্গে অন্তরের গহীনতম প্রদেশে, এক ধ্যানের জগতে নিয়ে গিয়ে তাদেরকে পরম ব্রাহ্মের কাছে পৌছানোর সাধনার মধুর যন্ত্রণা অনুভব করতে দেয়া, তাদের দু'চোখে অশ্রু নিয়ে আসা এবং পরিপূর্ণ প্রশান্তি ও সূচিতা অনুভব করানো।
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments