ভিয়েতনাম
দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার দেশ ভিয়েতনাম ১৯৪৫ সালে স্বাধীনতা সংগ্রামে জয়লাভ করে সমাজ পরিবর্তনের পথে অগ্রসর হওয়ার কর্মসূচী নিলেও সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ লড়াই পরিচালনা করতে বাধ্য হয়েছে আরও তিন দশক কাল। কৃষি প্রধান এই দেশের আয়তন ৩ লাখ ৩৯ হাজার ৬ শত বর্গ কিলোমিটার এবং লোকসংখ্যা ৫ কোটি ৭০ লাখ (১৯৮৩ সালের তথ্য)।
পূর্ব ইতিহাস
অতি প্রাচীনকাল থেকে বর্তমান ভিয়েতনামের ভূখণ্ডে মনুষ্য বসতি ছিল বলে জানা যায়। ব্রোঞ্জ যুগে হ্যাং রাজবংশের শাসনামলে ভিয়েতনামে জাতীয় রাষ্ট্র গড়ে ওঠে। খ্রীষ্টপূর্ব তৃতীয় শতকে কাও ব্যাং প্রদেশের একজন স্থানীয় রাজা গোটা দেশ অধিকার করেন। এরপর একের পর এক ঘটে চীনা আক্রমণ এবং হাজার বছর ধরে চীনের বিভিন্ন শক্তির পদানত হয়ে থাকে ভিয়েতনাম।
৯৩৯ সালে জনগণের বিদ্রোহের পটভূমিতে দেশ স্বাধীন হয়, তবে বিদেশী আগ্রাসনের অবসান ঘটে না। মঙ্গোল, চীনা প্রভৃতির আক্রমণের মধ্য দিয়েই ভিয়েতনাম রাজ্য সংহত হতে থাকে। নগর-বন্দর নির্মিত হয়, ব্যবসা-বাণিজ্যের সূচনা ঘটে, কৃষির উন্নতি ঘটে। কিন্তু সাধারণ কৃষক জনতার জীবনে আসেনা সুখ-সমৃদ্ধি। ফলে ঘটে বিদ্রোহ বিশেষত কৃষক বিদ্রোহ।
সামন্ততান্ত্রিক ভিয়েতনামে আঠার-উনিশ শতকে শিল্প ও বাণিজ্যের প্রসার ঘটতে থাকে পশ্চিমা শক্তির সাথে যোগসূত্রের ফলশ্রুতিতে। একটি ব্যবসা কেন্দ্রও প্রতিষ্ঠিত হয় যেখানে ব্রিটিশ, পর্তুগীজ, ফরাসী ও চীনা বণিকেরা আসা শুরু করে দলে দলে। কৃষি আর খনির দেশটিকে সম্পূর্ণ গ্রাস করার জন্য লালায়িত হয় তারা। শেষ পর্যন্ত ফ্রান্স আধিপত্য বিস্তার করে। শুরু হয় আরেক নতুন অধ্যায়।
পরাধীনতার শৃঙ্খল
ফরাসী বণিকেরা বাণিজ্য বহর নিয়ে আনাগোনা করতে করতে শেষ পর্যন্ত যুদ্ধজাহাজই আমদানী করে। ১৮৪৭ সালে দানাং বন্দরে এই রণপোত নোঙ্গর করলেও প্রথম আক্রমণ চালানো হয় ১৮৫৮ সালে। রাজা প্রথম মনে করেছিলেন যে, ফরাসীরা বুঝি বাণিজ্যের অধিকতর সুবিধা চায়। কিন্তু ফরাসীরা তো বাণিজ্যিক সুবিধা চায়না—চায় ভূখণ্ডের অধিকার। ফরাসিদের আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র দেখে রাজা ও তার পরিষদ ভয় পেলেন। এই বিদেশী শক্তিকে রুখে দাঁড়ানোর একমাত্র পথ ছিল জনগণকে সশস্ত্র করে অগ্রসর হওয়া। সেখানেও রাজার ভয়, অসন্তুষ্ট জনগণ যদি এই অস্ত্র শেষ পর্যন্ত রাজার দিকেই ঘুরিয়ে ধরে। তাই রাজা মন্দের ভাল—আপসের পথ ধরলেন। আলাপ আলোচনার ভিত্তিতে ফরাসিদের কিছু অঞ্চল ছেড়ে দিলেন। ফরাসী দখলদাররা প্রাপ্ত এলাকায় কিছুদিন চুপচাপ থেকে আবার আক্রমণের থাবা প্রসারিত করলো। রাজা আবার আপস করলেন—আরও কিছু এলাকায় ফরাসী আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হলো। এভাবেই আপসপন্থী রাজার পদক্ষেপের বদৌলতে ফরাসীরা এলাকার পর এলাকা দখল করে চলে।
প্রথম থেকে জনগণ ছিল প্রতিরোধের পক্ষে। বুদ্ধিজীবীসহ ব্যাপক মানুষ চেয়েছিল রাজা জনগণকে নিয়ে বিদেশী দখলদারদের প্রতিরোধ করুক। কিন্তু রাজা মুখ রক্ষার জন্য লোক দেখানো যুদ্ধের আয়োজন করেই দায়িত্ব শেষ করেন। ১৮৬০ সালে দক্ষিণের গুরুত্বপূর্ণ নগরী সায়গণের পতন হলে জনগণ নিজেরাই প্রতিরোধ সংগ্রামে এগিয়ে আসেন। বিস্তীর্ণ গ্রামাঞ্চলে জনগণের উদ্যোগে গেরিলা বাহিনী গড়ে ওঠে। শুরু হয় জনগণের প্রতিরোধ। জনগণের এই জাগরণের মুখে রাজা বিদ্রোহ বন্ধ করার আদেশ দেন, কিন্তু জনগণের সে আদেশ শোনার মতো অবকাশ ছিল না। অবশ্য জনগণের সেই প্রতিরোধও ফরাসী শক্তির আধিপত্য বিস্তার ঠেকাতে পারেনি। ১৮৮৪ সালের মধ্যে গোটা ভিয়েতনামে ফরাসী আধিপত্য কায়েম হয়ে যায়। কাম্পুচিয়া আর লাওসও পদানত হয় ফরাসীদের।
ভিয়েতনামী জনতার লড়াকু ভূমিকার কারণে ফরাসী সাম্রাজ্যবাদের দেশটিকে গ্রাস করতে সময় লেগেছিল ২৬ বছর। তাই সাম্রাজ্যবাদী শক্তি ভিয়েতনামের জাতীয় ঐক্য ভেঙ্গে দিতে প্রয়াসী হয়। দেশকে টংকিন, আনাম ও কোচিনচায়না, এই তিন ভাগে ভাগ করে ফেলা হয়। সবার উপরে মূল কর্তাব্যক্তি হিসেবে অবস্থান করেন ফরাসী গভর্ণর জেনারেল। ঔপনিবেশিক শৃঙ্খল পাকাপোক্ত করার মানসে ভিয়েতনামী ভাষাকে বিকৃত করে ল্যাটিনাইজ করা হয়
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments