গঙ্গাধরের বিপদ

অনেকদিন আগেকার কথা। কলকাতায় তখন ঘোড়ার ট্রাম চলে। সে সময় মশলাপোস্তায় গঙ্গাধর কুণ্ডুর ছোটোখাটো একখানা মশলার দোকান ছিল।

গঙ্গাধরের দেশ হুগলি জেলা, চাঁপাডাঙার কাছে। অনেক দিনের দোকান, যে সময়ের কথা বলছি, গঙ্গাধরের বয়েস তখন পঞ্চাশের ওপর। কিন্তু শরীরটা তার ভালো যাচ্ছিল না। নানারকম অসুখে ভুগত প্রায়ই। তার উপর ব্যবসায়ে কিছু লোকসান দিয়ে লোকটা একেবারে মুষড়ে পড়েছিল। দোকানঘরের ভাড়া দু-মাসের বাকি, মহাজনদের দেনা ঘাড়ে; দুপুর বেলা দোকানে বসে থেলো হুঁকো হাতে নিয়ে নিজের অদৃষ্টের কথা ভাবছিল। আজ আবার সন্ধের সময় গোমস্তা ভাড়া নিতে আসবে বলে শাসিয়ে গিয়েছে। কী বলা যায় তাকে!

এক পুরোনো পরিচিত মহাজনের কথা তার মনে পড়ে গেল। তার নাম খোদাদাদ খাঁ। পেশোয়ারি মুসলমান, মেটেবুরুজে থাকে। আগে গঙ্গাধরের লেনদেন ছিল তার সঙ্গে। কয়েক বার টাকা নিয়েছে, শোধও করেছে, কিন্তু সুদের হার বড়ো বেশি বলে ইদানীং বছর কয়েক গঙ্গাধর সেদিকে যায়নি।

ভেবেচিন্তে সে মেটেবুরুজেই রওনা হল। সুদ বেশি হলে আর উপায় কী? টাকা না আনলেই নয় আজ সন্ধের মধ্যে।

মেটেবুরুজে গিয়ে খোদাদাদ খাঁয়ের নতুন বাসা খুঁজে বার করতে, টাকা নিতে দেরি হয়ে গেল। খিদিরপুরের কাটিগঙ্গা পার হয়ে এসে ট্রাম ধরবে, হন হন করে হেঁটে আসছে। এমন সময় একজন লোক তাকে ডেকে বললে— এ সাহেব, ইধার শুনিয়ে তো জরা—

সন্ধে হয়ে গিয়েছে। যেখান থেকে লোকটা তাকে ডাকলে সেখানে কতকগুলো গাছপালায় বেশ একটু অন্ধকার। স্থানটা নির্জন, তার ওপর আবার তার সঙ্গে রয়েছে টাকা। গঙ্গাধরের মনে একটু সন্দেহ যে না-হল এমন নয়। কিন্তু উপায় নেই, লোকটা এগিয়ে এল ওই গাছগুলোর তলায়। সে যেন তারই প্রতীক্ষায় দাঁড়িয়ে ছিল।

লোকটা খুব লম্বা, মাথার ঝাঁকড়া ঝাঁকড়া চুল ঘাড়ের উপর পড়েছে, মুখটা ভালো দেখা যাচ্ছে না। পরনে ঢিলে ইজের ও আলখাল্লা। সে কাছে এসে সুর নীচু করে হিন্দিতে ও ভাঙা বাংলায় মিশিয়ে বললে— বাবু, সস্তায় মাল কিনবেন?

গঙ্গাধর আশ্চর্য হয়ে বললে— কী মাল?

লোকটা চারিদিকে চেয়ে বললে— এখানে কথা হবে না বাবু, পুলিশ ঘুরছে, আমার সঙ্গে আসুন।

ঝুপসি গাছের তলায় এক জায়গায় অন্ধকার খুব ঘন। সেখানে গিয়ে লোকটা বললে— জিনিসটা কোকেন। খুব সস্তায় পাবেন। ডিউটি-ছুট মাল, লুকিয়ে দেবো!

গঙ্গাধর চমকে উঠল।

সে কখনো ও-ব্যাবসা করেনি। ডিউটি-ছুট কোকেন! কী সর্বনেশে জিনিস! ভালো লোকের পাল্লায় সে পড়েছে! না— সে কিনবে না।

লোকটা সম্ভবত পাঞ্জাবি মুসলমান। বাংলা বলতে পারে, তবে বেশ একটু বাঁকা। অনুনয়ের সুরে বললে— বাবু, আপনি নিন! আপনার ভালো হবে। সিকি কড়িতে দেবো, আমার মুশকিল হয়েছে আমি মাল বিক্রির লোক খুঁজে পাচ্ছিনে। ঘুরে ঘুরে বেড়াচ্ছি কত জায়গায়, আবার সব জায়গায় তো যেতে পারিনে, পুলিশের ভয় তো আছে? কেউ কথা কইছে না আমার সঙ্গে; সেই হয়েছে আরও মুশকিল। হঠাৎ শহরে এত পুলিশের ভয় হল যে কেন বাবু— তা বুঝিনে। আগে যারা এ-ব্যাবসা করত, তাদের কাছে যাচ্ছি, তারা আমার দিকে চেয়েও দেখছে না। আপনি গররাজি হবেন না বাবু। মাল দেখুন, পরে দামদস্তর হবে—

লোকটার গলার সুরে একটা শক্তি ছিল, গঙ্গাধরের মন খানিকটা ভিজল। কোকেনের ব্যাবসাতে মানুষ রাতারাতি বড়োলোক হয়েছে বটে।

বিনা সাহসে, বিপদ এড়িয়ে চলে বেড়ালে কি লক্ষ্মীলাভ হয়? দেখাই যাক না!

হঠাৎ গঙ্গাধর চেয়ে দেখলে যে লোকটা নেই সেখানে। এই তো দাঁড়িয়ে ছিল, কোথায় গেল আবার? পাছে কেউ শোনে এই ভয়ে বেশি জোরে ডাকতেও পারলে না। চাপা গলায় বাঙালি-হিন্দিতে ডাকলে— কোথায় গিয়া, ও খাঁ সাহেব?

এদিক-ওদিক চাওয়ার পর সামনে চাইতেই দীর্ঘাকৃতি আলখাল্লাধারী খাঁ সাহেবকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেল। গঙ্গাধর

লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন

আকর্ষণীয় মূল্য

এক বছর

৪৯৯

এক মাস

৯৯
মেয়াদ শেষে নতুন দামে নতুন করে গ্রাহক হতে হবে

যোগাযোগ করতে

+৮৮ ০৯৬০৬০৩৩৩৯৩
রবিবার–বৃহস্পতি: সকাল ১০টা–সন্ধ্যা ৬টা (সরকারি ছুটিরদিন ব্যতীত) অথবা ভিজিট করুন FAQ

You Might Also Like

Comments

Leave A Comment

Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Get Newsletter

Featured News

Advertisement

Voting Poll (Checkbox)

Voting Poll (Radio)

Readers Opinion

Editors Choice